ক্রিস্টোফার এমনভাবে মুদ্রাটার দিকে তাকিয়ে রইলো যেনো আগে কখনো দেখেনি। ও মুদ্রাটা তুলে ধরলো যাতে ওটার স্বর্ণালি আভা ওর মুখের উপর পড়ে।
“আপনি এতো কিছু করবেন? আমার জন্যে?”
পিতা হিসেবে গাই-এর খানিকটা গর্ব বোধ হলো। “আজীবনই আমি তোমার সুন্দর ভবিষ্যতের জন্যে কাজ করেছি।”
মুদ্রাটা ক্রিস্টোফারের আঙুলের ফাঁক গলে ডেস্কের উপর পড়ে বনবন করে ঘুরতে লাগলো।
“আপনি একটা শয়তান। একটা নিষ্ঠুর, স্বার্থপর দানব। আপনার বুকের হৃৎপিণ্ডের জায়গায় ফাঁকা একটা বক্স বাদে কিছুই নেই। আপনি নিজের স্বার্থ চরিতার্থের জন্যে আপন সন্তানের সুখকেও বিসর্জন দিতে পিছপা হন না। আমি আপনার খেলার ঘুটি হবো না।”
গাই প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে দাঁড়ালো। এতোটাই রেগে গিয়েছে যে ধাক্কা দিয়ে ডেস্কটাকে সামনে ঠেলে দিলো।
“এতো বড় সাহস তুই আমার কথার উপর কথা বলিস?”
ক্রিস্টোফার তাতে ঘাবড়ালো না। আমি এখন আর ছোট ছেলে নেই যে আপনি যখন ইচ্ছে ধরে পেটাবেন। আমার যেমন ইচ্ছা আমি সেভাবে নিজের জীবন সাজাবো। আপনার পছন্দ মতো না। আমার যেখানে ইচ্ছা আমি যাবো, যাকে ইচ্ছা বিয়ে করবো।”
গাই-এর গলার শিরাগুলো স্পষ্ট দেখা যেতে লাগলো। “খবরদার, ক্রিস্টোফার! এই সমুদ্রের দুই কূলে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে গিয়ে তুই আমার হাত থেকে নিস্তার পাবি।”
“আপনাকে আমি ভয় পাই না।”
“পাওয়া উচিত,” ভয়ানক স্বরে বললো গাই। “তোকে আমি শেষ করে দিতে পারি।”
ক্রিস্টোফার তার দিকে তাকিয়ে রইলো। “কি বলছেন বুঝে বলছেন তো? কোন পদের মানুষ নিজের ছেলেকে এই কথা বলতে পারে? মাঝে মাঝে আমার মনে হয় যে আপনি আমার বাবা না।”
কথাটা গাই-এর এমন এক জায়গায় আঘাত করলো যেটা সম্পর্কে ক্রিস্টোফারের কোনো ধারণাই নেই। প্রচণ্ড রাগে মাথা খারাপ করে গাই একটা রূপার কাগজ কাটা ছুরি হাতে নিয়ে ছুঁড়ে মারলো ক্রিস্টোফারের দিকে। ছুরিটা ক্রিস্টোফারের কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে দরজায় বিধে কাঁপতে লাগলো।
ক্রিস্টোফার এক চুল নড়লো না। এক দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়েই রইলো। ওরও রাগে সারা শরীর শক্ত হয়ে গিয়েছে, কিন্তু সামলে রেখেছে। গাই এর আগে খেয়াল করেনি যে তার ছেলে কতোটা লম্বা হয়ে গিয়েছে।
“বিদায়, বাবা। আমাদের আর দেখা না হওয়াই ভালো হবে।”
“দাঁড়াও,” গাই ডাক দিলো। কিন্তু ক্রিস্টোফার আর ওর ডাক শোনার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে নেই।
*
