ব্যাপারটা ভালোই, টম নিজেকে বললো। তুমি নিজেও এরকম ছিলে। ওর মনে আছে, ওকে জাহাজে নেওয়ার জন্যে ও ওর বাবার প্রধান নিয়োগ কর্মকর্তা বিগ ড্যানিয়েল ফিশারের শুধু পা ধরা বাদ রেখেছিলো। এরপর ওর বাবা যখন অনুমতি দিলো, সেদিনটা ছিলো ওর জীবনের অন্যতম আনন্দের দিন।
“শুধু তো দস্যুদের কথা বললাম,” সাবধান করলো টম। “গাই যদি একবার আমাদের এই ইন্টারলোপিং অভিযানের কথা জানতে পারে, তাহলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সমগ্র বহর আমাদের পিছনে লেলিয়ে দেবে।”
রোদের চোটে ফ্রান্সিসের চোখ ছোট ছোট হয়ে আছে। “গাই চাচা আপনাকে এতো বেশি অপছন্দ করে কেননা? কেপ টাউনে আমাকে কথাটা বলেননি।”
“সে এক লম্বা কাহিনি।” এড়িয়ে যেতে চাইলো টম। কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। নিজের খুব কম কৃতকর্মের জন্যেই ও লজ্জা বোধ করে, আর ওর ভাই সম্পর্কে বলাটা সেগুলোর মধ্যে একটা। “তখন আমারদের বয়স এই তোমার মতোই…”।
একটা পালে বাতাস লেগে ফুলে উঠতেই হ্যাচকা টানে ওটায় বাঁধা একটা রশি গেলো খুলে। তারপর ওটার মাথা ডেক-এ ছোটাছুটি করতে লাগলো। জাহাজের গতিও পরিবর্তিত হয়ে গেলে সাথে সাথে।
“আগে এটা সামলিয়ে আসি,” ফ্রান্সিসের কাঁধ চাপড় দিয়ে বললো টম। “আর একদিন বলবো। প্রমিস, বলবো।”
ফ্রান্সিস অবশ্য আর জিজ্ঞেস করেনি। একটা কারণ হচ্ছে, টম যে এ ব্যাপারে আলাপে অনাগ্রহী সেটা টের পেয়েছে ও। আর আসল কারণটা হচ্ছে ওর মাথায় সারাক্ষণ শুধু অ্যানার চিন্তা ঘোরে। মেয়েদের সাথে মেলামেশার খুব বেশি সুযোগ ওর হয়নি। যতোদিনে বয়স বেড়ে উপযুক্ত হয়েছে বলা যায়, তততদিনে দারিদ্র ঝাঁকিয়ে বসেছে ওদের পরিবারে। হাই উইল্ডের বিশালতু দেখে কয়েকটা মেয়ে অবশ্য কিছু আগ্রহ দেখিয়েছিলো, কিন্তু সেটাও একদিনের বেশি টেকেনি। কারণ বাড়ির ভিতরের খালি দেয়াল আর ফাঁকা ঘর দেখেই যা বোঝার বুঝে নিয়েছিলো তারা।
কিন্তু অ্যানার সাথে ওর ওরকম কিছুই হচ্ছে না। অ্যানা ওকে ওর চরম দুরবস্থায় পাওয়ার পরেও দূরে ঠেলে দেয়নি। ওর সাথে একদম সহজভাবে, নরম সুরে কথা বলে অ্যানা। তবে এটায় একটা সমস্যাও আছে। ফ্রান্সিস ধরতে পারে না কথার আড়ালে ওর জন্যে অ্যানার আসল মনোভাবটা কি। ওর সারাক্ষণ অ্যানার সাথে কাটানো সময়গুলোর কথা মনে হয়। ফলে যদি কখনো অ্যানা ওকে একটু এড়িয়ে যায় বা একটু বেখেয়াল হয়, তাহলে ওর সারাটা দিন খারাপ কাটে। যতোবার অ্যানা ডেক-এ উঠে আসে, ফ্রান্সিস কোনো কাজেই মন বসাতে পারে না। ট্রাভার্স বোর্ড নিয়ে খাবি খায় তখন, বা সূর্যের কৌণিক অবস্থান বের করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে।
