ক্রিস্টোফার লাফিয়ে সরে গেলো দূরে। ছুরিটা টান দিয়ে বের করে ফেলেছে। ক্রফোর্ড নিজের পেট চেপে ধরে চেষ্টা করলো সবকিছু আবার ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়ার। ব্যথায় একটা আহত ষাড়ের মতো গোঁ গোঁ করছে ও।
ক্রফোর্ডের চিৎকার নিশ্চয়ই পানি পেরিয়ে ডাঙ্গায়ও পৌঁছাচ্ছে। কিছুক্ষণের মাঝেই দেখা যাবে ডাঙ্গা থেকে কেউ না কেউ শব্দটা শুনে কি হয়েছে সেটা খতিয়ে দেখতে চলে আসবে। আর ক্রিস্টোফারকে এভাবে উদ্দত ছুরি হাতে দেখলেই যা বোঝার বুঝে নেবে সবাই। ওকে এর শেষ করতে হবে।
এছাড়া ওর আর কোনো উপায় নেই। ক্রিস্টোফার শক্ত হাতে ছুরিটা ধরলো আবার, তারপর ওপরে তুলে সোজা ক্রফোর্ডের হৃৎপিণ্ড বরাবর বসিয়ে দিলো।
ক্রফোর্ডের চিৎকার চেঁচামেচি সর থেমে গেলো সাথে সাথেই। অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে পায়ের কাছে পড়ে থাকা লাশটার দিকে চেয়ে রইলো ক্রিস্টোফার। হাত থেকে ছুরিটা পড়ে গেলো ওর। সারা শরীর কাঁপছে।
‘তুমি একটা খুনী-গাই এর মতো ঠাণ্ডা স্বরের কেউ এসে ওর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে গেলো কথাটা।
লাশটা থেকে নিজের দৃষ্টি ফেরাতে পারছিলো না ও। একটু আগেও যে একজন জলজ্যান্ত মানুষ ছিলো, সে এখন কাটা মাংসের স্তূপ ছাড়া কিছু না।
‘তুমিই করেছো সব’-কণ্ঠটা আবার বললো।
তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর অপরাধবোধ কমে এলো খানিকটা। আস্তে আস্তে শরীরে উষ্ণতাও ফিরে এলো। কাঁপাকাপি গেলো থেমে। যে লোকটা ওকে পিটিয়েছিলো, ঠেঙিয়েছিল, অত্যাচার করেছিলো, ধোঁকা দিয়েছিলো-সে এখন মৃত। ও আর কখনো ক্রিস্টোফারের গায়ে হাত তুলতে পারবে না।
“আমিই কাজটা করেছি, নিজেকে নিজে বললল ও। ভাবনাটা মাথায় খেলতেই পুরো শরীর শিউরে উঠলো ওর। ঠাণ্ডার দিনে গোসল করতে গেলে যেরকম হয় সেরকম। “এতোদিন ধরে কাপুরুষের মতো কেননা বেঁচে আছি। আমি? নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে তো কিছুই জানতাম না।”
নিজের রক্তাক্ত হাত দুটো ক্রফোর্ডের পায়জামায় মুছে নিলো ক্রিস্টোফার, তারপর লাশটা হাতড়ে ক্রফোর্ডের টাকার থলেটা খুঁজে বের করলো। ভিতরে পয়সার ঝনঝনানি শোনা গেলো-ওর টাকা এগুলো সব। ও থলেটা নিয়ে নিজের পায়জামার পকেটে ঢুকিয়ে রাখলো।
আর একটা জিনিস খেয়াল হলো ওর। একটা চাবি-ক্রফোর্ডের গলায় একটা রশি দিয়ে ঝোলানো। পিরিট রাখার সিন্দুকটার চাবির চাইতে অনেক ছোটো। তবে এই চাবিটাও ও সকালে দেখেছিলো। এটা হচ্ছে টাকার সিন্দুকের চাবি। ক্রফোর্ডের বুকের ছিদ্র থেকে রক্ত বেরিয়ে লাল হয়ে আছে। ক্রিস্টোফার টান মেরে চাবিটা ছুটিয়ে নিয়ে দ্রুত ক্যাপ্টেনের কেবিনের দিকে ছুটে গেলো। ক্রফোর্ডের খাটের নিচে টাকার সিন্দুকটা লুকানো থাকে। সবাই বেতন তুলে নেওয়ার পরেও ওর সিন্দুকটা বের করে আনতে ঘাম ছুটে গেলো। ভালো লক্ষণ।
