“আমাকে খুঁজে বের করে ফেলেছো?” তামান্না অবাক হয়েছে বোঝা গেলো।
রাগের চোটে ক্রিস্টোফারের ইচ্ছে করছিলো তখনি দৌড়ে গিয়ে ওর টুটি চেপে ধরে। কিন্তু তামান্নার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে কিছু একটা ছিলো, যে জন্য ও সামনে আগালোে না। যেনো ওর ভিতর লুকানো একটা শক্তি আছে-আর সেজন্যেই ওর চেহারায় এক অদ্ভুত আত্মতুষ্টি ফুটে আছে। এই ব্যাপারটাই ক্রিস্টোফারের রাগকে কমিয়ে সচেতন করে তুললো।
“চুনিগুলো কোথায়?” জানতে চাইলো ক্রিস্টোফার।
“নিরাপদ কোনো জায়গায়। তোমার বন্ধু জয়ন্তন কিন্তু খুবই বিশ্বস্ত। আমাকে আসতে দেখে ও চেষ্টা করেছিলো পাথরগুলো গিলে ফেলতে, যাতে ওর মালিকের সম্পদ রক্ষা পায়। শেষে তাই ওর বুক কেটে সেগুলো বের করতে হয়েছে।”
“এজন্যে তোকে পস্তাতে হবে।”
“তুমিও একই কাজ করতে। ওর দিকে তুমি কিভাবে তাকাও সেটা আমি কালই দেখেছি। তোমার মনের ভিতর কি আছে জানি আমি।”
ক্রিস্টোফার ওর কথার প্রতিবাদ করলো না। কিন্তু এখনতো আমি তোকে বাগে পেয়েছি।”
“তাই নাকি?” জিভ দিয়ে চুক চুক শব্দ করলো তামান্না। পাথরের আড়াল থেকে পাঁচজন লোক বেরিয়ে এলো। চেহারা রুক্ষ, মুখে না কামানো দাড়ি, পরনে ছেঁড়া পোশাক। সবার হাতে ধরলো ছোরা।
“আমার তো মনে হচ্ছে তোমাকে বাগে পেয়ে গিয়েছি।”
“আমাকে আটকাতে হলে এই কয়জন দিয়ে হবে না।” বলতে বলতে ক্রিস্টোফার তামান্নার পাশে দাঁড়ানো লোকগুলোর চেহারা দেখে নিলো। কে সবচে দ্রুত বা কে সবার আগে আক্রমণ করতে পারে সেই চিন্তা করছে। কাকে খুন করতে সবচেয়ে কষ্ট হবে? কিন্তু সেরকম কিছুই ঠাহর করতে পারলো না।
“যে কাছে আসবে, তারই কল্লা ফেলে দেবো,” সাবধান করলো ক্রিস্টোফার। তামান্না দশ গজ মতো দূরে দাঁড়িয়ে। উরুমির আওতার সামান্য বাইরে। ও সামনে এগিয়ে আক্রমণের লক্ষ্যে শরীরকে প্রস্তুত করে ফেললো।
তামান্না শরীরের পিছনে হাত দিয়ে কোমর থেকে একটা লম্বা পিতলের নলের পিস্তল বের করে আনলো। তারপর আলতো করে সেটা ক্রিস্টোফারের দিকে তাক করে হ্যাঁমার টেনে ধরলো।
ক্রিস্টোফার জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলো। ওর মুখের অক্ষম ক্রোধ দেখতে পেয়ে হেসে দিলো তামান্না। “কালারির সেরা যোদ্ধার পক্ষেও বুলেটের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব না।”
“তাহলে আমাকে এখানে টেনে আনার মানে কি? জয়ন্তনের মতো আমাকে ঘুমের মধ্যে মেরে রেখে আসলেই তো হতো।”
“কারণ আমি তোমাকে খুন করতে চাইনি।” ক্রিস্টোফার আরো এক চুল আগালো। কিন্তু আর একটুও সামনে বাড়ার চেষ্টা করলে সেটা করতে বাধ্য হবো।”
“কেনো?”
