শুধু ধুতি পরা এক বাচ্চা ছেলে দরজা খুলে দিলো। ক্রিস্টোফার ভিতরে ঢুকতেই ছেলেটা ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। ভিতরে দেখা গেলো একদল অর্ধনগ্ন ছেলে মারামারি করছে। কয়েকজন এক কোনায় কাঠ দিয়ে বানানো লম্বা একটা লাঠি দিয়ে নানান কসরত করছে, অনেকটা বৃদ্ধের হাতের লাঠির মতোই। আর এক জায়গায় চাঁদের মতো বাকা তরবারি দিয়ে যুদ্ধ চলছে। একটু পর পর ঝনঝন আওয়াজ আসছে সেদিক থেকে। কয়েকজনকে দেখা গেলো খালি হাতে মারামারি করতে। এমন মোহনীয় ভঙ্গিতে ওরা নাড়াচাড়া করছে যে বোঝাই যাচ্ছে ওদের লাথি বা ঘুষি সবই সহজাত ভাবেই হচ্ছে, জোর করে কিছু করা লাগছে না।
“এ কোন জায়গা?” অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করলো ক্রিস্টোফার।
“এটা হচ্ছে কালারি-যোদ্ধাদের স্কুল বলতে পারেন। আমরা এখানে কালারিপায়াত্ত শেখাই। এটা হচ্ছে যুযুৎসু-র অতি প্রাচীন একটা রূপ। কারো কারো মতে সবচেয়ে প্রাচীন।”
“আপনি এসব পারেন?”
“আমি হচ্ছি আসান, মানে এদের গুরু।”
ভাবনার চেয়েও দ্রুত এদের নাড়াচাড়া, হাতাহতি, ঘাম আর রক্তের গন্ধ সব ক্রিস্টোফারকে অবাক করে দিলো। ও সারাজীবনে যতো মার খেয়েছে সেসব মনে পড়লো ওর। ওর বাবার হাতে, ক্রফোর্ডের হাতে, এমনকি দানেশের হাতে। ও মুখ বুজে সব সহ্য করেছে কারণ ওর নিজেকে রক্ষা করার সামর্থ্য ছিলো না।
এখানকার সব লোকই নিজেকে রক্ষা করতে জানে।
“আমাকে শেখাবেন?”
“এখানকার সবাই সেই বাচ্চাকাল থেকে এখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে,” রঞ্জন সাবধান করলেন ওকে।
“আমি শিখতে পারবো।”
রঞ্জন ওর চোখের দিকে তাকালেন। আবারও ক্রিস্টোফারের মনে হলো। ঊনি এমন সব জিনিস দেখে নিচ্ছেন যা কিনা ক্রিস্টোফার নিজেও জানে না।
“হ্যাঁ,” উনি বুঝদারের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। “আমার মনে হয় আপনি পারবেন।”
*
জাহাজের জীবনটা কষ্টের ছিলো সন্দেহ নেই, তবে কালারি-র জীবন আরো কঠিন। জাহাজে মার খাওয়ার ঘটনা ঘটতো হঠাৎ-সটাৎ, আর এখানে মারামারিটাই দিনের একমাত্র কাজ। ক্রিস্টোফার গায়ের কালশিটে দাগগুলো গোনা বন্ধ করে দিলো একসময়। কতোবার বুকের পাঁজরের হাড় ভাঙলো বা মার খেয়ে চোখ ফুলে ঢোল হলো সেই হিসাবও থাকলো না। ভাঙা পাঁজরের কারণে নিঃশ্বাস নিতে পারতো না মাঝে মাঝে। কিন্তু সেসব নিয়ে কখনো ঘ্যান ঘ্যান তো দূরে থাক একদিনের জন্যেও প্রশিক্ষণও বাদ দেয়নি ও।
