তবে ক্রিস্টোফার এতো যন্ত্রণার মাঝেও প্রতিটা বাড়ি গুণে রাখলো। এভাবেই ও ওর বাবার মার খাওয়ার সময় মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে রাখতো। এই মারটাও হজম করে ফেলতে পারলো তাই। যতোগুলো মার খায় সেই সংখ্যা থেকে যেনো ওর শরীরে শক্তি উতসরিত হয়। একটা কল্পিত লেজারে ও মারগুলো টুকে রাখে। একদিন সুদ সমেত আদায় করবে। যতদিন এভাবে মারের সংখ্যা গুণতে পারবে ততোদিন ও সব অত্যাচারই সহ্য করতে পারবে।
আস্তে আস্তে মারের জোর কমে এলো। ক্রফোর্ড আগের আক্রোশেই হাত চালিয়ে গেলো, কিন্তু ক্লান্ত হয়ে গেলো একটু পরেই। ও দড়িটা ফেলে দিলো। ওটার পাক খুলে গিয়েছে, এখন সেখানে ক্রিস্টোফারের রক্ত আর চামড়া লেগে আছে। লোকজন সবাই নিজেদের কাজে ফিরে যেতেই যারা ক্রিস্টোফারকে ধরে রেখেছিলো তারাও ছেড়ে দিলো। ওদের শরীরও রক্তে ভরে আছে। ক্রিস্টোফার ব্যারেল থেকে গড়িয়ে নেমে ডেক এর উপর স্তূপ হয়ে পড়ে রইলো। এতো ব্যথা সারা শরীরে যে চোখের পাতা বন্ধ করতেও কষ্ট হলো ওর।
কেউ একজন ওর ঠোঁটে এক মগ রাম এনে ধরলো। তৃষ্ণার্তের মতো তা খেয়ে নিলো ও। লোকটা দানেশ। রাম খেয়ে ব্যথা না গেলেও কমলো কিছুটা।
দানেশ ক্রিস্টোফারের পিঠ ধুয়ে দিলো। ক্রফোর্ড ক্রিস্টোফারকে পরিষ্কার পানি দিতে নিষেধ করেছে, দানেশ তাই জাহাজের পাশ দিয়ে বালতি ডুবিয়ে পানি নিয়ে এসেছে। নোনা পানির ছোঁয়ায় চাবুকের বাড়ির চাইতেও বেশি ব্যথা করে উঠলো। সহসাই একটা কালো পর্দা নেমে আসতে লাগলো ওর চোখের সামনে। ও নাড়াচাড়া করতে চাইলো কিন্তু ওর হাত পা কথা শুনলো না।
“উনপঞ্চাশ,” যেনো এক ঘোরের মাঝে বললো ক্রিস্টোফার।
“মানে?”
“ঊনপঞ্চাশটা বাড়ি।” হেসে বললো ক্রিস্টোফার। ঠোঁট নাড়তে গিয়েও অপরিমেয় ব্যথা হচ্ছে ওর। “পঞ্চাশটাও মারতে পারলো না। কাপুরুষ।” বলতে বলতে অজ্ঞান হয়ে গেলো ও।
৩. জোসেফ ত্রিভান্ড্রাম বন্দর
এক সপ্তাহ পর জোসেফ ত্রিভান্ড্রাম বন্দরে নোঙ্গর করলো। কু-রা সবাই তো মহা খুশি। বোম্বে ছাড়ার পর আর ওদের ডাঙ্গায় পা দেওয়া হয়নি। পুরো সময়টা ফুর্তিতে কাটাবে বলে ঠিক করলো সবাই। ক্রফোর্ড একটা টুল আর টেবিল নিয়ে ডেক-এ গিয়ে বসলো। নাবিকরা ওর চারপাশে জড় হলো যার যার পাওনা নিতে।
খাতায় নিজের নাম সই করে, হাতে কয়েকটা পয়সা নিয়ে জাহাজ থেকে নেমে যেতে লাগলো সবাই। ক্রিস্টোফার ছিলো সবার শেষে। ক্রফোর্ডের সামনে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। ক্রফোর্ড সরু চোখে তাকালো ওর দিকে।
“কি চাই?”
“আমার বেতন।”
“অবশ্যই,” বলে ক্রফোর্ড মহা আয়োজন করে টাকা গুণতে বসলো। শেষে কয়েকটা মুদ্রা বের করে সেগুলো টেবিলের উপর দিয়ে ঠেলে দিলো সামনে। কিন্তু ক্রিস্টোফার ওগুলো তুলে নিতেই ক্রফোর্ড ওর কবজি ধরে ধরে ফেললো। তারপর মোচড় দিয়ে মুদ্রাগুলো ওর হাত থেকে আবার ফেলে দিলো টেবিলের উপর।
“আবার এসব কি করছিস?”
