“ভারত যেতে অনেক সময় লাগবে রে পাগল,” জ্বলজ্বলে চোখে বললো টম।
একটা অতিরিক্ত বোঝাই ইন্ডিয়াম্যানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো পানসিটা। দুপুরের কড়া রোদে ওটা সোনার পাত বসানো কামানের খোপগুলো ঝকমক করছে। তা দেখে টমের শেরপা জাহাজটার কথা মনে পড়লো। ওটায় করেই ও প্রথম আফ্রিকায় এসেছিলো। ওর বাবা হাল-এর সাথে এসেছিলো ও। সোনা দিয়ে এরকম গিলটি করতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কতো টাকা খরচ হতে পারে ভাবলো টম। তবে ওদের মোট লাভের খুবই ক্ষুদ্র একটা অংশ এই বিলাসিতা দ্বারা প্রকাশ পায়।
“ওরে আল্লাহ্! এতে তো অনেক টাকা লাগার কথা!” ইয়াসমিনি বললো।
টম জানে ও ইন্ডিয়াম্যানটা সম্পর্কে কথা বলছে না। ও বলছে গত কয়েক সপ্তাহে ওদের খরচ করা টাকা সম্পর্কে। জাহাজটার দামই অনেক, কেপ টাউনে এরকম জাহাজ মাত্র কয়েকটাই আছে। শুরুতে ওটার মালিক দাম কমাতেই চাইছিলো না। কেনার আশা তাই এক প্রকার ছেড়েই দিয়েছিলো টম। ব্যাংক অফ হীরেনগ্রাচট-এ রাখা সব টাকা খরচের পরেও দেখা গেলো আরো টাকা দরকার ওদের। গত দশ বছর ধরে ইউরোপ জুড়ে স্প্যানিশ আগ্রাসন চলছে। সেই যুদ্ধের কারণে বন্দুক, পাউডার, গুলি, কার্তুজসহ আরো প্রায় শখানেক দরকারি জিনিসের দাম বেড়ে গিয়েছে।
“তবে টাকা দিয়ে কি পেয়েছি দেখো।” বলে টম পানসির মুখ সোজা করলো। ইন্ডিয়াম্যানের লেজের নিচ থেকে বেরিয়ে এলো পানসিটা। সামনেই ওদের নতুন জাহাজটা দাঁড়িয়ে। ডাচ নকশায় বানানো একটা তিন মাস্তুলের জাহাজ। এগুলোকে বলা হয় স্কুনিয়ার্স, অর্থ ‘অত্যন্ত সুন্দর। ইংরেজিতে শব্দটা হচ্ছে ‘স্কুনার্স। এই নামটা যথাযথ। জাহাজটা বিশাল ইন্ডিয়াম্যানগুলোর চাইতে লম্বা কিন্তু সরু, সারা গায়ে মার্জত নকশা কাটা। ওটার সামনে লাগানো সমুদ্র পরীর ভাস্কর্য থেকে শুরু করে পিছন দিকের থাকার জায়গা পর্যন্ত সবই মনোহর। জাহাজটা কেপ টাউনে আসামাত্র টমের মনে ধরে যায়। ও জাহাজটার নাম দিয়েছে কেস্ট্রেল-একটা পাখির নাম। ডেভনে থাকার সময় টম প্রায়ই এই পাখি শিকারে যেভো। নামের সার্থকতা রাখতেই যেনো জাহজাটা সামান্য বাতাসেও প্রায় উড়ে চলতে পারে।
বন্দরের জাহাজের সারির পিছনে ওটাকে নোঙ্গর করে রাখা। পাশেই ভাসছে কোর্টনীদের আদি আর অকৃত্রিম সেবক সেন্টারাস। জায়গাটা দুর্গের কামানের গোলার আওতার বাইরে। এই আগাম সতর্কতাটা টম শিখেছে ওর বাবার কাছ থেকে।
টম পানসিটা কেট্রেল-এর পাশে এনে দাঁড় করালো। তারপর একজন একজন করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো উপরে। আবোলি আগেই এসে উঠেছে, শেষ সময়ের প্রস্তুতি তদারকি করছে। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে আছে পাশে। সবকিছু মনোযোগ দিয়ে দেখছে আর হাতের খাতায় লিখে রাখছে।
