“কিসের চাবি?”
“সিন্দুকের,” দানেশ ফিসফিস করে বললো। “ক্রফোর্ড যখন দড়িগুলো পরীক্ষা করে দেখছিলো তখন ওর কেবিন থেকে চুরি করেছি।”
গুদাম ঘরের সিন্দুকের ভিতর স্পিরিট রাখা। ওগুলো আসলে ক্রুদের ব্যবহারের জন্যে। কিন্তু গুজব শোনা যাচ্ছে যে ক্রফোর্ড সেটা নাকি বিক্রি করে দেওয়ার পায়তারা করছে।
ক্রিস্টোফার কাঁধের উপর দিয়ে উদ্বিগ্ন মুখে ইতিউতি তাকালো। “ধরা পড়ে গেলে?”
“কয়েক বোতল গায়েব হলে ও টের পাবে না। আমরা পরের বন্দরে ওগুলো বেঁচে দেবো। তাড়াতাড়ি।”
দানেশ চাবিটা তালায় ঢুকিয়ে মোচড় দিলো। খোলা দরজা দিয়ে পিরিটের তীব্র ঝাঝালো গন্ধ নাকে এলো ওর।
“তুমি এখানে দাঁড়িয়ে পাহারা দাও। ধরা খেলে ক্রফোর্ড কিন্তু জ্যান্ত ছাল তুলে ফেলবে।”
দানেশ ওকে চাবিটা ধরিয়ে দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়লো। ক্রিস্টোফার ওখানে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। ওর মন বলছে দানেশকে এভাবেই ফেলে পালিয়ে যেতে। যদি ধরা পড়ে তাহলে সব অস্বীকার করলেই হবে যে ও এসবের মধ্যে নেই। কিন্তু দানেশই হচ্ছে একমাত্র লোক যাকে ও বন্ধুর কাছাকাছি একজন হিসেবে ধরতে পারে। ও যদি না থাকে তাহলে জাহাজে ক্রিস্টোফারের আর কেউই থাকবে না।
উপরের ডেক-এ পদশব্দ শোনা গেলো। জাহাজের দুলুনির কারণে উপরের হ্যাচওয়ে দিয়ে যে আলোটা আসে তাতে ছায়াগুলো একেক সময় একের রকম আকার ধারণ করছে, তাই বোঝা গেলো না যে লোকটা কে।
“তাড়াতাড়ি,” ক্রিস্টোফার বললো। “কেউ আসছে।”
দানেশ বেরিয়ে এলো। বগলে চার বোতল ব্রান্ডি ধরে রেখেছে। সেগুলো মাটিতে নামিয়ে রাখলো ও।
“এখানকার সব তো হাতীও খেয়ে শেষ করতে পারবে না,” ফিসফিসিয়ে বললো ও। “আর কয়েকটা আনতে পারলেই আমাদের দুজনের হয়ে যাবে।”
“না,” হিসিয়ে উঠলো ক্রিস্টোফার। “এখন চলো। আমরা
ভারী কিছুর চাপে ঝাঁকিয়ে উঠলো কাঠের সিঁড়িটা। এক জোড়া জুতা দেখা গেলো সেখানে, তার উপরে দেখা গেলো সাদা মোজা পরা এক জোড়া গোদা পা। এরপর এক জোড়া চোঙ্গা প্যান্ট। তারপর একটা থলথলে দেহ নেমে এলো, গায়ের জামার বোতামগুলো টানটান হয়ে ছিঁড়ে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে।
দানেশ দ্রুত নোঙ্গরের দড়ির পিছনে ঝাঁপিয়ে পড়লো। ওটার বিশাল কুণ্ডলীর ভিতর একজন মানুষ অনায়াসে লুকিয়ে পড়তে পারবে। ক্রিস্টোফার
এক চুলও নড়লো না। যেনো পাথর হয়ে গিয়েছে। ক্রফোর্ড মাথা নিচু করে হ্যাচওয়েটা পার হয়ে সিঁড়ি থেকে নেমে এলো। সব দেখে শুনে শান্তভাবে সিন্দুকের খোলা দরজাটা লাগালো, তারপর ক্রিস্টোফারের পায়ের কাছে নামিয়ে রাখা বোতল দুটো আর চাবিটা তুলে নিলো।
“যখন খেয়াল করলাম যে চাবিটা পাওয়া যাচ্ছে না তখনই ভেবেছিলাম যে এখানে কাউকে পাওয়া যাবে।”
ক্রিস্টোফার কিছুই বললো না।
“তুই এটা পেলি কিভাবে? আর কে আছে তোর সাথে?”
