“আমি আপনাকে ত্রিভান্ড্রামে আপনার জাহাজের বাকি লোকগুলোর কাছে নিয়ে যেতে পারি। ওরা নিশ্চয়ই আপনার জন্যে দুশ্চিন্তা করছে।”
ক্রিস্টোফার মাথা নেড়ে, ওর বাম দিকে, মানে ত্ৰিভাল্লামের উল্টোদিকে ইঙ্গিত করলো। “আমি যাচ্ছি ওইদিকে।”
“আহ, লোকটার ঠোঁটে একটা শুকনো হাসি দেখা গেলো। আমিও।”
“আমাকে আপনার সাথে নেবেন?”
লোকটা উত্তর না দিয়ে ভাবলো কিছুক্ষণ। সেকেন্ড তিনেক ভেবেই, এতো দ্রুত ক্রিস্টোফারের দিকে ধেয়ে এলো যে, ও ঠাহরও করতে পেলো না কখন লোকটা এসে ওর মাথায় তার লাঠিটা তাক করে ধরেছে। এতোদর আসতে বড়জোর মাত্র দুইবার পা ফেলতে হয়েছে তাকে। ক্রিস্টোফার প্রতিরক্ষার্থে হাত তুলে ধরলো, যদিও তাতে খুব বেশি লাভ হতো না। লাঠিটার ডগা ওর চোখ থেকে মাত্র এক ইঞ্চি দূরে এসে থামলো। বৃদ্ধ লোকটা ঠিক ওর উপরেই দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু নাগালের বাইরে। এতে দ্রুত এতো কিছু করার পরেও তার শ্বাসের গতি সামান্যও বাড়েনি।
“যদি আপনার কথা মিথ্যে হয়-যদি আমার কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করেন-তাহলে আপনাকে খুন করবো আমি,” সাবধান করলো লোকটা।
ক্রিস্টোফার তার দিকে তাকিয়ে রইলো, “কে আপনি?”
“এমন একজন যে নিজেকে রক্ষা করতে জানে।” বলে লোকটা লাঠির ডগা দিয়ে ক্রিস্টোফারের মুখের কালশিটে দাগটা স্পর্শ করলো। “কিন্তু আপনাকে দেখে সেরকম কেউ মনে হচ্ছে না।”
ক্রিস্টোফার কোমরে হাত দিলো, “আমার সাথে এমনকি একটা ছুরি-ও নেই।”
“মানুষকে মেরে ফেলার অনেক রাস্তা আছে, সেগুলো খুব শক্ত-ও না। এদেশে এমন ডাকাতও আছে যারা পরনের ধুতি পেচিয়েও মানুষ মারতে পারে।”
লোকটার কণ্ঠের নিশ্চয়তা শুনে ক্রিস্টোফারের আচমকা মনে হলো যে সে একেবারে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কথাগুলো বলছে।
“আপনি কি ডাকাত?”
“এখন কি আমাকে অপমান করার চেষ্টা করছেন?” সহাস্যে বললো লোকটা। তারপর লাঠির মাথাটা এমন ভাবে ধরলো যাতে ক্রিস্টোফার ওটা ধরে নিজেকে টেনে তুলতে পারে।
“নাম কি আপনার?” জিজ্ঞেস করলো লোকটা।
ক্রিস্টোফার নিজের আসল নাম বলতে গিয়েও থেমে গেলো। কারণ ক্রিস্টোফার কোর্টনী একটা জাহাজ ডাকাতি করেছে, একজন লোককে খুন করেছে। ক্রিস্টোফার কোর্টনী একজন ফেরারি। আর সবচে বাজে ব্যাপার হচ্ছে ক্রিস্টোফার কোর্টনী, গাই কোর্টনীর ছেলে।
বোম্বেতে থাকাতে রবিবার সকালে গির্জায় যাওয়ার কথা মনে পড়লো ওর। ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে, মাছির অত্যাচার সয়ে ওকে বসে বসে পাদ্রির বকবক শুনতে হতো। সেখানে শোনা বাইবেলের গল্পগুলোর মধ্যে একটা মনে পড়লো ওর। রাজা ডেভিডের ছেলের গল্প-যে কিনা তার বাবাকে ক্ষমতাচ্যুত করে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দেয়।