দ্রুতই ওর শরীরে আমূল পরিবর্তন চলে এলো। জাহাজে থাকতেই যেসব পেশি গঠন শুরু হয়েছিলও সেগুলো আরো বেশি শক্তপোক্ত হলো, একেবারে পাথরের মতো। আরো বেশি সরু হলো কোমর। একেবারে সোজা হয়ে হাঁটতে শিখলো, আগের চাইতে লম্বা লাগতে লাগলো তাই। মোটকথা বোম্বে থেকে পালিয়ে আসা সেই নাদুসনুদুস ছেলেটা বা কথায় কথায় মার খাওয়া ভীতু নাবিকটা আর রইলো না ও। ওর সতীর্থ সবাই স্থানীয় ভারতীয়। তাই বাকি সবার চাইতেই ও লম্বা। অনেকেই এজন্যে আসানের কাছে অভিযোগ করলো যে ক্রিস্টোফার এতে অতিরিক্ত সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রঞ্জন ওদেরকে এই বলে বিদায় করলো যে, “ভগবানই তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী ঠিক করে দেন।”
ক্রিস্টোফার খুব দ্রুত শিখে নিতে লাগলো সব। অষ্ট ধাপ আর অষ্ট ভঙ্গি শিখলো। একশো আটটা মামরা শিখলো; মামরা মানে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মধ্যে আছে বৈকালকারা অংশ, যেগুলো মানুষকে অসাড় করে দিতে পারে, আছে বিন্দু অংশ, যেখানে একটা মাত্র আঘাতই মেরে ফেলতে পারে যে কাউকে। চিৎকার করে মন্ত্র পড়ে নিজের অন্তর্নিহিত শক্তিকে বের করে আনা শিখলো। কারো চেহারা আর দাঁড়ানোর ভঙ্গি দেখেই তার পরবর্তী আক্রমণটা কোনদিক থেকে আসবে সেটা শিখলো। লাঠি আর তরবারি দুটো দিয়েই যুদ্ধ করা শিখে ফেললো। বাকা চাঁদের মতো দেখতে থোট্টি চালনাও শিখে নিলো একসময়।
এছাড়াও, প্রতিটা দিন শেষে কিভাবে নিজেকে সুস্থ্য করে তুলতে হয় সেটাও শিখলো। কিভাবে সারা শরীরে তেল মর্দন করতে হয়, কোন কোন জায়গায় কিভাবে মালিশ করলে সবচেয়ে দ্রুত ব্যথা সেরে যায়, সেগুলোও জেনে নিলো। ফলে পরের দিন আবার যুদ্ধে নামতে আর সমস্যা হতো না ওর।
বাড়িটার উঠোনের মাঝখানে দড়ি দিয়ে ঘেরা একটা মঞ্চ বানানো আছে। সপ্তাহে একদিন সব ছাত্ররা ওটার চারপাশে জড়ো হয় আর সেরা ছাত্ররা মঞ্চের উপর উঠে লড়াই করে। ওদের নাড়াচাড়া এতে মসৃণ আর দ্রুত যে শুরুতে ক্রিস্টোফার মাঝে মাঝে বুঝতো-ও না যে কোনদিক কোনদিক দিয়ে আঘাতটা হচ্ছে। তবে পরে যখন ও নিজেও ওগুলো শিখলো তখন একটু একটু ধরতে পারতো। এরপর থেকে যখন ও লড়াইগুলো দেখতো তখন ওর নিজের শরীরও আপনাআপনি সেগুলোর তালে বেকে যেতো, মনে মনে ও নিজেকে মঞ্চের উপরে কল্পনা করতো, আর লড়াই শেষে আরো মরিয়া হয়ে সেই কসরতগুলো অনুশীলন করতো।
অন্য ছাত্ররা ক্রিস্টোফারকে পাত্তা দিতে না বেশি। কিন্তু রঞ্জন ওকে সবসময় চোখে চোখে রাখতেন। একদিন উনি ক্রিস্টোফারকে একজন কাঠ মিস্ত্রীর কাছে নিয়ে গেলেন। জায়গাটা তেল আর বার্নিশের গন্ধে ভরা। অনেকগুলো অর্ধেক বানানো গণেশের মূর্তি রাখা তাকের উপর।
ক্রিস্টোফার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখতে লাগলো। মনে মনে অপেক্ষা করছে কখন আসান ওকে এখানে নিয়ে আসার কারণটা বলবেন। মিস্ত্রী তার হাতের বাটালি দিয়ে কাঠের গায়ে আঘাত করছে, প্রতি আঘাতে একটু একটু করে কাঠের চলটা উঠে আসছে।
