ও জাহাজের ছাউনির ছায়ায় বসে ছুরি দিয়ে একটা কাঠে আঁকিবুকি আকলো কিছুক্ষণ। পুরো জাহাজে ও একা, এই একাকীত্বটাই ওর কাছে ভালো লাগতে লাগলো। সারাজীবন বলতে গেলে ও একা-ই বড় হয়েছে। কুঠির অন্য ছেলেদের সাথে মেশা ওর বারণ ছিলো। কারণ ওর বাবার চোখে বাকিরা ছিলো ওদের চাইতে নিম্ন শ্রেণির। যে গুটি কয়েকের সাথে ওর বন্ধুত্ব হয়েছিলো তারা সব মারা পড়েছে নাহয় ইংল্যান্ড ফিরে গিয়েছে। ওর মা, বাবার ভয়ে কখনো নিজের ঘর ছেড়ে বের হন না। তাই ও সবসময় একা-ই বড় হয়েছে।
ও বুঝতে পারছে যে ওর পক্ষে এভাবে ভাগ্য গড়া সম্ভব হবে না। যদি ও ক্রফোর্ডের অত্যাচার সহ্য করে বেঁচে-ও যায়, তবুও ওকে একটা সস্তা কাপড়ের জামা বানানোর টাকা জমাতেও কয়েক বছর লেগে যাবে। রুথকে তো আর এতো দিন অপেক্ষা করিয়ে রাখা সম্ভব না।
ওর বাবার কাছ থেকে ক্রিস্টোফার আর একটা জিনিস শিখেছে। গভর্নরের অফিসে চুপচাপ সবার অলক্ষ্যে বসে থেকে থেকে ও অনেক মানুষকে অফিসে আসা যাওয়া করতে দেখেছে। নীরব ঘরটায় দূর থেকেও কথোপকথন শোনা যেতো। মাঝে মাঝে কথা কাটাকাটি হলে লোজন ওর বাবাকে এমন কুৎসিত। ভাষায় গালি দিতে যা ও কল্পনাও করতে পারে না। এরপরেও ওর বাবা তাদেরকে মাথা উঁচু করেই ওদের বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে দিতো। ওরা মনে মনে ভাবতো যে খুব জেতা জিতেছে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর ও তাদেরকেই দেখেছে হতদরিদ্র অবস্থায় ইংল্যান্ডের জাহাজে চড়ে বসতে। সব হারিয়ে পথের ফকির হয়ে গিয়েছে তারা। একজনকে তো গ্রেপ্তার করে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো, কারণ তাকে একজন সেপাহী ছোঁকড়ার সাথে অন্তরঙ্গ অবস্থায় ধরা পড়েছিলো সে।
কখনো ভুলবে না, কখনো ক্ষমা করবে না। আর এমন সময় বদলা নেবে যখন সেটা তোমার শত্রুকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। ক্রিস্টোফারের মনে হলো ও যেনো নতুন কোনো সত্য আবিস্কার করে ফেলেছে।
ও ব্যাপারটা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলো। সূর্যমামা ডুবে গিয়ে অন্ধকার ভরে গেলো চারপাশ। ক্রিস্টোফার হ্যাচ গলে নিচের ডেক-এ নেমে এলো। রান্নাঘরে গিয়ে বাবুর্চির রেখে যাওয়া একটা পাত্র থেকে খানিকটা স্ট্য নিয়ে উদরপূর্তি করলো। তারপর খোঁজাখুঁজি করে লুকানো জায়গা থেকে বের করে আনলো এক বোতল আরক। জিনিসটা আসলে ধেনো মদ। ছিপি খুলেই bক ঢক করে কয়েক ঢোক পেটে চালানরে দিলো। জ্বলন্ত তরলটা পেটে পড়তেই মনটা প্রফুল্ল হয়ে গেলো ওর। এক অদ্ভুত সাহস অনুভব করতে লাগলো নিজের ভিতর।
“আর এক শয়তানের দাস হয়ে থাকবো বলে আমি আমার বাবাকে ছেড়ে আসিনি,” নিজেকেই শোনালো ও। আর একটা হ্যাচ গলে একেবারে নিচের ডেক-এ চলে এলো ক্রিস্টোফার। জোসেফ-এর বেশিরভাগ মালপত্রই একেকটা বিশাল গাট্টি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে এখানে। কাপড়ের গাট্টি বা চাউলের বস্তাগুলো বেশি বড়, ওগুলো দিয়ে ওর উদ্দেশ্য সাধন হবে না। খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে রেশমি কাপড়ের একটা ছোট বোঁচকা খুঁজে পেলো। এতেই চলবে।
