সারাহ কনুইতে ভর দিয়ে হাতের উপর মাথা রাখলো। ওর বয়স সবে তিরিশ পেরিয়েছে। কিন্তু এখনো কিশোরী মেয়েদের মতোই চপল। ওর সোনালি আভার চামড়া একেবারে মসৃণ, স্তন নিখুঁত আর উন্নত আর চোখ ঠিক ডেভনের আকাশের মতোই পরিষ্কার আর নীল।
‘ফ্রান্সিস বংশগতভাবে যে গুণাবলিই পাক বা কারো কাছ থেকে যা কিছুই শিখুক-ও কিন্তু সেই সবার চাইতে আলাদা একটা মানুষ হবে। তুমি শুধু ওকে সঠিক পথটা চিনিয়ে দিতে পারো। ও সঠিক পথে না হাঁটলে সেটা তোমার দায় না।”
সারাহের লম্বা কেশরাজি টমের বুকের উপর ছড়িয়ে আছে, ওর কেমন সুড়সুড়ি লাগছে তাতে। সারাহ আঙুল দিয়ে টমের পেশির বাইরের দিকটায় বুলাতে লাগলো। ধীরে ধীরে নিজের কাজ করছে ও। টম টের পেলো ওর ভাবনা অন্যদিকে সরে যাচ্ছে।
সারাহ টমের ঠোঁটে চুমু খেলো। ওর চোখ চকচক করছে। তবে আমি কিন্তু মায়ের প্রভাব থেকে পুরো মুক্ত নই। কিছু কিছু ব্যাপারে আমার লোভ খুব বেশি! যেমন তোমার আদর।”
*
কেপ কোমোরিন পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত ওদের ভাগ্য সুপ্রসন্নই থাকলো। এটা হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশের সর্ব দক্ষিণ প্রান্ত। জায়গাটা একবার পার হতে পারলেই ওদের আর মৌসুমি বায়ুর ভয় থাকবে না। ইদানীং ঝড়ের জন্যে পশ্চিম উপকূলে জাহাজ চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“একবার অন্তরীপটা পার হতে পারলেই আর চিন্তা নেই। সিলন ঘুরে মাদ্রাজ পর্যন্ত একেবারে মাখনের মতো রাস্তা,” টম বললো। সামনের টেবিলে একটা চার্ট বিছানো। সেটার দিকে তাকিয়ে যেনো জোর করেই নিজেকে আশ্বস্ত করলো টম। ওরা ঠিক ঋতু বদলের সময়টাতে এখানে এসে পৌঁছেছে, তার উপর আজ সারা বিকেল বাতাস স্থির হয়ে আছে। এখনো নিরাপদ না ওরা।
“সিলনে নীলার খনি আছে,” অ্যানা বললো। “ওগুলো হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে দামী পাথর। রানি সেবার মন জয় করার জন্যে রাজা সলোমন নাকি তাকে এই পাথরা উপহার দিয়েছিলেন।”
টেবিলের উল্টো পাশে বসা ফ্রান্সিসের মুখভঙ্গি দেখছে টম। ও কি ভাবছে সেটা পড়ার চেষ্টা করছে। সেখান থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ও অ্যানার দিকে তাকালো, কথাটা কি অ্যানা ইচ্ছেকৃতভাবে ফ্রান্সিসের মাথায় ঢোকানোর জন্যে বললো কিনা সেটা ভাবছে।
“আমরা কি সিলনে একবার নামতে পারি?” ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো।
“ফেরার পথে দেখা যাবে,” টম বললো। “এই মুহূর্তে আমাদের এক দলা পনির কেনারও সামর্থ্য নেই।” পরের কথাটা ও ঠাট্টার ছলে বলতে চেয়েছিলো, কিন্তু কেনো যেনো সেটা বেশ রুঢ় শোনালো।
“দামী পাথরের ব্যবসা কিন্তু অনেক লাভের,” অ্যানা বললো। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে টম কোনো ছলনা দেখতে পেলো না। শুধু এক ব্যবসায়ীর বেশি লাভ করার অভিপ্রায়। “কয়েক বছর আগে মাদ্রাজের গভর্নর স্যার থমাস পিট বিশাল বড় একটা হীরা কিনেছিলেন। ওটার ওজন ছিলো প্রায় সোয়া এক পাউন্ড, চারশো দশ ক্যারেট ছিলো পাথরটা।”
