“কতো পেয়েছো লবণ থেকে?”
“বিশ রুপি” ক্রিস্টোফার জবাব দিলো।
দেওয়ান সন্দেহজনক ভঙ্গিতে মুদ্রাগুলো গুনলো। প্রতিটা পয়সা কামড়ে দেখে নিলো যে ঠিক আছে কিনা। তারপর ছোট্ট একটা নিক্তিতে মেপে দেখলো।
“ঠিক আছে,” কেমন বিরক্ত ভঙ্গিতে বললো লোকটা।
পরশুরাম ক্রিস্টোফারের দিকে চেয়ে হাসলো। “আমার দেওয়ান, জয়ন্তন তোমাকে বিশ্বাস করে না। সেজন্যে লবণের প্রথম বস্তাটার ভিতর নিয়ুরের সওদাগরের কাছে একটা চিঠি পাঠিয়েছিলাম আমি। তাতে লিখে দিয়েছিলাম যে, লবণ কতো দামে বিক্রি হলো সেটা জানিয়ে যেনো তার সবচেয়ে দ্রুতগামী লোকটাকে পাঠিয়ে দেয়।”
ক্রিস্টোফারের চেহারা লাল হয়ে গেলো। “আপনি আমাকে টাকা পয়সার ব্যাপারে বিশ্বাস করেন না?”
“এখন করি।” বলে উনি দুটো পয়সা নিয়ে ক্রিস্টোফারকে দিলেন। “আপাতত এটা তোমার ভাগ। তবে শিগগিরিই আবার খবর পাঠাবো। আমি যাদেরকে বিশ্বাস করি তাদের জন্যে কাজের অভাব হয় না।”
পরের কয়েক মাস ক্রিস্টোফার দারুণ কাজ দেখালো। ভিন্ন ভিন্ন শহর, ভিন্ন ভিন্ন মালামাল। কখনো ক্রিস্টোফার একা গেলো, কখনো সাথে থাকলো কেউ। কয়েকবার অবশ্য মাস্তানের খপ্পরে পড়েছিলো, কিন্তু ক্রিস্টোফারের তরবারি দেখেই ভেগেছে সব। প্রতিবারই ক্রিস্টোফার তাই হতাশ-ই হয়েছে। ভিতরে ভিতরে উত্তেজনায় ফুটছে ও, একেবার ধনুকের ছিলার মতো টানটান হয়ে আছে বলা যায়। উত্তেজনা কমাতে মঞ্চের লড়াইতে এতো ভয়ংকরভাবে লড়াই করতে যে একদিন একজনকে প্রায় অন্ধ-ই করে ফেলেছিলো।
“তোমাকে দুই নম্বরে কোন নীতিটা শিখিয়েছি?” রঞ্জন জিজ্ঞেস করলেন।
“ছানিগা,” গোমড়া মুখে বললো ক্রিস্টোফার।
“আর ছানিগা কি জিনিস?”
“ধৈর্য।”
*
একদিন পরশুরামের দেওয়ান জয়ন্তন কালারি-তে এসে উপস্থিত। “মালিক তোমাকে খবর দিয়েছেন।”
পরশুরামের বাড়িতে পৌঁছালে উনি ক্রিস্টোফারকে একটা ব্যাগ ধরিয়ে দিলেন। ওটার কাঠের জালির ঢাকনার ভিতর দিয়ে নরম আলোয় অনেকগুলো চুনি ঝিকমিকিয়ে উঠলো।
“মাদুরা-তে এক তামিল সওদাগরের কাছে নিয়ে যেতে হবে এগুলো। শহরটা পাহাড়ের ওপাশে। যেতেও সময় লাগবে অনেক। আর পাহাড়ের রাস্তাটা ডাকাত দিয়ে ভরা।”
ক্রিস্টোফারের কানে কথাগুলো গেলো বলে মনে হলো না। ও একদৃষ্টিতে চুনিগুলো দেখছে। বেশ্যাখানার দরজায় দাঁড়ানো এক বেশ্যার মতোই ওগুলো যেনো ওর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপছে। একটা শয়তানি চিন্তার উদয় হলো ওর মনেঃ চাইলে এই দুজনকে খুন করে এগুলো নিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। তাহলেই ওর রুথকে বিয়ে করার মতো যথেষ্ট রুপি হয়ে যাবে। ক্রিস্টোফারের সারা শরীরে শিহরণ বইতে লাগলো। নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে ভালোই ধারণা আছে ওর।
তিন নম্বর নীতিটা কি? রঞ্জনের কণ্ঠ ভেসে এলো ওর কানে।
