অবয়বটা আরো কাছে এগিয়ে এলো, লাউয়ের খোল দিয়ে বানানো একটা বাতি ধরে আছে সাথে। ক্রিস্টোফারের লুকানো জায়গাটার একদম সামনে এসে দাঁড়ালো লোকটা। ধুলোমাখা পথে ওর পায়ের ছাপ আর সিন্দুক টেনে নেওয়ার দাগ দেখেই বুঝেছে কোথায় লুকিয়েছে।
“ক্রিস?” ডাকলো অবয়বটা।
ওটা হচ্ছে দানেশ। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ক্রিস্টোফার লুকানো জায়গাটা থেকে মাথা তুলোলো। দানেশ আতংকে পিছিয়ে গেলো, চিনতে পারেনি ওকে। দানেশের কাছে মনে হচ্ছিলো ওর সামনে রক্ত আর ধুলোয় ভরা একটা অর্ধ উলঙ্গ দানব দাঁড়িয়ে আছে।
“ক্রিস?” ও তাকিয়েই রইলো। “আমি তোমাকে ডাঙ্গায় উঠতে দেখেছি।” তারপর রক্ত আর ওর চোখের উভ্রান্ত দৃষ্টি দেখে বললো, “করেছছা কি তুমি?”
“আমি ওকে খুন করেছি,” বহু কষ্টে বললো ক্রিস্টোফার। মনে মনে বলার চেয়ে মুখে বলা অনেক কষ্ট। কিন্তু দানেশের চোখে তাকাতেই ওর প্রতি ‘দানেশের আলাদা একটা সম্ভম দেখতে পেলো।
“আর জাহাজ?”
“নেই। জ্বালিয়ে দিয়েছি আমি ওটাকে।”
দানেশের মুখ কালো হয়ে গেলো। “জাহাজটা দিয়েই পেট চালাতাম আমরা।”
“পেট চালানো? ক্রফোর্ড আমাকে কিছুই দেয়নি, মনে নেই?” ও ঝোঁপের পিছনে ফিরে গিয়ে আবার সিন্দুকটা তুলে নিয়ে এলো। “এটা দেখেছো? আমরা এখন নিজেরাই মালপত্র কিনতে পারবো। একটা জাহাজ ভাড়া করবো। আর দড়ি ধরেও ঝুলতে হবে না, বা ওর দড়ির বাড়িও খেতে হবে না। আমরাই এখন হবো সর্দার। আর কয়েকটা অভিযান ভালোয় ভালোয় করতে পারলেই আরো বড় একটা জাহাজ কিনে ফেলতে পারবো। তারপর আর একটা।” ও এর মধ্যেই কল্পনায় একটা বিশাল সওদাগরি জাহাজে করে বোম্বে ফিরে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে শুরু করেছে। ওর জাহাজের কামানের খোপগুলো সোনার পাতে মোড়ানো থাকবে। তীরে রুথ দাঁড়িয়ে থাকবে ওর অপেক্ষায়, ডাঙায় নামতেই দুই হাত বাড়িয়ে দৌড়ে আসবে ওর দিকে। আর ওর বাবা যখন জানবেন খবরটা, তখন পরাজয়ের রাগে দুঃখে ক্ষোভে লাল হয়ে যাবেন।
দানেশের অভিব্যক্তি পাল্টে গেলো। “চাবি? ওটা এনেছো তো?”
