“আরো খারাপ হতে পারতো অবস্থা,” নিজেকে সান্ত্বনা দিলো টম। জাহাজটা এখনো ভাসছে, আর ওর সব লোকজনই এখনো অক্ষত। ওদের কাছে এখনো যথেষ্ট ক্যানভাস কাপড় আর অতিরিক্ত মাস্তুল আছে যা দিয়ে ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করে মাদ্রাজ পর্যন্ত চলে যাওয়া যাবে। কুয়োর ভিতরের পানি বেড়েই চলেছে, তবে এখন দিন হওয়ায় খোলের গায়ের ছিদ্রগুলো মেরামত করা সম্ভব হবে। ফ্রান্সিস সারা রাত খোলের ভিতরেই ছিলো। নিজেও পালাক্রমে পানি সেঁচেছে আবার অক্লান্তভাবে অন্যদেরকেও উৎসাহ দিয়েছে। টমের বুক ভরে গিয়েছে ওকে দেখে।
আরো খানিকটা আলো বাড়লো। মাঝে মাঝে জাহাজটা ঢেউয়ের মাথায় উঠে দুলে উঠছে, ঝাপসাভাবে হলেও তখন দিগন্তে শান্ত পানি দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত কেটে যাচ্ছে ঝড়টা।
“ওটা কি?” হালী বলে উঠলো।
টম সেদিকে তাকালো। “কি?”
কিন্তু জাহাজটা তখন ঢেউয়ের মাথা থেকে নেমে যাওয়ায় কিছুই দেখা গেলো না। আবার জাহাজটা আর একটা ঢেউয়ের মাথায় চড়ে বসতেই টম দিগন্তে সাদাটে কিছু একটা দেখা গেলো।
“ডুবো পাহাড়,” চিৎকার দিয়ে উঠলো একজন নাবিক। “সামনেই ডুবো পাহাড়।”
টম একটা পাই গ্লাস নিয়ে চোখে লাগালো। “অসম্ভব। আমরা পাড় থেকে কমপক্ষে পঞ্চাশ মাইল দূরে থাকার কথা।”
আবারও কেস্ট্রেল ঢেউয়ের মাঝে নেমে যেতেই সামনের দৃশ্যটা অদৃশ্য হয়ে গেলো। এক মুহূর্ত পরেই আর একটা ঢেউয়ের মাথায় চড়ে বসলো জাহাজটা। আর এবার স্পষ্ট দেখা গেলো সবকিছু।
“ডাঙা।” ডাঙাটা এতোক্ষণ অদৃশ্য হয়ে ছিলো। কালো আকাশের কারণে আবছায়ায় কারো চোখে পড়েনি। কিন্তু ডুবো পাহাড়ের সারি স্পষ্ট বোঝ যাচ্ছে। দিগন্তে একসারি ধারালো দাঁতের মতো কিড়মিড় করছে ওগুলো।
হতে পারে ওটা আসলে একটা অজানা প্রবাল প্রাচীর বা কোনো উপকূলের শেষ মাথা, যেটা ওখানে থাকার কথা না। এ ব্যাপারে কোনো ধারণাই নেই টমের। আর এই মুহূর্তে এটা নিয়ে ভাবারও বিন্দুমাত্র সময় নেই।
কেবিনের দরজা খুলে সারাহ এসে হাজির হলো। হাতে বিস্কুট আর একটা লবণ মাখানো মাংসের টুকরো। জাহাজের দুলুনির সাথে তাল রেখে এক পা এক পা করে এগিয়ে এলো ও।
“সারা রাত কিছু খাওনি। কিছু খেতে হবে এখন।” তারপর টমের মুখের ভঙ্গি দেখে জিজ্ঞেস করলো, “কি হয়েছে?”
