ফ্রান্সিস পানি মাপার কাঠিটা হাতে ফিরে এলো। “ছয় ইঞ্চি।”
“খারাপ না।” তবে টম কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি না। “পালগুলো গোটানো হলেই সবাইকে পানি সেচতে পাঠিয়ে দেবে। প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর লোক বদল করবে।”
“আচ্ছা।” বলে ফ্রান্সিস দৌড়ে গেলো আদেশ পালন করতে। টম ঘুরে দেখলো অ্যানা আর সারাহ শাল জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“ঝামেলা কি খুব বেশি?” সারাহ শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো। বাতাসের তোড়ে ওর মাথার চুল এলোমেলো হয়ে উড়ছে।
“আমাদের সামনে আরো একশো মাইল খোলা সাগর,” টম বললো। “কেস্ট্রেল অনেক ভালো একটা জাহাজ। তাই ভাগ্যের সহায়তা পেলে আশা করছি ঝড়ের আগেই জায়গাটা পেরিয়ে যেতে পারবো।”
“আর এখন?” সারাহ বললো। “আমি আর মিস দুয়ার্তে কি করতে পারি?”
“নিচে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বসে থাকো। আর প্রার্থনা করো যেনো ঝড় চলে যায় দ্রুত।”
*
বাতাসের বেগ বাড়তেই লাগলো। সাগর ফুলে ফুলে উঠছে। ঢেউগুলো একেকটা এতো বড় যে ওটার উপর দিয়ে ওপাশে আর দেখার উপায় রইলো না। কেস্ট্রেল একবার ঢেউয়ের মাথায় উঠছে আবার ঝপাস করে আছড়ে পড়ছে। পানির তোড়ে ডেক-এর উপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেও কষ্ট হচ্ছে টমের। রাত নামলো একসময়, তবে দিনের বেলাতেই এতো বেশি অন্ধকার ছিলো যে তফাতটা খুব বেশি বোঝা গেলো না। কেউ ঘুমাতে পারলো না। টম ডেক-এ পায়চারি করতে লাগলো, হালীকে এই বৈরি সাগরেরো ঠিকভাবে হাল ধরে রাখতে সাহায্য করলো। জাহাজের ছেঁড়া দড়াদড়ি আর মাস্তুলের দিকে কড়া নজর রাখলো। এতো দ্রুত ঝড়টা এগিয়ে এলো যে অর্ধেক ভোলা পালটা নামানোরও সময় পেলো না টম। শেষ পর্যন্ত ওর জাহাজের কোনো অংশ আস্ত থাকবে কিনা সেটা নিয়েই চিন্তায় পড়ে গেলো
ওর আশংকাই সত্যি হলো। মাঝরাতের একটু পরে, জাহাজটা প্রচণ্ড জোরে কেঁপে উঠলো। এতো জোরে শব্দ হলো যে ঝড়ের মাঝেও স্পষ্ট শোনা গেলো। আলফ উইলসন দৌড়ে এলো অন্ধকার থেকে।
“সামনের পরীটা ভেঙ্গে পড়েছে।”
“এখুনি ওটাকে কেটে ফেলো, এখুনি।” আদেশ দিলো টম।
পরীটার ভাঙা অংশটুকু ডেক-এ টেনে আনতেই টম টের পেলো যে ওর জাহাজ উল্টোদিকে ঘুরতে শুরু করেছে। যদি জাহাজটা বাতাসের আড়াআড়ি চলে আসে, তাহলে বাতাস ধাক্কা দিয়ে জাহাজটা একটা পিপার মতো করে উল্টে ফেলবে। হালী আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে আবার আগের দিকে ঘোরাতে। কিন্তু জড়তার কারণে পারছে না। সাগর আজ এতো শক্তিশালী যে, যে কোন সময় পুরো হালটাই ভেঙ্গে যেতে পারে।
