“এখন কাজে যা।”
মাত্র দশ মিনিটের মাঝে ক্রিস্টোফার বুঝে ফেললো কোন পাকে এসে পড়েছে ও। গায়ের দামি উলের পোশাকটা খুলে কোমরে বেঁধে বাকি খালাসিদের সাথে হাত লাগিয়ে কপিকল দিয়ে নোঙ্গর তোলা শুরু করলো। ওর নগ্ন পিঠে আগুন ছড়াতে লাগলো সূর্য। কপিকলের দড়ির টানে হাতে কড়া পড়ে গেলো। তবুও ও মাথা তুলে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে নিজের ব্যথা ভুলে থাকার চেষ্টা করলো। ডাঙ্গায় তাকাতেই দেখলো পানির ধারে একটা জটলা, কোম্পানির ইউনিফর্ম পরা একদল লোক জোসেফ-এর দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে। ওটা কি ওর বাবা? হয়তো উনি নিজের মন বদলে ফেলেছেন।
আচমকা পিঠে প্রচণ্ড একটা গুতো খেয়ে সম্বিত ফিরলো ওর। ঝাঁকি দিয়ে উঠে ফিরে দেখে কপিকলের দণ্ডটা ঝুলতে ঝুলতে ওর পিঠে এসে বাড়ি খেয়েছে। ও আবার ওটা ধরে নিজের কাজ করা শুরু করলো। আড়চোখে দেখলো মাস্টার জাহাজের পাশ থেকে ওর দিকে নজর রাখছে আর হাতে ছোট এক টুকরো মোটা দড়ি দোলাচ্ছে। উদ্দেশ্য ওটা দিয়ে ওকে মারবে।
“মন কোথায় যায় রে মুরগির বাচ্চা? আর একবার ভুল করবি তো কি করি দেখিস।”
“ওর কথায় ক্ষেপে যেওনা যেনো,” পিছন থেকে ফিসফিস করে বললো কেউ। লোকটা বলছে পর্তুগিজ ভাষায়। মালাবার উপকূলে এটাই হচ্ছে লিংগুয়া ফ্রাংকা (সবাই ব্যবহার করে এমন সাধারণ ভাষা)। ক্রিস্টোফার গলা লম্বা করে পিছনে হেললো। তখনও কপিকল টেনে চলেছে। একটা একহারা ছেলে নজরে এলো। গায়ের রঙ কালো কিন্তু চোখ জোড়া বেশ উজ্জ্বল। ওর পরের দণ্ডটাই ঠেলছে সে। ক্রিস্টোফারের চাইতে ওর বয়স কম, কিন্তু হাতে কড়া পড়ে শক্ত হয়ে আছে, এই বয়সেই গায়ে কিলবিল করছে পেশি।
“ক্যাপ্টেন ক্রফোর্ড একটা আস্ত শয়তান, আবার ফিসফিসিয়ে বললো ও। কপিকলের ক্যাচকোচের কারণে শোনাই যায়না বলা যায়। কিন্তু ওনাকে এড়ানোর উপায়ও আছে। তুমি যতোই ওনার সাথে শক্তি দেখাবে, উনি ততোই তোমাকে ভাঙার চেষ্টা করবে।”
অবশেষে উঠে এলো নোঙ্গরটা। দ্রুত ওটাকে শক্ত করে জায়গামতো বেঁধে ফেলা হলো। পালগুলো তুলে দিতেই কিছুক্ষণের মাঝে সাগর ছুঁয়ে আসা বিকেলের মৃদুমন্দ বাতাসে ফুলে উঠলো ওগুলো। আদেশমতো ক্রিস্টোফার পালের দড়িগুলো টেনে ধরে রাখলো। সেটা করতে গিয়ে কয়েকবার ক্রফোর্ডের দড়ির বাড়িও পড়লো পিঠে। কিন্তু একটা বারও পিছু ফিরে দেখলো না।
সেই রাতে ও জাহাজের পিছন দিকে ডেক-এর উপর বিছানা পাতলো। পিঠের নিচে শক্ত কাঠের তক্তা। তার উপর ব্যথায় সারা শরীর কাতরাচ্ছে। দাতে চেপে সেগুলো সহ্য করে তারার দিকে চেয়ে রইলো। আজ সকালেও ও গভর্নরের বাড়ির পালকের বিছানায় ঘুম থেকে উঠেছে। চাকরেরা বলার আগে ওর প্রয়োজন মেটাতে সচেষ্ট হয়েছে। আর এখন শোয়ার জন্যে ওর এমনকি একটা কম্বল পর্যন্ত নেই।
একটা কালো অবয়ব এসে ওর পাশে বসলো। অন্ধকার সাদা দাঁত ঝিকিয়ে উঠলো লোকটার। কপিকল টানার সময় যার সাথে কথা হয়েছিলো সেই ছেলেটা।
“আমার নাম দানেশ,” নিজের পরিচয় দিলো ছেলেটা।
“ক্রিস্টোফার।”
“তোমার বাবা আসলেই বোম্বের গভর্নর?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি ওনাকে খুন ঘেন্না করো, তাই না?”