“সামনেই ডাঙা,” টম বললো। “কিভাবে এখানে আসলো জানিনা। স্রোতের ধাক্কায় মনে হয় ধারণার চাইতেও দূরে চলে এসেছি।” তারপর টের পেলো কথা বলে ওর মহামূল্যবান সময়ের অপচয় করছে। “যেটাই হোক, এখন সামনেই ডাঙা, আর দ্রুত কিছু করতে না পারলে সোজা ওটায় গিয়ে ধাক্কা খাবো।”
সারাহ টমের চেহারা দেখেই যা বোঝার বুঝে নিলো। এতো বছর একসাথে সমুদ্রে কাটিয়ে এতো এতো ভয়াল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরেও ও খুব কমই টমকে এতোটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতে দেখেছে।
টম ডেক-এর মাঝখানে দৌড়ে গেলো। “জাহাজকে ঘুরিয়ে ফেলতে হবে।”
আলফ উইলসন ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। “এই আবহাওয়ায়? জাহাজের সবগুলো মাস্তুল ভেঙ্গে যাবে তো-আরো খারাপ কিছু হতে পারে।”
“সেটা না করলে সোজা ডাঙ্গায় গিয়ে আছড়ে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবো।”
সেটা সবাই বুঝতে পেরেছে। দড়াদড়ির যেটুকু অবশিষ্ট ছিলো তাই নিয়েই দৌড়ে গেলো নাবিকেরা। একটা পাল খাটানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু বাতাসের কারণে কাজটা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। ক্যানভাসটা বার বার ফুলে উঠে হাত থেকে ছুটে যেতে লাগলো। শত চেষ্টা করেও ধরে রাখা গেলো না। মূল মাস্তুলের অবশিষ্টাংশ ভেঙে সাগরে গিয়ে পড়লো।
“এরপরে দেখা যাবে নাবিকদের কেউ পানিতে গিয়ে পড়েছে,” আলফ বললো।
“যদি পাল খাটানোনা যায় তাহলে আমরা সবাই ডুবে মরবো।”
পাল ছাড়া এই বাতাসের বিরুদ্ধে লড়ে ওরা কিছুতেই ডাঙা থেকে দূরে যেতে পারবে না। এমনকি পাল খাটানোর পরেও পুরো নিশ্চয়তা নেই। এই ফুঁসে ওঠা প্রমত্তা সাগর আর প্রবল বাতাসের বিরুদ্ধে গিয়ে জাহাজটা উল্টো দিকে চালাতে হবে ওদের। আর হাতে আছে খুবই কম সময়।
“উপকূল কাছিয়ে আসছে,” আলফ বললো। ঝড়ের কারণে কিছুই। ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না, তাই টম বুঝতে পারছে না যে ওরা আসলে ঠিক কতোদূরে আছে। এখান থেকে স্পষ্ট সৈকতের সাদা বালু আর বাতাসের তোড়ে সারসের গলার মতো বেকে যাওয়া পাম গাছগুলো দেখা যাচ্ছে।
ঈশ্বর, মাঝে যেনো কোনো পাথর বা প্রবাল না থাকে, মনে মনে প্রার্থনা করলো টম। ও ঢেউয়ের দিকে তাকালো, ওদিক থেকে আবার বিপদ আরো বাড়ে কিনা নজর রাখছে।
একজন নাবিক ধপ করে ডেক এর উপর পড়ে গেলো। টম ভাবলো লোকটার হাত-পা কিছু ভেঙ্গে টেঙ্গে গেলো কিনা। তবে লোকটা পিঠ ডলতে ডলতে উঠে দাঁড়ালো। পড়ার পর ডেক-এ পিছলে যাওয়ার কারণে জ্বলছে সেখানে।
“পাল খাটানো হয়েছে স্যার।”
টম উপরে তাকিয়ে দেখে অবশেষে ক্যানভাসের টুকরোটা বশ মেনেছে। যদিও বাকা হয়ে ঝুলছে ওটা। ঠিকমতো বাঁধতে না পারায় ফাঁকা জায়গা দিয়ে বাতাস বেরিয়ে যাচ্ছে। তবে এতেও চলবে।
“ঘুরিয়ে ফেলো জাহাজ।”
“সোজা দিকে জায়গা নেই অতো,” আলফ মনে করিয়ে দিলো।
“ক্লাব হলিং করে ঘোরাবো জাহাজকে,” টম ঠিক করলো। ক্লাব হলিং হচ্ছে শেষ ভরসা। এই কৌশলে জাহাজের সামনের দিকটাকে জবরদস্তির মাধ্যমে বাতাসের বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। এখন ওদের আর কোনো উপায় নেই। নাবিকেরা নোঙ্গরের গায়ে এক কাছি দড়ি বেঁধে জাহাজের সামনের দিকে বেঁধে দিলো।
