ওর দিকে না তাকিয়েই মিস্ত্রীটা কিছু একটা বললো। কিন্তু ভাষাটা এখানকার স্থানীয় হওয়ায় ক্রিস্টোফার বিন্দু বিসর্গ-ও বুঝলো না।
“কি বললেন উনি?”
“বললো যে এই মূর্তিটা আগে থেকেই কাঠের ভিতরে আছে। ওর কাজ হচ্ছে শুধু বাইরের অতিরিক্ত অংশটা বাদ দিয়ে ভিতরে যা আছে বের করে আনা। বাটালির প্রতিটা আঘাতে আসলে জিনিসটা আরো বেশি নিজেতে পরিণত হচ্ছে।” বলে রঞ্জন ক্রিস্টোফারের দিকে তাকালেন। “তোমার কি মনে হয় কাঠের অনুভূতি আছে?”
“না।“
“হিন্দু পুরানি অনুযায়ী প্রতিটা জীবিত জিনিসের চেতনা আছে। এমনকি গাছেরাও অনেক কিছু অনুভব করতে পারে। যদি তা-ই হয়, তাহলে কি তোমার মনে হয় যে কাঠ এই নিজের শরীরে খোদাই করাটা উপভোগ করে?”
মিস্ত্রী আবার হাতুড়ি চালালো, বাটালির ধারালো মাথা কামড় বসালো কাঠের গায়ে।
“প্রচণ্ড ব্যথা পাওয়ার কথা।”
“প্রতিটা আঘাত কিন্তু ও যে জিনিস সেটাতেই পরিণত করছে ওকে। রাস্ত টিা অনেক কঠিন, আবসালম-কিন্তু গন্তব্য…” বলে উনি একটা গণেশের মূর্তির গায়ে চাপড় মারলেন। মূর্তির মাথাটা হাতীর। এতোটাই নিখুঁত যে ক্রিস্টোফারের মনে হলো যে কোনো মুহূর্তে ওটা শুড় নেড়ে উঠে দাঁড়াবে।
“গন্তব্যই আমাদের আসল পরিচয়টা বের করে আনে।”
*
যখন অনুশীলন করে না, তখন ক্রিস্টোফার কাজ করে নিজের থাকা খাওয়ার ব্যয় মেটায়। শুরুর দিকে গাছ কেটে লাকড়ি সংগ্রহ করতে বা সবজির বাগানে কাজ করতো। যখন এক জিনিস খেতে খেতে সবাই বিরক্ত হয়ে যেতো তখন রঞ্জন ওকে বাজারে পণ্য বিনিময় করতে পাঠাতেন। লড়াই করার সময়টা বাদে এই সময়টা ক্রিস্টোফারের খুব ভালো লাগতো। বহু কষ্টে ও স্থানীয় ভাষা আয়ত্ত করেছে। তবে বেশ তাড়াতাড়িই পেরেছে শিখতে। বার বার আসা যাওয়া করতে করতে সওদাগরেরো চিনে ফেললো ওকে। তবে ক্রিস্টোফার দোকানে আসলে মোটেও খুশি হতো না তারা। কারণ ও দামাদামিতে খুবই পটু, একেবারে একটা পয়সা পর্যন্ত ছাড় দিতে রাজি হয় না।
একদিন বাজারের ভিতর এক ভারতীয় ওর সাথে কথা বলতে এগিয়ে এলো। হাত ভরা সোনার আংটি তার সাথের চাকরেরা বাতাস করে পাশের মাছি তাড়িয়ে দিচ্ছে। ক্রিস্টোফার লোকটাকে এড়িয়ে সরে যেতে চাইলো, কিন্তু লোকটার চেহারায় চোখ পড়তেই থমকে গেলো ও। একজন চাকর এগিয়ে এলো ওর দিকে। লোকটার পরনে চটকদার পোশাক, মাথার পাগড়িতে একটা পান্না বসানো পিন লাগানো। গায়ের কাপড়ে সোনার সুতোর কাজ করা-এক ধনী লোকের দেওয়ানের যেমনটা হওয়া উচিত, ঠিক তেমন। লোকটার পুরু ঠোঁট, পানের লাল রসে আরো বেশি স্পষ্ট হয়ে আছে।
“ইনি হচ্ছেন আমার মালিক পরশুরাম,” ঘোষণা দিলো দেওয়ান লোকটা। ক্রিস্টোফারের কাছ থেকে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রাখছে সে, উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা এমনটাই করে। পরদেশীদের স্পর্শে নাকি ওদের জাত যায়। “উনি এই শহরের সবচেয়ে ধনী সওদাগর।”
পরশুরাম ক্রিস্টোফারের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। “তোমার কথা শুনেছি আমি। তুমি নাকি কালারির এক ভীষণ যোদ্ধা!”