“আমার নাম আবসালম,” ক্রিস্টোফার বললো।
বৃদ্ধ লোকটা সরু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালো, যেনো ওর ভিতরের মিথ্যে আর অপরাধগুলো সব দেখে নিতে পারছে।
গাধা, ক্রিস্টোফার নিজেকে বুঝালো। এগুলো শুধু আমার চোখ; দেহের একটা অংশ, ঠিক আমার পা বা কনুই এর মতোই।
“আমি রঞ্জন।” সামনের দিকে তাকিয়ে বললো লোকটা। “আমি আপনাকে পাশের গ্রামে নিয়ে যাবো।” কথাটা শুনে ক্রিস্টোফারের মনে হলো কাঁধ থেকে একটা বিশাল বোঝা নেমে গেলো যেনো।
দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে লাগলো। সূর্য উঠে গিয়েছে ততোক্ষণে। রাস্তায় লোকের চলাচলও বেড়েছে। রাস্তার দুই ধারে পাম গাছগুলোয় রসের হাঁড়ি ঝুলানো, দেখে মনে হচ্ছে বিশাল কোনো মাকড়সা যেন শুড় দিয়ে রস চুষে খাচ্ছে। বৃদ্ধ লোকটা একটা শব্দও বললো না। কিন্তু ক্রিস্টোফার বকবক করেই চললো। বারবার ও ক্রফোর্ডের অত্যাচারের বর্ণনা দিতে লাগলো। কিভাবে ও ক্রফোর্ডের পেট ফেড়ে দিয়েছে সেটা বলতে গিয়ে কণ্ঠে গর্ব ফুটে উঠলে ওর। ইচ্ছা করছিলো আবার জাহাজে ফিরে গিয়ে আবার যদি কাজটা করতে পারতো তাহলে আরো ভালো লাগতো।
গ্রামটা একদমই নিরিবিলি। পাম গাছের পাতায় ছাওয়া মাটির ঘর দেখা গেলো কয়েকটা। তার ফাঁক দিয়ে চিমসানো কয়েকটা গবাদি পশু ঘুরে বেড়াচ্ছে। তীরে জেলেরা নিজেদের জাল গোটাচ্ছে, ওটা দিয়ে ধরা মাছগুলো পড়ে আছে বালির উপর।
“তা কি করবেন এখানে?” রঞ্জন জানতে চাইলেন।
ক্রিস্টোফার মাথা নাড়লো। এসব ভেবে দেখেনি। চাইলে জেলে হতে পারে, তবে এখানকার সবচে বড় নৌকাটাও সম্ভবত জোসেফ-এর ডিঙ্গি নৌকার সমান হবে। কিন্তু আবারও সমুদ্রে যাওয়ার চিন্তাটা ওকে আতংকিত করে তুললো।
“আপনার কাছে খাবার আছে? টাকা? পরিচিত কেউ আছে?” রঞ্জন-ই জিজ্ঞেস করলেন আবার।
“নাহ,” জবাব দিলো ক্রিস্টোফার।
“তাহলে বরং আমার সাথে চলেন।”
ওরা চলতেই থাকলো, মাইলের পর মাইল। আরো অনেকগুলো জেলে গ্রাম, প্যাগোডা আর লম্বা, বালুকাময় সৈকত পেরিয়ে সুর্যাস্তের আগে আগে ওদের গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছালো। মোটামুটি বড় একটা শহর এটা। সাগরের তীর থেকে একটু ভিতরে যদিও, তবে আসার পথের গ্রামগুলোর তুলনায় অনেক বড়। বড় বড় বাজার, মন্দির সবই আছে এখানে।
রঞ্জন ক্রিস্টোফারকে শহরের শেষ মাথার একটা বিশাল বাড়িতে নিয়ে এলেন। বাইরে থেকে দেখে ক্রিস্টোফার ভেবেছিলো এটা একটা মন্দির। রঞ্জন লোকটার হাবভাব এতে সাধু সাধু যে ওনার পক্ষে একজন সন্নাসী হওয়া অবাক হওয়ার মতো কিছু না।
