“তুমি ওকে এসবের মাঝে ঠেলে দিচ্ছো কেনো?” ওরা নিচে নেমে যেতেই নালিশের সুরে বললো টম।
“আমি ঠেলে দেই বা না দেই তাতে কিছুই যায় আসে না,” সারাহ জবাব দিলো। “যা হওয়ার তা হবেই। আর কেউ না হোক, অন্তত তোমার সেটা জানা থাকার কথা।”
ডোরিয়ান এগিয়ে এলো ওদের দিকে। “দারুণ কিন্তু জাহাজটা,” প্রশংসা করলো ও। “ঠিক আছে, আপাতত বিদায় তাহলে দেখা হবে শীঘ্রই।”
“আচ্ছা।”
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে করা পরিকল্পনা মোতাবেক, টম আর সারাহ, ফ্রান্সিস আর অ্যানাকে নিয়ে কেস্ট্রেল-এ করে মাদ্রাজ যাবে। ডোরিয়ান, ইয়াসমিনি আর আবোলি সেন্টারাস-কে নিয়ে আফ্রিকার উপকূল ধরে আরবের গুম্বন আর মোকা বন্দরে যাবে। সেখান থেকে ভারতের দক্ষিণ উপকূল থেকে একশো মাইল দূরে লাকুইডিভা নামের এক দ্বীপপুঞ্জে আবার একসাথে মিলবে ওরা। তারপর একসাথে বাড়ি ফিরবে।
টম ওর ভাইয়ের সাথে কোলাকুলি করলো। “সাবধানে থেকো!”
“তুমিও নিরাপদে ফিরে এসো।”
“তাতে আসতেই হবে,” টম বললো। “সব টাকা ঢেলেছি এটার পিছনে।”
ছোট ভাইয়ের গমন পথের দিকে তাকিয়ে কেমন একটা বেদনা অনুভব করলো টম। প্রায় দশটা বছর টম জানতো যে ও মারা গিয়েছে। তাই এখন সামান্য সময়ের জন্যেও যদি আলাদা হতে হয় তো ওর ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। এটাই যদি আমাদের শেষ দেখা হয়?
“ডোরিয়ান চাচা চলে গিয়েছেন?”
ফ্রান্সিস উঠে এসেছে উপরে। ও আর অ্যানা কতক্ষণ নিচে ছিলো ভেবে অবাক হলো টম।
“বিদায় দেওয়ার জন্যে একেবারে ঠিক সময়ে চলে এসেছো তুমি।”
আবোলি, ইয়াসমিনি আর ডোরিয়ানকে নিয়ে নৌকাটা আবার দূরে সরে গেলো। ওরা হাত নাড়লো নৌকা থেকে। নৌকাটা দৃষ্টির আড়াল হতেই নোঙ্গর তোলার আদেশ দিলো টম। কু-রা কপিকল ঘোরানো শুরু করলো। নোঙ্গর উঠে আসা শুরু হতেই পায়ের নিচে সেই সুপরিচিত দুলুনিটা অনুভব করতে পারলো টম।
সাগরের অবাধ স্বাধীনতা টমের খুব পছন্দ। তবে এবার কাঁধে ঋণের বোঝার কারণে কিছুটা চিন্তিত ও। সারা জীবনে কখনো কারো কাছে থেকে ঋণ নেয়নি ও। তাই সারাক্ষণ ব্যাপারটা খচখচ করছে মনের ভিতর। এবারের যাত্রাটা তাই দ্রুত শেষ করার জন্যে মুখিয়ে আছে টম। দ্রুত সব শেষ করে লাভের টাকা দিয়ে দেনা শোধ করতে পারলে তবেই শান্তি। তারপরেই মুক্তভাবে শ্বাস নিতে পারবে ও।
*
সমুদ্র ওদের অনুকূলেই থাকলো। যদিও এখন মৌসুমের শেষ সময়, তবুও টম মনে করতে পারলো না কবে এতো ঝামেলাহীন যাত্রা করেছে ওরা। ক্রমাগত বাজে আবহাওয়া থাকার কারণে কেপ অফ গুড হোপ-এর নাম বদলে এখন সবাই কেপ অফ স্টর্মস ডাকা শুরু করেছে। কিন্তু ওখানেও ঝড়ের কোনো চিহ্ন দেখা গেলো না। কেস্ট্রেল-ও নিজের নামের প্রতি সুবিচার করলো। বাতাসের আগে আগে ছুটলো ওটা, যেনো খোলের তলে পানি না, পাতলা বাতাস। প্রতিদিনই টম এমন নতুন কিছু না কিছু আবিস্কার করতে লাগলো যা ওকে ওর নতুন জাহাজটা সম্পর্কে অবাক করেই চললো।