পানির কাছাকাছি থাকায় ক্রিস্টোফার জাহাজের গায়ে ঢেউ আছড়ে পড়ার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেলো। জাহাজের প্রতিটা ক্যাচকোচ শব্দ মাস্তুল বেয়ে নিচে নেমে আসছে। খোলের গায়ে শব্দ করে কিছু একটা বাড়ি খেলো, সম্ভবত ঢেউ। বা পানিতে ভেসে আসা কোনো কাঠের টুকরো। কিন্তু তাতেই প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলো ও। হাতের তালু ঘেমে পিছলে গেলো বোঁচকা। মদটা গলার কাছে উঠে এসে তেতো অনুভুতির সৃষ্টি করলো।
একটা বস্তা থেকে সুপারি নিয়ে পকেটে ভরলো ক্রিস্টোফার, তারপর সিল্কের বোঁচকাটা কাঁধে ফেলে আবার উঠে এলো উপরে। ডিঙ্গি নৌকাগুলো এখনো তীরে, কিন্তু ঠিকই একটা ছোট নৌকা রয়ে গিয়েছে যা ও নিজেই বাইতে পারবে। ও নিজের ছুরিটা বের করে নৌকা বাধা দড়িগুলো কাটতে লাগলো।
“যাচ্ছিস কোথায়?” গর্জে উঠলো ক্রফোর্ড। জাহাজের পিছনে জ্বালানো মশালের আবছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে সে। ডেক-এ বিশাল লম্বা ছায়া পড়েছে ওর। “আবার তুই চুরি করছিস। একবার মার খেয়ে শিক্ষা হয়নি?”
ক্রফোর্ড কখন জাহাজে এসেছে সেটা ক্রিস্টোফার টের পায়নি। হয় ও ক্রিস্টোফারকে বিশ্বাস করে না, নয়তো কোনো সাক্ষী ছাড়া ওকে শেষ করে দিতে এসেছে। কিন্তু ক্রিস্টোফার কারণটা কখনো জানতে পারেনি। ক্রফোর্ড সামনে এগিয়ে এসে এতো জোরে ক্রিস্টোফারের চেহারায় ঘুষি দিলো যে ও উড়ে পিছনের দড়াদড়ির উপর গিয়ে পড়লো।
“আমাকে মেরে ফেলতে হলে এর চাইতে জোরে মারতে হবে, ক্রিস্টোফার বললো। ওর কণ্ঠে এক ভয়ানক হিংস্রতা খেলা করছে। একটা বুড়ি মহিলার মতো আঘাত করেন আপনি।”
একটা হুংকার ছেড়ে ক্রফোর্ড পেয়ে গেলো সামনের দিকে। ক্রিস্টোফার উঠে দাঁড়িয়েছে। আত্মরক্ষার্থে নিজের হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে ধরলো ও, এক হাতে যে ছুরি ধরা সেটা খেয়াল নেই। অন্ধকারে ষাড়ের মতো ধেয়ে আসা ক্রফোর্ড-ও খেয়াল করলো না ব্যাপারটা।
সহজাত প্রবৃত্তির বশেই ক্রিস্টোফার ক্রফোর্ডের রাস্তা থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না। বিশাল লোকটা ওকে আঁকড়ে ধরতে যেতেই ও-ও সজোরে ধাক্কা দিলো সামনের দিকে।
ক্রিস্টোফার কিছু বোঝার আগেই হাতের ছুরিটা ক্রফোর্ডের ভূড়ি ফাঁসিয়ে দিলো। গরম রক্ত বেরিয়ে এলো সেদিক দিয়ে। ক্রফোর্ড চিৎকার দিয়ে উঠে মোচড়া মুচড়ি করে ছুরিটা শরীর থেকে বের করার চেষ্টা করতে লাগলো, কিন্তু টানাটানিতে ওর জখম আরো বড় হওয়া ছাড়া আর কিছু হলো না। ওর নাড়িভুড়ি বেরিয়ে ক্রিস্টোফারের হাতের উপর এসে পড়লো।
