রুথ, ক্রিস্টোফারের মনের গহীন একটা কোণ থেক আর্তনাদ ভেসে এলো। কিন্তু ও পাত্তা দিলো না। কামনা ওকে বশ করে ফেলেছে। মনে হচ্ছে শরীরের ভিতর একটা আগুন বইছে। এই আগুন চাপিয়ে রাখা আর ওর পক্ষে সম্ভব না।
*
ক্রিস্টোফারের ঘুম ভাঙলো দেরিতে। কালারিতে যখন থাকে তখন সবসময়ই ও সূর্য ওঠার আগেই উঠে নিজের যা কাজকর্ম সব সেরে নেয়। কারণ সূর্য উঠতে না উঠতেই অনুশীলন শুরু হয়ে যায়। শেষ কবে সূর্যোদয়ের পর ঘুম ভেঙ্গেছে মনে নেই ওর।
আরামটা ও উপভোগ করলো কিছুক্ষণ। কাল রাতের সবকিছু মনে আসছে, এতে স্পষ্টভাবে যে আবারও ওর কামনা জাগ্রত হতে শুরু করলো। আসলেই কি কাল রাতের সব সত্যি ছিলো? নাকি সব স্বপ্ন? না। তামান্নার শরীরের ঘ্রাণ এখনো নিজের শরীরে লাগে আছে ওর। নারিকেল, সুগন্ধি আর ঘামের গন্ধ।
চেহারায় চওড়া একটা হাসি খেলে গেলো ওর। শরীর এখনো ম্যাজ ম্যাজ করছে, তাই চামড়ার উপর সূর্যের নরম উত্তাপটা আরো বেশি ভালো লাগছে। ও একটা হাত বাড়িয়ে দিলো, কিন্তু তামান্না পাশে নেই। সম্ভবত ও চায়নি জয়ন্তন যেনো ওদেরকে একসাথে দেখে ফেলে। ক্রিস্টোফার উঠে বসে চারপাশে তাকালো।
তামান্নার কম্বলটা দেখা যাচ্ছে। মাড়ানো ঘাসের উপর পড়ে আছে। গাধাটাও একই জায়গায় বাঁধা। আগাছা চিবুচ্ছে। কিন্তু মেয়েটা কোথাও নেই।
একটা কাক এসে মন্দিরের গম্বুজের উপর বসলো। বেলা হয়ে গেলেও, জয়ন্তন কেন এখনো ওকে জাগিয়ে দেয়নি ভেবে অবাক হলো ক্রিস্টোফার। সাধারণত, ওর কোনো ত্রুটি ধরতে পারলে বিমলানন্দ লাভ করে জয়ন্তন।
নিতান্ত অনিচ্ছায় ও জয়ন্তনকে খুঁজতে গেলো। মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই দেখলো কাকটা দরজার ভিতরে, মাটিতে পড়ে থাকা কিছু একটায় ঠোকরাচ্ছে। কিন্তু ক্রিস্টোফারের অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে না যে জিনিসটা কি। কাকের পাশে একদল মাছি ভনভন করছে। সিঁড়ির মাথায় উঠে আসতেই ওকে দেখে কয়েকটা ইঁদুর দৌড়ে পালালো। জয়ন্তনকে দেওয়া ওর সাবধানবাণী মনে পড়লো। এসব পুরনো দালান হচ্ছে পোকা মাকড়ের আখড়া।
বাইরের উজ্জ্বল সূর্যালোকের কারণে অন্ধকারে চোখ সয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগলো ক্রিস্টোফারের। তারপর আরো কিছুটা সময় লাগলো মাটিতে পড়ে থাকা জিনিসটা কি সেটা বুঝতে।
জয়ন্তন চিত হয়ে শুয়ে আছে, তবে সে ঘুমাচ্ছে না। গলা থেকে বুকের মাঝ বরাবর নিখুঁতভাবে কাটা। এতো বড় হা হয়ে আছে জায়গাটা যে নিচের মেরুদণ্ড পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। চুনি ভরা ব্যাগটা নেই। চারপাশ ঘিরে শুকিয়ে আসা রক্তের ছোটখাটো একটা পুকুর দেখা যাচ্ছে। মাছিতে ভরে আছে সেটা। রক্তের কিনারায় পাথরের উপর ছোট একটা পায়ের ছাপ। গত রাতে এই পা টাই ওকে সর্বশক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলো।