“বাকি জীবন কি এই আনা নেওয়ার কাজই করে যেতে চাও? ওই ভোটকা ব্যাটার সেবা করে যেতে চাও যাকে তুমি এক ঘুষিতে পরপারে পাঠিয়ে দিতে পারবে? শুধু টাকা আছে বলে ওরা তোমার উপর ছড়ি ঘুরিয়া যাবে? তুমি কিভাবে ঊরুমি চালাতে পারো সেটা আমি দেখেছি। তোমার মতো একজন যোদ্ধা মালাবার উপকূলের ত্রাস হতে পারবে।”
“তাতে কি হবো আমি? দস্যু?”
“মুক্ত হবে।”
তামান্না বন্দুকের নলটা নামালো। ওর বাহু অনেক সরু, কিন্তু একবারের জন্যেও সেটা কাপলো না।
“কোন পক্ষে যোগ দিতে চাও ভেবে দেখো?”
*
“আমরা ঠিক কাজটাই করছি, তাই না?” টম জোরে জোরে চিন্তা করছে।
ও আর ডোরিয়ান পানসি নৌকাটার পিছন দিকে বসে আছে। এক হাতে হালটা ধরে আছে টম। টেবিল উপসাগরের বন্দরে ভীড়ে থাকা সওদাগরি জাহাজগুলোর ফাঁক দিয়ে পানসিটা এগিয়ে যাচ্ছে। সারাহ, ইয়াসমিনি আর অ্যানা বসেছে মুখোমুখি। ওদের পিছনে আলফ উইলসন আর তার সহযোগীরা নিখুঁত ঐকতানে দাঁড় বাইছে। আলফের বাবার বাড়ি ছিলো ব্রিস্টলে। তবে ওর গায়ের গাঢ় রঙটা পেয়েছে মায়ের কাছ থেকে। তিনি ছিলেন উচ্চ বংশের মঙ্গোলিয়ান মহিলা। আলফ নিজের জন্মভূমিতে ফিরতে পেরে কতোটা আনন্দিত সেটা টম বুঝতে পারছে।
“যদি আমরা সব ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারতাম যে কি হতে যাচ্ছে তাহলে বলতাম যে অবশ্যই ভুল পথে যাচ্ছি আমরা,” হেসে বললো ডোরিয়ান। “অনিশ্চয়তাই তো রোমাঞ্চের কারণ।”
সারাহ টমের দিকে ভ্রুকুটি করলো। “তোমাকেতো এরকম অস্থির দেখিনা কখনো।”
“আমি আসলে জোরে জোরে চিন্তা করছিলাম।” সত্যি কথা হচ্ছে ফ্রান্সিস ওকে খুন করার অভিপ্রায়ে উদয় হওয়ার সেই রুদ্ধশ্বাস রাতটার পর থেকে ও অনিশ্চয়তায় থাকার আর কোনো সুযোগ পায়নি। কারণ এরপর থেকেই শুরু হয় অনবরত কাজ : একটা জাহাজ কিনে সেটাকে সুসজ্জিত করা, ওটায় এমন সব মাল ভর্তি করা যেগুলো ভারতে বিক্রি করলে প্রাচুর দাম পাওয়া যাবে, তারপর জাহাজকে চালানোর জন্য লোকবল জোগাড় করা। টম এসবের প্রতিটা খুঁটিনাটি নিজে নজরদারি করেছে। প্রতিদিন সূর্যের আগে ঘুম ভাঙতে ওর, বাসায় ফিরতে গভীর রাতে। ফিরেই লণ্ঠনের আলোয় সারাদিনের ব্যয়ের হিসেব কষতে বসে যেতো।
“অনেকের স্বামী-ই সমুদ্রে গিয়ে আর ফিরে আসে না। এরকম কিন্তু অনেক নজির আছে,” সারাহ বললো। “জাহাজে থাকার সময় তাই ওকে সবসময় চোখে চোখে রাখি।”
টম ওর হাত ধরলো। “যখন আমরা সমুদ্রে থাকবো, তখন আমার চোখ থাকবে শুধু তোমার দিকে।”
“তোমার চোখ থাকবে দিগন্তে, আবহাওয়ায়, পাল খাটানোয় আর তোমার লোকেদের দেখাশোনায়,” মুখ বাঁকিয়ে বললো সারাহ। “তবে আমার কাছ থেকে বেশি দূরে তো আর যেতে পারবে না।”