সুর্য কিরণ একেবারে বজ্রপাতের মতো ক্রিস্টোফারের চোখে আঘাত করলো। মাত্র যা করে এসেছে তার ভয়াবহতা মনে হতেই ওর মাথা ঘুরে যাচ্ছে। একরকম টলতে টলতেই রাস্তাটা পার হয়ে এলো। সমুদ্রতীরের সাথে দেখা করলো রুথ। জায়গাটা মরচে পড়া নোঙ্গর আর ছিঁড়ে যাওয়া দড়াদড়িতে ভরা। শেষ দেখা হওয়ার পর এক ঘণ্টাও পার হয়নি, তবুও রুথ দুই হাত বাড়িয়ে এমনভাবে ক্রিস্টোফারকে জড়িয়ে ধরলো যেনো কতোকাল ওদের দেখা হয় না।
নয়মাস আগে রুথ ওর বাবার সাথে এখানে এসেছে। ওরা যে ইন্ডিয়াম্যানে করে এসেছিলো সেটা ক্রিস্টোফারের চোখের সামনেই বন্দরে এসে নোঙ্গর করে। দুর্গের দেয়ালের পাশে বসে ও জাহাজের যাত্রীবাহী ডিঙ্গিটায় রুথকে এক ঝলক দেখতে পায়। মাত্র ষোল বছর বয়স, শঙ্খের মতো গায়ের রঙ, লাল টকটকে চুল, কোনো মেয়েতে এই দুই রঙের সম্মিলন এর আগে দেখেনি ও। নৌকাটা দুর্গের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রুথ চোখ তুলে তাকায়, চোখে ওর নতুন ঠিকানা সম্পর্কে সন্দিহান কৌতূহল। তখনই ক্রিস্টোফারের নজরে পড়ে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে ও নিজের উরুতে এমন, এক কাঁপুনি টের পায় যা আগে কখনোই পায়নি। কামনার আবেশে দম বন্ধ হয়ে আসছিলো ওর।
বোম্বেতে এক ইংরেজ মেয়ের আগমন অনেকটা মরুভূমিতে গোলাপ ফোঁটার মতো। আর সেই ফুলের সুবাস নিতে পুরুষ মানুষের অভাব নেই এখানে। কিন্তু গাই কোর্টনীর ছেলে রুথের ব্যাপারে আগ্রহী জেনে সবাই হাত গুটিয়ে নেয়।
তারপরেও সবকিছু হতে সময় লাগে অনেক। ক্রিস্টোফার মেয়েদের সাথে কথাই বলতে পারতো না। কারণ দাসী বাদে আর কোনো মেয়ের সাথে কখনো কথা হয়নি ওর। কতো রাত ও জেগে কাটিয়েছে রুথ এর ঠোঁটের স্বাদ কেমন হবে সেটা চিন্তা করে করে। নিজের কাপুরুষতায় নিজেকে হাজারবার গালাগাল করে কাটিয়েছে আরো কতো রাত।
রুথ নিজেও ছিলো অনেক ধৈর্যশীলা। ও বুঝতে ক্রিস্টোফারের আসলে কেমন লাগে, কিন্তু ওর বাবা মা সেটা বুঝতে না। ও ক্রিস্টোফারের ভিতরের ভালোবাসাটা ধরতে পেরেছিলো, সেটাকেই ও মমতা আর যত্নের দিয়ে বের করে এনেছে। গভর্নরের বাড়িতে একটা সমাবেশ হয়েছিলও একবার। সেখানে সৈন্যদের পরিবারকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়, কারণ এখানে মহিলার সংখ্যা ছিলো একদমই কম। সেখানে রুথ ক্রিস্টোফারকে নাচের আমন্ত্রণ জানায়। প্রথম যখন ক্রিস্টোফার রুথকে স্পর্শ করে, ওর সারা শরীর কেপে ওঠে। সারা রাত নেচেছিলো ওরা সেদিন। কিন্তু তাতে ওর প্যান্টের সামনের দিকটা ফুলে আটসাট হয়ে গিয়েছিলো, মনে মনে ভাবছিলো যে সবাই নিশ্চয়ই ওকে দেখে। হাসছে। কিন্তু রুথ হাসলো না। ও ক্রিস্টোফারকে নাচে সাহায্য করতে লাগলো, আর নাচের ফাঁকে যখনই ওরা মুখোমুখি নাচতো তখন ও একটু সামনে এগিয়ে যেতো যাতে ক্রিস্টোফার পরনের পাতলা কাপড়টার উপর দিয়েই ওর শরীরের প্রতিটা বাক টের পায়।