“তুমি দেখি আমাদেরকে গ্রিনল্যান্ডের অক্ষাংশে অবস্থান দেখিয়েছো,” টম একদিন ওকে ডেকে বকুনি দিলো। সেদিনের হিসাবে বিশাল একটা গড়মিল করে ফেলেছিলো ফ্রান্সিস।
“ভুল হয়ে গিয়েছে, চাচা।”
“অ্যাডমিরাল স্যার ক্লাউডেসলি শোভেল-এর কথা শুনেছো? দুই বছর আগে, উনি নিজের অবস্থান বের করতে ভুল করে ফেলেন আর ওনার পুরো বহর নিয়ে সিসিলি দ্বীপপুঞ্জের দিকে চলে যান। ওখানকার পানির নিচের পাহাড়ে বেধে ওনার চারটা জাহাজ ধ্বংস হয়ে যায়। মারা যায় দুই হাজার মানুষ। উনি নিজেও ছিলেন তার ভেতর। তাতে করে অবশ্য আত্মহত্যা করার ঝামেলা থেকে বেঁচে যান উনি।”
ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, “আচ্ছা, বুঝেছি।”
টম ওর স্বর নরম করলো। “তোমাকে বুঝতে হবে, ফ্রান্সিস। জাহাজে মাত্র তিনজন লোক আছে যারা সূর্যের অবস্থান নিখুঁতভাবে বের করতে পারে। এখন যদি আমার বা আলফ উইলসনের কিছু একটা হয়-ধরো কোনো ঝড়, বা দস্যুর আক্রমণ, বা জাহাজ কিছুর সাথে ধাক্কা খায়-তাহলে একমাত্র তুমিই আছো যে কিনা জাহজটাকে নিরাপদে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।”
“আমি আসলে সেভাবে ভেবে দেখিনি।”
“আমি এই জাহাজের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারি না। কেপ টাউনের জাহাজঘাটার কেরানি vOC-র হয়ে কাজ করে। আমার কাছে থেকে সে ইচ্ছে করে বেশি টাকা নিয়েছে। আমার নিজের সব টাকা তো বটেই, তার সাথেও বাড়তি অনেক টাকা এই অভিযানের সাথে জড়ানো। যদি জাহজটা ডোবে তাহলে আমিও ডুবে যাবো।”
*
“ওর উপর ওর সৎ বাবার প্রভাব নিয়ে ভয় হয় আমার,” নিজেদের কেবিনে শুয়ে এক রাতে সারাহকে বললো টম। জাহাজে প্রতি কেবিনে একজনের শোয়ার মতো করে খাট ছিলো, কিন্তু টম কাঠ মিস্ত্রিকে বলে ওর ঘরের খাটটা দুজন শোয়ার মতো করে বানিয়েছে। পাশাপাশি শুয়ে আছে ওরা। ভ্যাপসা আবহাওয়ার কারণে দুজনেরই পরনে কোনো কাপড় নেই। ওনার মতো একজন জুয়াড়ির নিশ্চয়ই নিজের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিলো না। যদি ফ্রান্সিসও সেসব শিখে নেয়?”
“তাহলে সেসব অভ্যাস ছাড়িয়ে দেওয়া হবে,” সারাহ পাশ ফিরে শুলো। টম এর বুকে মাথা রেখে ওর হৃৎস্পন্দন শুনছে।
“আর তার উপর ওর শরীরে বিলির রক্ত বইছে,” টম আবার বললো।
“আমার বাবা আজীবন শুধু লাত্রে ধান্দা করেছেন, আর আমার মায়ের ধ্যান জ্ঞান ছিলো শুধু খাওয়া। আর আমি কি তাদের মতো অতপ্ত দানব হয়েছি?”।
টম মাথার উপরের নিচু ছাদটার দিকে চেয়ে রইলো। উপর থেকে পাহারাদারের মাপা পদধ্বনি ভেসে আসছে।
“একজন মানুষের মানুষ হওয়ার পিছনে কি থাকে?” জোরে জোরে চিন্তা করতে লাগলো টম। “এটা কি বংশগত? নাকি পরিবেশ থেকে শিক্ষা নেয় সবাই?”