শুনে এবার টমও আগ্রহী হয়ে উঠলো। মৃদু স্বরে শিষ দিয়ে উঠলো ও।
“এক ভারতীয় শ্রমিক গোলকান্দার খনিগুলোর একটা থেকে চুরি করে এনেছিলো হীরাটা। লোকটার পায়ে বিশাল একটা দগদগে ঘা ছিলো। তার ভিতরে লুকিয়ে খনি থেকে বের করে এনেছিলো হীরাটা। খনির পাহারাদারেরা কিছুই টের পায়নি। পিট ওটার জন্যে বিশ হাজার পাউন্ড দিয়েছিলেন। পাথরটা কেটে পালিশ করার পর ওটার দাম লক্ষ পাউন্ড ছাড়াবে।”
“গোলকান্দা কি মাদ্রাজের কাছে?” ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো।
“দুইশো মাইল ভিতরে। তবে সব ভালো ভালো পাথরই মাদ্রাজে আসে।”
“তাহলে দোয়া করো যেনো আমরা এতো বেশি লাভ করতে পারি যা দিয়ে কয়েকটা পাথর কেপ টাউনে কিনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়,” টম বললো। “আমি বাজি-”
টম কথা থামিয়ে চুপ করে গেলো হঠাৎ। কিছু একটা অস্বাভাবিক ঠেকছে ওর কাছে। যেনো জাহাজের কাঠের ভিতর দিয়ে ওর কাছে খবর পৌঁছে গিয়েছে। ও উঠে দাঁড়ালো, সাথে সাথেই শব্দ হলো দরজায়।
“দুঃখিত স্যার,” মেট বললো। “বাতাস পড়ে গিয়েছে। আবহাওয়ার মতি গতিও ভালো ঠেকছে না। মাস্টার বললেন একটা ঝড় নাকি আসছে।”
টম প্রায় দৌড়ে ডেক-এ উঠে এলো। ওরা নিচে গিয়েছে বেশিক্ষণ হয়নি। এইটুকুতেই সমুদ্র ভয়াল রূপ ধারণ করেছে। বিশাল বিশাল ঢেউ ফুলে উঠছে চারপাশে; দড়িগুলোতে বাধা পেয়ে বাতাস যেনো আর্তচিৎকার করে বেড়াচ্ছে। এক অশুভ, নীলচে-লাল আলোয় ভেসে যাচ্ছে সমুদ্রের উপরিভাগ। দিগন্তে সূর্যের আলো মেঘের ফাঁক দিয়ে মাথা গলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে, কিন্তু পারছে না।
“সব পাল নামাও এখনি, শুধু মাঝেরটা রাখো,” টম আদেশ দিলো। “ওটাকেও অর্ধেক তুলে রাখো। উপর থেকে গজ খানেক থাকবে শুধু। সমুদ্রের নোঙ্গরগুলো প্রস্তুত করে রাখো তাড়াতাড়ি।”
লোকজন ঝটপট কাজে লেগে গেলো। দড়ি ধরে টেনে পাল গুটিয়ে ফেলছে। টম ফ্রান্সিসকে ডাকলো।
“কুয়োর গভীরতা কতোটুকু মেপে আসো।” কুয়োটা আসলে জাহাজের ঠিক মাঝের একটা গর্ত। জাহাজের পেটে যতো পানি ঢোকে তা ওখানে জমা হয়। সাগর যতোই ঠাণ্ডা হোক, বা জাহাজটা যতোই ভালো করে বানানো হোক কেন, খোলে পানি ঢুকবেই। আর ঝড়ের কারণে জাহাজের তক্তাগুলোর উপর প্রচণ্ড চাপ পড়বে। ঢেউ এসে খোলে বাড়ি দিয়ে তক্তাগুলো নাড়িয়ে দিতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই ফুটো হবে অনেকগুলো। যদি পানি ঠিকমতো সেচ দিয়ে বের করা না যায় তাহলে পানির কারণে জাহাজের ওজন আরো বেড়ে যাবে, তখন ওটা ঠিকমতো চালানোও যাবে না, ফলে জাহাজ ঢেউয়ের প্রতি আরো বেশি নাজুক হয়ে যাবে। আর জাহাজ ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে।