আত্ম-নিয়ন্ত্রণ, নিজের ভিতরের সত্ত্বা জবাব দিলো।
ও জোর করে নিজের চিন্তা আড়াল করলো।
“জয়ন্তন তোমার সাথে যাবে,” পরশুরাম বললেন। মৃত্যুর কতো কাছে থেকে মাত্র ফিরে এসেছেন সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণাও নেই। শুধু তোমরা দুজন। আমি এক গাড়ি ভর্তি লোক পাঠাতে পারতাম-কিন্তু তাতে করে সবাই ই ব্যাপারটা খেয়াল করবে। আর সেই গন্ধে এখান থেক দিল্লি পর্যন্ত সব শয়তানের দলে এসে হাজির হবে। তাই বিশ জনের পক্ষে সম্ভব না হলেও দুই জনে আশা করা যায় যে ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে পারবে।”
ক্রিস্টোফার মাথা ঝোঁকালো, “আমি আপনার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখবো।”
পরের দিনই বের হয়ে গেলো ওরা। সমুদ্র পিছনে রেখে আরো ভিতরের দিকে গন্তব্য ওদের। রাস্তাটা একটা উপবনের ভিতর দিয়ে চলে গিয়েছে। বৃষ্টির কারণে কাদা জমে আছে এখানে সেখানে। গাড়ি-ঘোড়া নেই বললেই চলে। রাস্তার দু’ধারে তেঁতুল গাছের সারি। সেখান থেকে ভেসে আসছে নানা পাখির ডাক। তবে সেটা চাপা পড়ে যাচ্ছে তাঁত যন্ত্রের খটখট শব্দে। রাস্তার ধারে বসে তাঁতিরা কাপড় বুনছে।
ক্রিস্টোফার ওর জীবনের প্রায় পুরোটাই ভারতে কাটিয়েছে, কিন্তু এই প্রথম ও সমুদ্র থেকে এতো ভিতরে আসলো। এমনকি পরশুরামের হয়ে কাজ করতে যেসব জায়গায় গিয়েছে সেগুলোও ছিলো সব সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা। বেলা বাড়তেই জনমানুষের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে এলো। একটু পরেই তাঁতের খট খট শব্দ মিলিয়ে গিয়ে, অজানা সব পাখির ডাক ভেসে আসতে লাগলো কানে।
প্রথম রাত ওরা রাস্তার ধারের একটা মন্দিরে কাটালো। পরের দিনে দেখা গেলো রাস্তা সোজা ঘাট বরাবর উঠে গিয়েছে। ঘাট হচ্ছে বিশাল এক পর্বতের সারি। ভারতের পশ্চিম উপকূলে ওগুলো ঠিক এক সারি দুর্গের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে এলো। আশেপাশের জঙ্গলও ঘন হচ্ছে ধীরে ধীরে। ওরা বিশাল বিশাল কাঠের গাছ আর বাঁশ দিয়ে ভরা এক বনের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চললো। আগে কখনো এখানে মানুষের পা পড়েছে কিনা কেউ জানে না। প্রকাণ্ড সব লতা গুলা আর অর্কিড-ও দেখা গেলো। প্রচুর আগাছা মাটিতে, তুলা গাছের লাল রঙের ফুল পড়ে আছে সেগুলোর ফাঁকে ফাঁকে, দেখে মনে হচ্ছে রক্তের ফোঁটা।
ওরা অবশ্য রাস্তায় একা ছিলো না। কয়েকজন কুলিও ছিলো সাথে। বিশাল ভারি বোঝা বয়ে নিয়ে চলেছে মাথায়। ওগুলোতে আছে নারিকেলের ছোবড়ার পার্টি, ফলের ঝুড়ি। প্রতিবারই ওরা কাছাকাছি আসতেই জয়ন্তন ক্রিস্টোফারের হাত চেপে ধরে কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে, “খুব সাবধান।”