নিচে ভাড়ার ঘরে গিয়ে এক বোতল কপির তেল খুঁজে পেলো ক্রিস্টোফার। জাহাজের খোলের ভিতর থাকা কাপড়ের গাড়িগুলোর উপর ঢেলে দিলো তেলটা, তারপর একটা ছোট পিপা থেকে গান পাউডার বের করে খোলের উপর ছড়িয়ে দিলো। এক অভূতপূর্ব স্বাধীনতা আর শক্তির অনুভূতি কাজ করছে ওর ভিতরে। দ্রুত হাতে কাজ করতে লাগলো ও। ওর কাছে এই কাজটা একটা বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত বলে মনে হচ্ছে। এতে করে ক্রফোর্ডের লাশও পুড়ে যাবে আর জাহাজের কোনো ত্রু-ও ওকে খোঁজার কথা চিন্তা করবে না। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে ও কাজটা শুরু করেছিলো ভিতরে থাকা প্রচণ্ড আক্রোশ থেকে, এতো কথা ভেবে না।
সিঁড়ির অর্ধেক উঠে এসে, ও ঘুরে হাতের কুপিটা অন্ধকারে ছুঁড়ে দিলো। কাঁচ ভেঙ্গে ছড়িয়ে পড়লো চারপাশে, আর তেলে ভেজা কাপড়ে আগুন ধরে গেলো মুহূর্তেই। লকলকে শিখায় ভরে গেলো খোল।
ক্রিস্টোফার তাকিয়ে থাকলো সেদিকে, নিজের কাজে নিজেই সম্মোহিত হয়ে গিয়েছে যেনো। আমিই করেছি সব, আবার ভাবলো ও। সামনের ধ্বংসলীলা ওর রক্তে আফিমের নেশার মতোই প্রবাহিত হতে লাগলো।
নিচ থেকে আসা গরম বাতাস এসে লাগলো ওর মুখে। বুঝলো যে আর থাকা যাবে না। সিঁড়ি বেয়ে উঠে ক্রফোর্ডের লাশের কাছে গিয়ে রেগে আবারও একটা লাথি দিলো ক্রিস্টোফার। ডিঙ্গিটা নামানোর সময় আর নেই, তবে গাছের গুঁড়ির যে ডোঙ্গাটায় করে ক্রফোর্ড এসেছে সেটা জাহাজের সাথে বাধা ই আছে। একটা রশিতে বেঁধে প্রথমে সিন্দুকটা নামিয়ে দিলো ডোঙায়, তারপর নিজেও নেমে এসে দাঁড়টা তুলে নিলো। দেরি না করে সমস্ত শক্তি দিয়ে বাওয়া শুরু করলো ও, পিছনের জাহাজটা ততোক্ষণে অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে।
একটু পরেই বালিতে এসে ঠেকলো ওর নৌকাটা। সিন্দুকটা কাঁধে তুলে নিয়ে ঝপাশ করে পানিতে নেমে পড়লো ক্রিস্টোফার। তারপর সোজা দিলো দৌড়। একটানে তীরের গাছগুলোর আড়ালে পৌঁছে তারপর পিছনে ফিরে তাকালো। জোসেফ দেখতে তখন বন ফায়ারের গানপাউডার ট্রিজন ডে-র মতো লাগছে। শহরের লোকজন অন্যপাশের পানির ধারে ছুটে আসছে কি হয়েছে দেখতে। প্রায় সবাই-ই অর্ধ উলঙ্গ। হাঁ করে তাকিয়ে আছে আগুনের দিকে। জাহাজের কয়েকজনকেও দেখা গেলো, সাথের মেয়েগুলো তখনও সেটে আছে সাথে। ও ভেবে পেলো না ওরা কিভাবে বাড়ি যাবে? আর একটা জাহাজ খুঁজে পেতে কতো দিন লাগবে আর?
গাছের ফাঁকে মুক্ত বাতাস পাওয়ার আগ পর্যন্ত ও ভিতর হাঁটতেই থাকলো। বন্দরে যাওয়ার সাহস ওর নেই। অন্তত যতোক্ষণ জোসেফ-এর লোজন ওখানে থাকবে ততোক্ষণতো না-ই। তবে ও আসার পথে তীর দিয়ে অনেকগুলো শহর আর গ্রাম দেখেছে যেখানে আশ্রয় নিতে পারবে। সে উদ্দেশ্যেই দিক বদলে উত্তরে ঘুরতে যাবে কিন্তু দেখতে পেলো বনের ফাঁক দিয়ে আলো ছুটে আসছে। ও সিন্দুকটা টেনে সরিয়ে দিয়ে এক ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো।
