“কি চাই?” গর্জে উঠলো লোকটা।
“আপনার জাহাজে কাজ করতে চাই।”
মাস্টার ওর আপাদমস্তক পরখ করলো। দেখে মুখ বিকৃত করে বললো, “আমি চিনি তোমাকে। তুমি গভর্নরের ছেলে, ক্রিস্টোফার কোর্টনী
ক্রিস্টোফার মাথা ঝাঁকালো।
“শালা একটা খবিশ?”
লোকটা এটো কাছে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো যে ওর মুখের থুতু এসে ক্রিস্টোফারের মুখে লাগলো। ক্রিস্টোফার নড়লো না।
“তো?” মাস্টার বললো। “আমি তোমার বাবাকে গালাগাল করে যাবো আর তুমি কিছুই বলবে না? কেমন ছেলে তুমি?”
“আমার বাবাকে পরোয়া করলে তো আর আমি এখানে আসতাম না।”
মাস্টার চটাশ করে ওর গালে একটা চড় কষালো। “যথেষ্ট বেয়াদবি হয়েছে। জাহাজে থাকতে হলে বড়দের সম্মান করতে হবে, নইলে ভাগো।”
সাথে সাথে অবশ্য ক্রিস্টোফার প্রত্যুত্তরে মারতে পারে ভেবে নিজের মুখের সামনে হাত তুলে আড়াল করলো। ক্রিস্টোফার বহু কষ্টে আঘাত করা থেকে বিরত থেকে নিজেকে শান্ত রাখলো। ওর বাবার কাছে থেকে যদি একটা জিনিস শিখে থাকে সেটা হচ্ছে মার খেয়ে কিভাবে হজম করতে হয়।
মাস্টার ডেক-এ থুতু ফেললো। ক্রিস্টোফারের পায়ের বুড়ো আঙুলের ঠিক পাশে পড়লো সেটা।
“এর আগে জাহাজে কাজ করেছিস?” সম্বোধন বদলে গেলো মাস্টারের।
“না, স্যার।”
“কখনো সমুদ্রে গিয়েছিস?”
“না, স্যার।”
“তাহলে কোন দুঃখে আমি তোমাকে আমার. জাহাজে নেবো? এটা তো। তোমার বাবার সোনায় মোড়া ইন্ডিয়াম্যান না যে কয়েকশো কামলা থাকবে জাহাজ চালানোর জন্যে। এখানে থাকতে হলে খেটে খেতে হবে, নইলে ঈশ্বরের কসম আমি এতো জোরে তাকে পানিতে ছুঁড়ে মারবো যে পড়ার শব্দটা পর্যন্ত কেউ টের পাবে না।”
“আমি কঠোর পরিশ্রম করতে পারি স্যার।”
“কঠোর পরিশ্রমের ক সম্পর্কেও তোর ধারণা নেই।” বলে মাস্টার ক্রিস্টোফারের হাতটা টান দিয়ে নিয়ে তালু উল্টে ধরলো। “এই দুধ-সাদা চামড়ার দিকে তাকা। জীবনে এই হাত দিয়ে এক গাছি রশিও পাকাস নাই।” তারপর ঘুরে বললো। “জাহাজ থেকে নেমে যা, নইলে ছুঁড়ে ফেলে দেবো।”
“দাঁড়ান,” ক্রিস্টোফার ডাকলো। তারপর ও ডেক-এর এক কোণে পড়ে থাকা কাপড়ের একটা গাট্টি তুলে নিলো। “কি এটা? কালবেলে? রেশমের সাথে কার্মানিয়া উল দিয়ে বোনা, তাই না? আর এটা হচ্ছে জুরিস, সবচে বেশি দিন টেকে এই সুতি কাপড়। এটা হচ্ছে
“আমার জাহাজ ছেড়ে ভাগ,” মাস্টার ক্রিস্টোফারের জামার গলার কাছে মুঠো করে ধরে শূন্যে তুলে ডেক-এর অন্য পাশে নিয়ে গেলো। তারপর জাহাজের কিনার দিয়ে ঠেলে দিলো নিচে।
‘আট রুপি, হাফাতে হাফাতে বললো ক্রিস্টোফার। “প্রতি গজ আট রুপি। কালবেলের জন্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আট রুপি দেবে আর জুরিস এর জন্যে ছয় রুপি।”
ও জাহাজের পাশ ধরে ঝুলে রইলো। মাস্টার ওর কাছে মুখ নামিয়ে আনলো। পিছনে নীল আকাশের প্রচ্ছদে তার পোড় খাওয়া মুখটা দেখতে অদ্ভুত লাগছে।
“তুই এসব কিভাবে জানিস?”
