তবে ওদের আশা শেষ হয়নি এখনো, কারণ ক্রিস্টোফারের অগ্নিপরীক্ষা আরও বাকি। উপরে ওঠা হয়েছে, এখন ওকে আড়কাঠের কিনারায় যেতে হবে। ওর পায়ের নিচে তখন সরু একগাছি দড়ি বাদে আর কিছুই থাকবে না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আরো কয়েকজন নাবিক ওর সাথে যোগ দিলো। ওরা সবাই আড়কাঠ ধরে বানরের দক্ষতায় চলাফেরা করতে লাগলো। জাহাজের দুলুনিতে সামান্য কিছুও হলো না। কয়েকজন ইচ্ছা করে ক্রিস্টোফারকে ঠেলা দিলো, ওর হাতের উপর পাড়া দিলো বা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কাঁধে ধাক্কা দিলো।
ওরা আমাকে মেরে ফেলতে চায়।
পাল বাধার দড়িটার গিটু খুলতে গিয়ে আঙুল বারবার পিছলে যেতে লাগলো ক্রিস্টোফারের। পায়ের নিচে দড়িটাও নড়েচড়ে গেলো বারবার। ওটা এতো চিকন যে ক্রিস্টোফারের মনে হতে লাগলো বাতাসের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে। এরপর শুরু হলো নতুন এক আতংক, নিচে নামা। এক পা, এক পা করে নামিয়ে স্পর্শ করে করে পা বাধানোর জায়গাটা খুঁজে খুঁজে নামলো ও। কারণ নিচে তাকানোর সাহস হচ্ছিলো না।
নেমে এসে মাস্তুলটা জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো ক্রিস্টোফার। কারণ পায়ে মনে হচ্ছিলো একটুও বল নেই। বহু কষ্টে বমি আটকালো। কিন্তু ভিতরে ভিতরে খুব খুশি লাগছিলো নিজের উপর। ও কাজটা পেরেছে। ডেক এর উল্টো পাশ থেকে দানেশ ঠোঁট নেড়ে বলললো, “সাবাস।”
পিঠের উপর কাটা দড়ির ঘা পড়তে সম্বিত ফিরলো ওর। ব্যথায় মুখ বিকৃত করে ঘুরে দেখে ক্রফোর্ড ওর দিকে ঝুঁকে আছে।
“আমিতো তোকে নামতে বলিনি।”
ক্রিস্টোফার জবাব দিয়েই ফেলেছিলো প্রায় সামলে নিলো শেষ মুহূর্তে। আপনাআপনি মাথা নিচু করে ক্রফোর্ডের রাগ কমার অপেক্ষা করতে লাগলো।
“তুই উপর থেকে লক্ষ্য রাখবি। এসব এলাকায় জলদস্যু আছে। ওদের কেউ যদি আমাদের জাহাজের এক মাইলের ভিতর আসতে পারে তো জ্যান্ত তোর চামড়া ছাড়িয়ে নেবো।”
ক্রিস্টোফার এমনভাবে বাঁকা হয়ে গেলো যেনো ওর গায়ে আবার আঘাত করা হয়েছে। প্রধান মাস্তুলের মাথায় তাকালো ও, অসম্ভব উঁচু। আবার কি ওখানে উঠতে পারবে?
ক্রিস্টোফারের দৃষ্টি খেয়াল করে শয়তানি হাসি খেলে গেলো ক্রফোর্ডের ঠোঁটে।
“এখানে দাঁড়িয়ে কিছুই দেখা যাবে না। তুই উঠে ক্রসট্রেসে দাঁড়িয়ে থাকবি।”
ক্রসট্রেস হচ্ছে প্রধান মাস্তুলেরও উপরে একসাথে জোড়া লাগানো দুটো সরু আড়াআড়ি কাঠ। খুবই ছোট। ক্রিস্টোফার নিচ থেকে ওটাকে দেখতেই পাচ্ছে না। এমনকি সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতেই মাথাটা ঘুরে উঠলো।
ও নড়লো না। ক্রফোর্ড জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট চেটে হাতের দড়িটা প্যাচাতে লাগলো। তারপর আবার সোজা করে ওটার জোর পরীক্ষা করলো।
“কথা কানে যাচ্ছে না?”