ক্রিস্টোফার সোজা ক্রফোর্ডের দিকে তাকিয়ে রইলো। দৃষ্টি কোনোদিকে সরাচ্ছে না; যাতে করে ক্রফোর্ড ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে দানেশের অবস্থান টের না পেয়ে যায়। কিন্তু ক্রফোর্ড এটাকে ঔদ্ধত্য হিসেবে নিলো।
“তোর বাপ বোম্বের গভর্নর বলে কি ভাবিস যে তুই এখানকার সবার চাইতে সেরা? তুই কি ভাবিস সেই ক্ষমতাবলে তুই আমার জিনিস চুরি করতে পারবি?”
ক্রফোর্ডের চেহারা ক্রোধে লাল টকটকে হয়ে গিয়েছে। যেনো ঘন কালো মেঘ জমেছে আকাশে। ক্রিস্টোফার এই দৃষ্টি চেনে। ও ইষ্টনাম জপ করা শুরু করলো।
“সারেং,” চিৎকার করে ডাকলো ক্রফোর্ড। “মি. কোর্টনীকে ডেক-এ নিয়ে আয়। আর সবাইকে খবর দে। সবার সামনে শাস্তি দেবো আমি ওকে।”
কয়েকটা কঠোর হাত ওকে ধরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে নিয়ে গেলো। উঠেই দেখে বাকি সবাই প্রধান মাস্তুলের পিছনে বসানো একটা কামানের চারপাশে জড়ো হয়ে গিয়েছে। ক্রফোর্ড নিজের ঘরে গিয়ে খানিকটা রশি নিয়ে এলো। ও হাতে করে যে রশি নিয়ে ঘোরে এটা তার চাইতে সরু আর নমনীয়। কিছুক্ষণ আঙুলের ফাঁকে রশিটা নাড়াচাড়া করে সামনের দিকে দুটো গিট দিয়ে নিলা।
“বন্দীকে প্রস্তুত কর,” আদেশ দিলো ক্রফোর্ড।
ওরা ক্রিস্টোফারকে ব্যারেলের উপর শুইয়ে দিলো। সারাদিন রোদের তাপে গনগনে হয়ে থাকা লোহার কড়াগুলো সাথে সাথে ওর নগ্ন বুকে ছ্যাকা দিলো। কিন্তু ক্রিস্টোফার জানে যন্ত্রণা সবে শুরু। সারেং ওর হাত চেপে ধরে আছে, আর অন্য একজন নাবিক ধরে আছে ওর পা। ঠিক একটা ময়লা কাপড়ের মতো ও ব্যারেলটার উপর লম্বা হয়ে আছে।
পিছনেই জামার হাতা গুটিয়ে নিজেও প্রস্তুত হলো ক্রফোর্ড। নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে রশিটার প্যাঁচ খুলে ফেলে, প্রথমে ডেক এর উপর কয়েকবার বাড়ি দিয়ে দড়িটাকে আরো নমনীয় করে নিলো। তারপর পা শক্ত করে হাত পিছনে নিয়ে সর্ব শক্তি দিয়ে ক্রিস্টোফারের পিঠের উপর নামিয়ে আনলো সেটা। শব্দ শুনে মনে হলো মাস্কেটের গুলি লেগেছে পিঠে। ব্যথার পরিমাণ ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। ক্রিস্টোফার দাঁতের ফাঁকে একটা পাটের দড়ি কামড়ে ধরে রইলো। কাঁদবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছে। প্রথম আঘাতের পর নিঃশ্বাস নেওয়ার সময়টুকুও না দিয়ে আবার ক্রফোর্ড ওর দড়ির চাবুক হাকালো। এবার শোল্ডার ব্লেডের মাঝ বরাবর। এরপর তৃতীয়টা। তারপর
ক্রফোর্ড খেই হারিয়ে ফেললো। ঢেউয়ের মতো ব্যথা আসতে লাগলো। একের পর এক-এতো দ্রুত যে সবগুলো মিলে কিছুক্ষণ পর ক্রিস্টোফার অনুভূতি শূন্য হয়ে পড়লো। অত্যাচারের চূড়ান্ত করলো ক্রফোর্ড। বর্বরতম আচরণ বলে যাকে, যেনো ওর ইচ্ছা ক্রিস্টোফারের শরীরের সকল হাড় গুড়ো করে ফেলবে।