“বাবার হয়ে অনেক কাজ করেছি আমি। লেজার বইতে জিনিসপত্রের দাম লিখতাম। কোম্পানি কোন বন্দরে কোন মালের জন্যে কতো দাম দেয়, তার সবই আমার জানা।” বিশাল হাতটা ওর গলা চেপে ধরে টেনে আবার তুললো। দম বন্ধ হয়ে এলো ক্রিস্টোফারের। “এসব তথ্য কিন্তু আপনি কাজে লাগাতে পারবেন।”
মাস্টার ক্রিস্টোফারকে ছেড়ে দিলো। ডেক-এ আছাড় খেয়ে পড়লো ও। পড়েই পিঠ চেপে ধরলো।
ভারি বুটের লাথি পড়লো বুক বরাবর।
“উঠে দাঁড়া।”
পিঠের ব্যথা আর বমি বমি ভাব দুটোকেই অগ্রাহ্য করে ক্রিস্টোফার উঠে দাঁড়ালো। মাস্টার ওকে ক্ষুধার্ত হাঙরের দৃষ্টিতে জরিপ করলো কিছুক্ষণ।
“আমি তোকে আমার নবীশ হিসেবে নেবো। মাসে চার রুপি করে পাবি। থাকা খাওয়া এর বাইরে।” ক্রিস্টোফারের চেহারার অভিব্যক্তি দেখে হেসে দিলো লোকটা। “তোর কি মনে হয়? তোর দাম আরো বেশি? শালা নরম চামড়ার দামড়া ছোঁড়া? তাহলে আর একটা জাহাজ খুঁজে নে, যা।”
ক্রিস্টোফার হাত মুঠি করে ফেললো। কাজটা যে সহজ হবে না তা তো। আগেই জানা ছিলো, নিজেকে বললো ও। নিজের ভাগ্য গড়ার আগে ব্যবসাটা সম্পর্কে জানতে হবে।
“আমি রাজি।”
মাস্টারকে দেখে মনে হলো হতাশ হয়েছে। ক্রিস্টোফার বুঝলো লোকটা ওকে আবার আঘাত করার মওকা খুঁজছিলো। তবে ও খুব বেশি ভয় পেলো না। গাই-এর কাছে বড় হওয়ায় এসব ওর কাছে এখন পানি ভাত হয়ে গিয়েছে।
মাস্টার রেজিস্টার খাতা আনলে ক্রিস্টোফার সেখানে সই করলো। বাকি সব ভারতীয় ক্রুদের কাকের ঠ্যাং, বকের ঠ্যাং-এর মতো লেখার মাঝে ওর ঝকঝকে হাতের লেখা দেখে মনে হচ্ছিলো ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ সাগরের মাঝে শান্ত দ্বীপমালা।
গরমের কারণে লেখা শেষ না হতেই কালি শুকিয়ে গেলো। মাস্টার ঠাস করে বইটা বন্ধ করে বললো, “এখন থেকে তোর মালিক আমি। যদি কখনো দেখেছি কাজে ফাঁকিবাজি করছিস, তাহলে যে কি করবো সেটা খোদা মালুম। আমার জাহাজে যতোক্ষণ আছিস ততোক্ষণ তোর বাবার নামের-ও কোনো মূল্য নেই। তোর চামড়া সাদা আর হাতের লেখা ভালো বলে ভাবিস না যে পার পেয়ে যাবি। উল্টাপাল্টা কিছু করলে ওই কালাগুলোর মতোই ঠেঙানি খাবি। বোঝা গিয়েছে?”
“জ্বী স্যার।”
মাস্টার ওর দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। ক্রিস্টোফার বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নামিয়ে নিলো। কাধও আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে নেমে গেলো নিচে। ভঙ্গিটা ও ওর বাবার হাতে মার খাওয়ার সময় আয়ত্ত্ব করেছে। মাস্টার ঘোত ঘোত করলো কিন্তু আর কিছু বললো না।