টম, ফ্রান্সিসের সাথেই বেশিরভাগ সময় কাটাতে লাগলো। ও যা যা পারে সবই ছেলেটাকে শিখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ঠিক ওর বাবাও যেভাবে প্রথম যাত্রায় ওকে সব শিখিয়েছিলো। ও ফ্রান্সিসকে জাহাজ চালনা শেখালোঃ কিভাবে সূর্যের অবস্থান দেখে অক্ষাংশ বের করতে হয়, কিভাবে লগ লাইন দিয়ে জাহাজের গতি মাপতে হয়। কপাস দিয়ে কিভাবে দিক ঠিক রাখতে হয়, কিভাবে হাল-এর পাশে বসানো ট্রাভার্স বোর্ডের সাহায্যে জাহাজ কতদূর অগ্রসর হলো সেটা বের করতে হয়-সবই শেখালো।
“অনেক চেষ্টার পরেও দ্রাঘিমাংশ বের করার কোনো পদ্ধতি এখনো কেউ বের করতে পারেনি,” ফ্রান্সিসকে বললো টম। “জাহাজের অবস্থান কতোটা পূর্ব বা পশ্চিমে তা সূর্য দেখে জানা যায়, কিন্তু উত্তর বা দক্ষিণে কতদূর আসলাম সেটা জানা সম্ভব না। সেটার জন্যে আমাদেরকে জাহাজের গতি আর স্রোত দেখে অনুমান করতে হবে।”
বিকেলে, অবসরে ওরা তরবারি দিয়ে অনুশীলন করতো। ফ্রান্সিস ওর সৎ বাবার কাছে থেকে ভালোই শিখেছে, সেই সাথে ওর নিজের বাবার কাছ থেকে পাওয়া স্বাভাবিক ক্ষিপ্রতা তো আছেই। আর এখন টমের তত্ত্বাবধানে ও সত্যিকার অর্থেই এক ভয়ানক যোদ্ধায় রূপান্তরিত হলো।
মাঝে মাঝে ভারি অস্ত্র-শস্ত্র নিয়েও অনুশীলন চলতো। কেস্ট্রেল-এ দশটা নয় পাউন্ডের কামান আছে। প্রতিদিন টম ওর সব লোকদেরকে সেগুলোর ব্যবহার প্রশিক্ষণ দিতে। কারণ, কোনো ঝামেলা ছাড়া ভারত পৌঁছাবে এটা ওরা কল্পনাতেও ভাবে না। আর সেজন্যে টম কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। যতক্ষণ পর্যন্ত না একজন নাবিক একেবারে ইংরেজ সৈন্যদলের সদস্যের মতো দ্রুত গোলা ছুঁড়তে পারে ততোক্ষণ টম অনুশীলন করিয়েই যেতো। সময়টা হচ্ছে সর্বোচ্চ দুই মিনিট। ফ্রান্সিসও বাকি সবার সাথে অনুশীলন করে। গেলো। অচিরেই ও বাকিদের মতো কামানের নল মুছে, তাতে গোলা ভরে, তাক করে ছোঁড়া শিখে গেলো।
“যদি সেরকম জরুরি পরিস্থিতি হয়-ই, তাহলে সেসময় যেনো প্রতি জোড়া হাতই আমাদের কাজে লাগে,” এক সন্ধ্যায় কথাটা বললো টম। “আমি আমার শেষ পয়সাটা পর্যন্ত এই যাত্রার পিছনে খরচ করেছি। কোনো ফালতু দস্যু এসে আরামে সেটা ছিনিয়ে নিয়ে যাবে তা আমি হতে দেবো না।”
“আপনি নিশ্চিত যে দস্যুরা আমাদেরকে আক্রমণ করবে?” ফ্রান্সিসের চেহারার অভিব্যক্তি দেখে টম হাসি গোপন করলো। ছেলেটা যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেকে প্রমাণের জন্যে আগ্রহে ফেটে পড়ছে।