ক্রিস্টোফার মাথা নোয়ালো।
“সবাই বলে তুমি নাকি দামাদামিতে সওদাগরদের একেবারে কাঁদিয়ে ছাড়ো?”
“আমার বাবা শিখিয়েছেন যে, দামাদামিতে শেষ বলে কিছু নেই।”
“সেটাই-তবে সবাই কিন্তু সেটা পারেনা। তোমার মতো একজন হলে আমার খুব সুবিধা হয়।”
“আমাদের মালিকের কিছু জিনিস নিয়ুর শহরে নিতে হবে,” দেওয়ান। বললো আবার। “রাস্তাঘাট ভালো না আর ওটা যখন এসে পৌঁছাবে তখন সবচেয়ে সেরা দামেই বিক্রি করতে ইচ্ছুক উনি। সেজন্যে তুমিই সবচে উপযুক্ত লোক।”
“জিনিসটা কি?”
“লবণ।”
“বিনিময়ে, পরাম বললেন। “লাভের পাঁচ ভাগ দেবো আমি তোমাকে।”
“বিশ ভাগ, ক্রিস্টোফার বললো।
ক্রিস্টোফারের দাবি শুনে দেওয়ান হতভম্ব হয়ে গেলো, তবে পরশুরাম হেসে দিলেন। “আসলেই তোমার গুণ আছে। ঠিক আছে দশ ভাগে রাজি হয়ে যাও।” কিন্তু ক্রিস্টোফারের চেহারায় না বোধক অভিব্যক্তি দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি যোগ করলেন, “যদি এবার সব ভালোয় ভালোয় করতে পারো, তাহলে সামনে আরো কাজ দেবো তোমাকে। আমি অনেক জিনিসের ব্যবসা করি। লবণের চাইতেও আরো অনেক বেশি দামি জিনিসের ব্যবসা আমার আছে।”
“আমাকে আমার মালিকের অনুমতি নিতে হবে,” বলে ক্রিস্টোফার বিদায় নিলো।
রঞ্জনকে বলতেই উনি আশীর্বাদের ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে দিলেন।
“আমি তোমার মালিক নই, বা তুমিও আমার গোলাম নও। তুমি যতোক্ষণ আমার সাথে থাকবে আমি ততোক্ষণ তোমাকে শিক্ষা দেবো। তুমি যদি অন্য কিছু পছন্দ করো তো যেতে পারো।”
“আমি কি প্রস্তুত?”
রঞ্জন নিজের হাতের তালুর দিকে তাকালেন, “লড়াইয়ের প্রথম নীতিটা কি?”
“কখনো ইচ্ছা করে লড়াই করবে না, তখনই যুদ্ধ করবে যখন সেটা এড়ানো সম্ভব না হয়।”
“এটা মনে রাখলে তোমার খুব বেশি ঝামেলা হবে না।”
যাত্রায় কোনো ঝামেলা হলো না। সেজন্যে নিয়ুরের যে বাড়িতে যাওয়ার কথা সেখানে পৌঁছে ক্রিস্টোফার হতাশ-ই হলো বলা চলে। ও চরম মাত্রায় দর কষাকষি শুরু করলো, এক পর্যায়ে ও চাকরদের আদেশ দিলো খচ্চরগুলোয় মালপত্র তুলে ফিরে যাওয়ার জন্যে। সদর দরজা দিয়ে অর্ধেকটা বেরিয়ে যাওয়ার পর ওকে আবার ফিরিয়ে আনা হলো।
পরের দিন বাড়ি ফিরে ও পরশুরামের বাড়িতে উপস্থিত হলো। সব কামাই বুঝিয়ে দিলো তাকে।