রাগে উন্মাদ হয়ে বাইরে দৌড়ে এলো ক্রিস্টোফার। দুত হাতে তরবারিটা তুলে নিলো ও। তারপর উরুমি-টা বেঁধে ছুটে গেলো রাস্তায়।
ভোরের কুয়াশায় রাস্তার ধুলো মরে গিয়েছে। আর এতো সকালে এখানে আর কারোই আসার সম্ভাবনা নেই। তাই তামান্নার খালি পায়ের ছাপগুলো স্পষ্টভাবেই দেখতে পেলো ও। সেগুলো অনুসরণ করে পাহাড়ে উঠে এলো ক্রিস্টোফার। প্রতিটা পদক্ষেপে রাগ আরো বাড়ছে ওর। কোমরে ঝুলানো উরুমি-টা হিস হিস করছে। আর ও মনে অনে ভাবছে তামান্নাকে ধরার পর এটা দিয়ে ওকে কি করবে।
রাস্তা ধরে কিছুদুর যাওয়ার পরেই পায়ের ছাপ দিক পরিবর্তন করে একটা ছাগল চরার রাস্তা ধরে এগিয়ে গিয়েছে। একটা পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে মিশেছে সেটা। রাস্তাটা পাথরের। তামান্নার হালকা পা তাই এখানে কোনো ছাপ ফেলেনি। ও কি এদিক দিয়েই গিয়েছে? নাকি ওর পিছু নেওয়া থামানোর জন্যে ধোঁকাবাজি করেছে।
তামান্না শুরু থেকেই ক্রিস্টোফারকে ধোঁকা দিয়ে এসেছে। আমের বাগান, গরীব বাবা যে কিনা ওর যৌতুক দিতে পারে না-সব মিথ্যা। ধর্ষণটাও নাটক। জয়ন্তনের কথা-ই ঠিক 1. কিন্তু অতিরিক্ত রাগের কারণে ক্রিস্টোফার অনুতাপ বোধ করলো না। ওই ধর্ষক লোকটাও নিশ্চয়ই তামান্নারই সাথের কেউ। ক্রিস্টোফার কাছে আসামাত্র পালিয়ে যাবে, পরে রাত নামলে তামান্নার কাছে ফিরে আসবে-এই ছিলো ওদের পরিকল্পনা। তবে ওদের পরিকল্পনার এই অংশটুকু মাঠে মারা গিয়েছে।
কিন্তু সুযোগ থাকার পরেও তামান্না কেন ওকে খুন করেনি সেটা ভেবে অবাক হচ্ছে ও। আবেগ? ওর সাথে থাকার সময় তামান্নার কেমন লাগতো সেটা মনে পড়লো ওর। ওর স্পর্শের অনুভূতি মনে আসতেই রাগে হাত মুঠো করে ফেললো ও। একবার ধরতে পারলে জীবনের শিক্ষা দিয়ে দেবে।
ক্রিস্টোফার রাস্তা ধরে আরো কিছুটা গিয়ে পরীক্ষা করে দেখলো, কিন্তু আর কোনো পায়ের ছাপ পাওয়া গেলো না। তার মানে ছাগল চলার রাস্তা ধরেই গিয়েছে মেয়েটা। ও-ও সেদিকেই এগিয়ে পর্বতের খাড়া গা বেয়ে উঠতে শুরু করলো। ও মাটিতে ছাপ বের করায় খুব বেশি দক্ষ না, তবে এক জায়গায় সামান্য নরম মাটিতে ও আবার একটা পায়ের ছাপ খুঁজে পেলো। এখনো তাজা। উরুমির প্যাঁচ খুলতে খুলতে আরো জোরে ছুটলো ও।
পথটা পর্বতের চারপাশ ঘুরে তারপর উপরে উঠেছে। খানিকটা উঠতেই আচমকা একটা গিরিখাত দেখা গেলো সামনে। আর ওখানেই তামান্না দাঁড়িয়ে। একাকী। একটা পাথরের চাই-এর উপর নিরস্ত্র দাঁড়িয়ে আছে। ও নিশ্চয়ই ক্রিস্টোফারের আসার শব্দ শুনেছে কিন্তু পালানোর কোনো চেষ্টাই করেনি দেখা যাচ্ছে। এখন আর শাড়ি পরা নেই। শুধু কাচুলি আর হরিণের চামড়ার পায়জামা পরনে। ওটা ক্রিস্টোফার আগে দেখেনি।