ক্রিস্টোফার কবজিতে বাঁধা চাবিটা বের করে তালায় ঢুকিয়ে মোচড় দিলো। ঝট করে খুলে গেলো তালা, ঢাকনা সরতেই দেখা গেলো ভিতএ সোনা আর রূপা চকচক করছে।
“এ দিয়ে তো…” দানেশ এক মুঠো মুদ্রা বের করে হাতে নাড়তে লাগলো। “পুরো রাজার হালে থাকা সম্ভব।”
“সাবধান,” ক্রিস্টোফার হাসলো। “আমাদের কিন্তু সব টাকা একবারে খরচ করা যাবে না। যদি ঠিকমতো খাটাতে পারি তাহলে এর চাইতে দশ গুণ বেশি কামাতে পারবো।”
ঘুষিটা কোন দিক থেকে এলো সেটা টেরও পেলো না ক্রিস্টোফার। এতে জোরে ওর চোয়ালে লাগলো যে ও পিছন দিকে উলটে পড়ে গেলো। দানেশের গায়ে মাংস কম, কিন্তু ও সেই দশ বছর বয়স থেকে জাহাজে কাজ করছে। রশির মতো পাকানো ওর শরীর-আর ক্রিস্টোফার এতোক্ষণের ধকলে অবসন্ন। হয়ে আছে। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে আবার একটা শিকড়ে বেঁধে পড়ে গেলো ও। আবারও উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে যেতেই আর একটা ঘুষিতে জ্ঞান হারিয়ে ফেললো।
দানেশ ক্রিস্টোফারের কোমরের দড়ি দিয়ে বানানো বেল্টটা খুলে নিয়ে সিন্দুকের হাতলে ভরে একটা কাজ চালানোর মতো ফাস বানিয়ে ফেললো। আর বেল্টটা খুলে নেওয়ায় ও ক্রিস্টোফারের ছুরি আর ক্রফোর্ডের টাকার থলে দুটোই পেয়ে গেলো। ওগুলোও ও নিয়ে নিলো সাথে।
ক্রিস্টোফারের ততোক্ষণে জ্ঞান ফিরেছে। থুথু দিয়ে মুখ থেকে খানিকটা রক্ত ফেলে, এক হাতে ভর দিয়ে উঠে বসলো ও। কিন্তু দানেশের মারমুখি ভঙ্গি দেখে আর বেশি ওঠার সাহস করলো না।
“আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার বন্ধ,” করুণ কণ্ঠে বললো ক্রিস্টোফার।
দানেশ এমনভাবে তাকালো যেনো ক্রিস্টোফার বাচ্চাদের মতো কোনো কথা বলেছে, “এতো বেকুব তুমি। স্বর্ণের কাছে কোনো বন্ধু নেই।”
দানেশ সিন্দুকটা কাঁধে তুলে নিয়ে রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করলো। ক্রিস্টোফার পিছু নেওয়ার চেষ্টা করলো না। ওখানেই শুয়ে শুয়ে দানেশের হাতের আলোটা ফিকে হয়ে যেতে দেখলো। তারপরেও না উঠে অন্ধকারেই শুয়ে রইলো ও।
*
“আপনি কি আমাকে মারতে চান?”
ক্রিস্টোফার চোখ খুললো। রাস্তার অপর পাশে একটা অপরিচিত লোককে দেখতে পেলো ও। লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে, তাকিয়ে আছে ওর দিকে। লোকটার শরীর একহারা কিন্তু শক্তপোক্ত, মুখের দাড়ির রঙ ধূসর হয়ে এসেছে।
“আপনি কি আমাকে মারতে চান?” আবার বললো লোকটা। পর্তুগিজ ভাষায় কথা বলছে সে, যদিও চেহারা আর পোশাকআশাক দুটোই ভারতীয়।
ক্রিস্টোফার হাত দিয়ে ওর কপাল ডললো। চোয়াল ফুলে আছে, সামান্য নাড়াচাড়াতেই সারা শরীরে ব্যথা করে উঠলো একযোগে।
“আমাকে দেখে সেরকম মনে হচ্ছে?” গরগর করে বললো ও।
“এই এলাকায় ডাকাতের অভাব নেই। কেউ কেউ এভাবে ভান করে শুয়ে থাকে, যেনো কেউ তাকে ছিনতাই করেছে। যখন নিরীহ কেউ তাকে সাহায্য করার জন্যে থামে তখন তাকে আক্রমণ করে।”
“আমি উঠেও বসতে পারছি না।”
লোকটা তবুও নড়লো না। “কোত্থেকে এসেছেন আপনি?”
“আমার জাহাজে আগুন লেগেছিলো। আমি সাঁতরে ডাঙায় উঠেছি।”
লোকটা চিন্তিত মুখে মাথা ঝাঁকালো। তারপর ক্রিস্টোফারের গায়ের শুকিয়ে আসা রক্ত আর চেহারার নীলচে দাগগুলো দেখলো কিছুক্ষণ।