ক্রিস্টোফার বহু কষ্টে চোখে উপচে ওঠা অশ্রু সামলালো। ক্রফোর্ডোকে ও জিততে দেবে না কিছুতেই।
“যাচ্ছি স্যার।”
“তাহলে আবার বলার আগেই তোর ফর্সা পাছাটা মাস্তুলের উপরে তুলে ফেল। আর আমি বলার আগ পর্যন্ত ওখানেই থাকবি।”
ক্রিস্টোফার আর কিছু না বলে উঠতে শুরু করলো।
*
জীবনে ক্রিস্টোফার অনেককেই ঘৃণা করে, কিন্তু বর্তমান জীবনটাকে ও অন্য সব কিছুর চাইতে বেশি ঘৃণা করে। এমনকি ওর বাবার চাইতেও। তবে গাই এর কথা ওর আর মনে পড়ে না বললেই চলে। জাহাজ সামলানোর অবিরত কাজ-এটা সেটা করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলা–সবসময় সবার শেষে নিজের দায়িত্ব শেষ করতে পারাওর এখন অলস চিন্তা করার বিন্দুমাত্র ফুরসত নেই। যখন কাজের ফাঁকে একটু সময় পায়, তখনি ও থাকার জায়গায় গিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকে আর ব্যথার জায়গাগুলোতে তেল মালিশ করে। ওর শরীরে এখন সেই প্যাগোডা খচিত মুদ্রার সমান একেকটা ফোস্কা।
জাহাজের বাকি লোকজন ওকে এড়িয়ে চলে। গায়ের রঙ সাদা হওয়ায় ও যেনো ভিন গ্রহের কোনো প্রাণী হিসেবে বিবেচিত হয় সবার কাছে। আর নাবিক হিসেবে সবাই ওকে করুণার চোখে দেখে। শুধু দানেশ ওর প্রতি সদয়। তবে ও-ও সবসময় সতর্ক থাকে যাতে ক্রিস্টোফারের সাথে ওর মেশাটা কেউ দেখে না ফেলে। জীবনে এতোটা একা কখনো লাগেনি আগে। এ কারণেই কয়েকদিন পরেই দেখা গেলো ও মাস্তুলের মাথায় ওঠার আদেশ পাওয়ার জন্যে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় করা শুরু করেছে। তবে এখনো ওখান থেকে নিচে তাকানোর সাহস অর্জন করতে পারেনি। উপরে পালের মাঝে বসে থাকার সময়, ওর নিজেকে মেঘের মাঝে বসে থাকা কোনো দেবতার মতো মনে হয়। মরণশীল মানুষ আর তাদের ঘৃণ্য আচরণ থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। ওখানে বসে বসে ও রুথের সাথে নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করে। কোথায় ওরা থাকবে, রুথকে কি কি উপহার কিনে দেবে-এইসব। কিন্তু যখনই ওর বাবা বা। ক্রফোর্ডে অথবা ওর সাথে শত্রুতা করেছে এমন সবার উপর প্রতিশোধের কথাটা মাথায় আসে তখন দেখা যায় সেসব স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে।
এক বিকেলে নজর রাখা শেষে ও নিচে গেলো পানি আনতে। নিচে খোলের ভিতর যেতে ভালো লাগে ওর। কাপড়ের গাটরি আর নতুন প্যাকেট করা কাপড় থেকে যে ঘ্রাণটা ভেসে আসে তা ওকে কোম্পানির গুদামগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। ছোটবেলায় ওটাই ছিলো ওর খেলার জায়গা।
“ক্রিস,” অন্ধকার থেকে হিসিয়ে ডাকলো দানেশ। “এটা দেখো।”
ওর হাতের তালুতে কিছু একটা জ্বলজ্বল করছে। একটা পিতলের চাবি।