ক্রিস্টোফারের গাই-এর চোখের দৃষ্টিটা মনে পড়লো।
“হ্যাঁ, করি।”
দানেশ ওকে একটা কম্বল ধরিয়ে দিলো। “আর এই অভিযান শেষ হতে হতে তুমি ক্রফোর্ডোকে আরো বেশি ঘৃণা করবে।”
*
পরের তিন সপ্তাহ ছিলো ক্রিস্টোফারের জীবনের সবচেয়ে কষ্টকর সময়। দ্বিতীয় দিন ক্রফোর্ড ওকে মাস্তুলের মাথায় উঠে পাল খাটাতে আদেশ দেয়। মাস্তুলে অর্ধেক ওঠার পর ক্রিস্টোফার নিচে তাকিয়ে দেখে যে আর কেউ ওর সাথে উঠছে না। সবাই ডেক-এ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওকে দেখছে আর নিজেদের মধ্যে বাজি ধরছে।
সেই মুহূর্তে দমকা বাতাসে একদিকে হেলে পড়লো জাহাজটা। খুবই সামান্য, কিন্তু ক্রিস্টোফারের মনে হলো যেনো হারিকেন বয়ে গেলো। ও উল্টোদিকে হেলে পড়ে একদিকে কাত হয়ে গেলো। ঢেউগুলো দেখে মনে হলো ওর দিকে ছুটে আসছে। ডেক-এর লোকগুলো কেউ শিষ দিয়ে উঠলো, কেউবা হেসে উঠলো হো হো করে। ক্রফোর্ড চিৎকার করে কিছু একটা বললো, কিন্তু ক্রিস্টোফারের হৃৎপিণ্ড এতো জোরে ধুকপুক করছিলো যে সেসব ও কিছুই শুনতে পেলো না। ওর হাত ফসকে যেতে শুরু করলো।
জাহাজটা আবার সোজা হলো। ক্রিস্টোফারের ভয়টাও কাটলো কিছুটা। বুঝতে পারলো যে, ও যদি সাগরের দিকে তাকায় তাহলে আর এখানে থাকতে পারবে না, পড়ে যাবে। জোর করে ও উপরের দিকে দৃষ্টি ফেরালো-মাস্তুলের একদম মাথায়। তারপর ইঞ্চি ইঞ্চি করে উপরে উঠতে লাগলো। এক হাত প্রথমে তোলে তারপর অন্য হাতটা দিয়ে নিজেকে টেনে তোলে। প্রতিটা ধাপ পার হতে গিয়ে অবর্ণনীয় আতংক বয়ে গেলো ওর ভিতর দিয়ে। শেষে একটা রশির নাগাল পেতেই এমনভাবে আঁকড়ে ধরলো-যেভাবে বাচ্চা তার মায়ের আঙুল আঁকড়ে ধরে।
কিভাবে মাস্তুলের মাথায় পৌঁছালো তা জানে না ও। তবে এটাই সবার উঁচু না, প্রধান মাস্তুল আরো উঁচু। ক্রিস্টোফারের মনে হচ্ছিলো ও বুঝি সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ জয় করে ফেলেছে।
কিন্তু নিচ থেকে কেউ উল্লাস প্রকাশ করলো না। অবাক হয়ে ক্রিস্টোফার। বুঝতে পারলো ও এতো কষ্ট করে যা করলো তাতে কেউই তেমন খুশি হয়নি। বরং সবাই চেয়েছিলো যাতে ও পড়ে যায়। এটাই ওর জীবনের পরিণতি এখন-অন্যের বিনোদনের খোরাক হওয়া।