টম নিজে সব কাজে নেতৃত্ব দিতে লাগলো। জাহাজের উপর যে ঢেউগুলো। এসে পড়ছে সেগুলোকে ভেঙে দিচ্ছে। ওগুলোকে আটকানো অসম্ভবই বটে, কোমরে রশি বেঁধে না রাখলে জাহাজ থেকে পড়েই যেতো। চেহারায় ঢেউয়ের বাড়ি খেলো, চোখে ছোবল খেলো। বলা যায় অন্ধই হয়ে গেলো ও, হাতের কুড়ালটা দিয়ে যে জাহাজের কিনারে বাঁধা দড়াদড়ি কেটে দেবে সেই উপায়ও রইলো না। আরো একটা ঢেউ এসে আছড়ে পড়লো।
জাহাজের সবচে বড় মাস্তুলের সাথে বাধা দড়িটার দিকে কুড়াল চালালো। টম। প্রবল বাতাসে ওটা টানটান হয়েই ছিলো। ওটা কাটা না হলে পুরো মাস্তুলটাকেই ভেঙ্গে ফেলতো।
ওর কুড়ালের কোপে কেটে গেলো দড়িটা। আচমকা প্রচণ্ড টান মুক্ত হওয়ায় ওটার মুক্ত প্রান্ত বাতাস কেটে একদিকে ছুটে গেলো। টম তীরবেগে ওটার পথ থেকে সরে গেলো। এক ইঞ্চির জন্যে সেটা ওর চোখে এড়িয়ে পিছনের লোকটার চেহারায় গিয়ে লাগলো। চিৎকার করে উঠে পড়ে গেলো লোকটা। সাথে সাথে একটা ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো তাকে। তারপর একটানে জাহাজের কিনারে টেনে নিয়ে গেলো।
লোকটার কোমরে একটা দড়ি বাঁধা, কিন্ত জাহজ থেকে পড়ে গেলে সেটা কোনো কাজেই আসবে না। কেউ তাকে জাহাজের খোলের গায়ে পিষে মারবে। টম দৌড় দিলো। ভয়ানক পিচ্ছিল হয়ে আছে তক্তাগুলো। ও ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকটার কোমর আঁকড়ে ধরে টেনে নিয়ে আসলো, ঠিক সেই মুহূর্তে আর একটা ঢেউ ভেঙ্গে পড়লো ওদের উপর।
দড়াম করে একটা শব্দ হয়ে পুরো ডেক কেঁপে উঠলো। এক মুহূর্তের জন্যে টমের মনে হলো একটা মাস্তুল বুঝি ভেঙ্গে পড়েছে। ও উপরে তাকালো, ভেবেছে দেখবে যে ওটা ভেঙ্গে ওর উপরেই পড়ছে। কিন্তু দেখা গেলো মাস্তুল ঠিকই আছে, একটা ছেঁড়া পাল ওটা থেকে পতপত করে উড়ছে।
“কিছুতে বাড়ি খেয়েছি নাকি আমরা?” এই অঞ্চলে পানির কোনো নিচে লুকানো পাহাড় বা প্রবাল প্রাচীর নেই। তবে ঝড়ের তোড়ে ওরা যে কোথায় এসেছে সে সম্পর্কে টমের কোনো ধারণাই নেই।
“পরীটা স্যার, আলফ চেঁচিয়ে জবাব দিলো। “কেটে ফেলার পর ডেক এ আছড়ে পড়েছে।”
টম জাহাজের পিছন দিকে সরে আসতেই দেখে ফ্রান্সিস উপরে ওঠার হ্যাচটা দিয়ে উঠে আসছে। টলতে টলতে ও এগিয়ে এলো টমের দিকে। ওর হাত ফোস্কায় ভরে গিয়েছে।
“পানি বাড়ছে।” ঝড়ের ভিতরে কথাগুলো টমের কানে পৌঁছাতে ওকে ফুসফুসের সবটুকু বাতাস খরচ করতে হলো। “এতো বেশি উঠছে যে আমরা সেঁচে সারতে পারছি না।”
“চেষ্টা করে যাও। তুমিই আমার শেষ ভরসা।”
*
রাতটা মনে হচ্ছিলো শেষই হবে না। ঝড়ের বেগ এক ফোঁটাও কমলো না। কখন যে ভোর হয়ে সকাল হয়েছে কেউ টেরই পায়নি। যখন বৃষ্টি চোখে পডলো তখন টম ব্যাপারটা ধরতে পারলো। ও নিজের লবণে ভরা চোখটা ডলে জাহাজের দিকে নজর দিলো। শুধু পরীটা না, জাহাজের সামনের আর মূল মাস্তুলটাও ভেঙ্গে পড়েছে, ওগুলোয় বাঁধা দড়িগুলোর কোনো চিহ্ন নেই। পালগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে ফিতার মতো ঝুলছে। বাকি মাস্তুলটাও পুরোপুরি ফাঁকা। তবে তাতেও জাহাজটার গতি খুব একটা কমেনি। সেই সাথে বাতাসের বেগও মনে হচ্ছে আরো বেড়েছে।