সিঁড়ির মাথায় টমের মাথাটা দেখা যেতেই ও দৌড়ে গেলো সেদিকে।
“আসেন চাচা। সবকিছু রেডি। বাতাসও আছে প্রচুর। আবোলি বললো আপনার আদেশ পেলেই নোঙ্গর তুলে ফেলা যাবে।”
ছেলেটার আগ্রহ দেখে হাসলো টম। কেস্ট্রেল কেনা শেষ হওয়া মাত্র টম ফ্রান্সিসকে জাহাজে থাকতে পাঠিয়ে দিয়েছিলো। যাতে লোকজন জ্যাকব দ্য সি আর অন্যান্য লোকগুলোর নিখোঁজ হওয়ার সাথে ফ্রান্সিসের আগমনকে মেলাতে না পারে। আবোলি ওকে সব ভালো খবরই দিলো। ফ্রান্সিস খুবই আগ্রহী ছাত্র। খুব দ্রুত সব শিখে নেয়, আর কাজকর্মেও পটু। যদিও আফ্রিকা আসার আগে কোনোদিনও কোনো জাহাজে পা দেয়নি ও। তবে সব দেখেশুনে টম ওর মধ্যে এক দুর্দান্ত নাবিকের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলো।
“ব্যবসার ক্ষেত্রে ওর মাথা ব্ল্যাক বিলির মতোই,” একরাতে আবোলি বলেছিলো টমকে। “কিন্তু মনটা একদম ওর মায়ের মতো।”
টম হঠাৎ খেয়াল করলো ফ্রান্সিস আর ওর দিকে তাকিয়ে নেই, ওর কাঁধের উপর দিয়ে তাকিয়ে আছে। জাহাজ বা এটার কোনোকিছুই যেনো আর ওর মাথায় নেই। চেহারা বিমলানন্দে উদ্ভাসিত হয়ে আছে। অ্যানা উঠে এসেছে জাহাজে।
এই দুজনের দিকে নজর রাখতে হবে, মনে মনে বললো টম। আবোলি শুধু ফ্রান্সিসের শেখার দক্ষতা সম্পর্কেই টমকে বলেনি। ও আরো জানিয়েছে, “ছেলেটা প্রেমে পড়েছে, ক্লিবি। যখনই অ্যানা জাহাজে আসে ও সব কাজ ভুলে ওকে নিয়েই পড়ে থাকে।”
“আরে বাচ্চা একটা ছেলে।” টম অবাক হয়ে বলেছে। “আর অ্যানা বড় একটা মেয়ে।” তবে ভালো করে ভেবে বুঝলো দুজনের বয়সের পার্থক্য খুব বেশি না। “অ্যানারও কি একইরকম অবস্থা নাকি?”
“অ্যানা এখনো ফ্রান্সিসকে ঐ নজরে দেখে না,” আবোলি বলেছে। “কিন্তু আমাদের যাত্রাটা অনেক লম্বা হবে। আর সে জন্যেই সম্ভবত ফ্রান্সিস বেশি বেশি আশা করছে।”
টম দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ফ্রান্সিস বা অ্যানা দুজনের কেউই আর ছোট নেই। দুজনেই প্রাপ্তবয়স্ক, যাকে ইচ্ছে বিয়ে করতে পারে ওরা। কিন্তু ও ফ্রান্সিসের জন্যে একটা দায়িতুবোধ অনুভব করে, নিজের আপন সন্তান থাকলেও এমনটাই অনুভব করতো। আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে ও খুব ভাল মতোই জানে যে জাহাজের মতো এইরকম বদ্ধ পরিবেশে যে ভালোবাসার সম্পর্কগুলো হয়, সেগুলোর পরিণতি সাধারণত শেষমেশ ভালো হয় না।
সারাহ ওর পাশে এসে দাঁড়ালো। “ফ্রান্সিস, মিষ্টি করে ডাকলো ও। “তুমি কি কষ্ট করে মিস দুয়ার্তের ব্যাগপত্র তার বার্থে দিয়ে আসতে পারবে?”