ব্যথায় ক্রিস্টোফারের চোখ ফেটে পানি চলে এলো। মনে হলো কবজিটা বোধহয় ভেঙেই গিয়েছে।
“আমার বেতন নিচ্ছি।”
“আবার আমার কাছ থেকে চুরি করছিস?”
“প্রতি সপ্তাহে চার রুপি দেওয়ার কথা ছিলো আপনার।”
“তুই আমার নবীশ হিসেবে জাহাজে উঠেছিস। তার মানে তোর সব বেতন আমার কাছে আসবে।” বলে ক্রফোর্ড ক্রিস্টোফারের হাত ছেড়ে দিলো। আচমকা বন্ধন মুক্ত হওয়ায় ক্রিস্টোফার পিছনে উল্টে ডেক-এর উপর পড়ে গেলো। এতোগুলো লোক চেয়ে চেয়ে দেখলো, কেউ ধরতে পর্যন্ত আগালো না। ক্রফোর্ড পয়সাগুলো নিয়ে আবার ওর বক্সে ভরে রাখলো। তারপর ঠাস করে মুখটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়িয়ে কোমরে বাঁধা ছুরিটা নাড়তে লাগলো।
“সব পরিষ্কার?”
ক্রিস্টোফার ওখানেই পড়ে রইলো। হাত মুষ্টিবদ্ধ। প্রতিশোধের নেশা পেয়ে বসেছে ওকে। শুধু ইচ্ছা করছে ছুরিটা ক্রফোর্ডের পেটে গেঁথে দিয়ে তারিয়ে তারিয়ে ওর মৃত্যুটা দেখতে। ও টের পেলো সবগুলো ক্রু ওকে দেখছে, ওর দুরবস্থা উপভোগ করছে। এদেরকেও ও চরম ঘৃণা করে।
ক্রিস্টোফার নিজেকে টেনে তুলে সোজা ক্রফোর্ডের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেলো। কবজির ব্যথাটাকে পাত্তা দিচ্ছে না। ওকে দাঁড়াতে দেখে অবাক হয়ে গেলো ক্রফোর্ড।
“সব পরিষ্কার,” কাটা কাটা ভাবে বললো ক্রিস্টোফার। আর কিছু বলতে ইচ্ছে হলো না ওর।
ক্রফোর্ড আরো একবার ওকে ক্ষেপিয়ে তুলতে গিয়েও কি মনে করে থেমে গেলো। মাত্র কয়েক সপ্তাহেই ক্রিস্টোফার এখন আর বোম্বেতে দেখা সেই নাদুসনুদুস বাচ্চাটা নেই। কাঁধ চওড়া হয়ে গিয়েছে, শরীরও পেশিবহুল হয়েছে আরো বেশি। এখন আর আগের মতো বিনীতও নেই। তবে এতো কিছুর মধ্যে ওর চেহারার পরিবর্তনটা সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে। কঠোর আর শক্ত হয়ে গিয়েছে চেহারা। কালো চোখের মণিতে কেমন অস্থিরতা, অথচ দৃষ্টি অনেক গভীর। ক্রফোর্ড মুখে স্বীকার করবে না, কিন্তু চোখ জোড়া দেখে ও নিজেও ভয় পায়।
ক্রফোর্ড ঘুরে আদেশ দিলো, “নৌকা নামাও। আমরা ডাঙ্গায় যাবো। তুই বাদে।” ক্রিস্টোফারের দিকে ঘেউ ঘেউ করে বললো ও। “তুই জাহাজে বসে নোঙ্গরের দিকে খেয়াল রাখবি। যদি আমার জাহাজের কিছু হয়, তাহলে তোকে মাস্তুলে পেরেক দিয়ে গেঁথে কাক দিয়ে খাওয়াবো। বুঝেছিস?”
ক্রিস্টোফার দেখলো শুধু দানেশে ওর দিকে সহানুভুতির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। বাকিরা ফিরেও তাকালো না। ক্রিস্টোফার বসে বসে দেখলো সবাই নৌকা বেয়ে ডাঙ্গার দিকে চলে গেলো। দানেশ-ও গেলো। একদল মহিলা তীরে দাঁড়িয়ে আছে ওদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে। নামতে না নামতেই সবাইকে প্রায় টেনে হেঁচড়ে কাছের বেশ্যালয়ে নিয়ে গেলো মেয়েগুলো। রাত পোহানোর আগেই এদের সব ইনকাম হাওয়া হয়ে যাবে। তবে তাতে ক্রিস্টোফারের কোনো সান্ত্বনা নেই।
