কিছুক্ষণ কেউ কিছু বললো না। সবাই আশা করছিলো যে ফ্রান্সিস কিছু বলবে, কিন্তু ও কিছু বলার সাহস পেলো না।
“ফ্রান্সিস কাল রাতে মাথায় আঘাত পেয়েছে। সম্ভবত এখনো পুরোপুরি ব্যথা যায়নি,” টম বললো।
অ্যানার চোখ দুশ্চিন্তায় ছেয়ে গেলো। “ইশ! বেশি ব্যথা পেয়েছে? কি হয়েছিলো?”
“ও আমাদেরকে খুন করে ফেলার চেষ্টা করছিলো, তাই টম মাথায় বাড়ি মেরে ঠাণ্ডা করেছে, ডোরিয়ান বললো।
অ্যানা দুই ভাইয়ের দিকে খেয়াল করলো আবার। এবার ওদের চেহারা আর হাতের কাটাছেঁড়াগুলো নজরে এলো ওর। আসার সময় বাতাসে পোড়া গানপাউডারের গন্ধ পেয়েছিলো। আর কার্পেটে ছিটিয়ে থাকা রক্তের দাগও দেখেছে। মিসেস লাই পুরোপুরি পরিষ্কার করতে পারেননি দাগটা।
“এখন নিশ্চয়ই ওনার সে ইচ্ছা চলে গিয়েছে?”
ডোরিয়ান ফ্রান্সিসকে আড়চোখে একবার দেখলো। “সেরকম-ই আশা করি। কারণ ও এতোদিন যা জানতো, ভুল জানতো।”
ফ্রান্সিস সাবধানে উঠে দাঁড়ালো। এখনো পায়ে পুরোপুরি বল আসেনি। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। “আমাকে আসলে ভুল পথে চালানো হয়েছিলো।”
হঠাৎ ও বুঝলো কথাটা আসলে ঠিক হলো না। সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে, বিশেষ করে অ্যানা। নিজের দোষ নিজের কাঁধে নিতে শিখতে হবে ওকে।
“আমি অন্য লোকের মিথ্যে কথাগুলো বিশ্বাস করেছিলাম, কিন্তু যাদের কথা শোনা উচিত ছিলো তাদেরকে পাত্তা দেইনি। আমি আপনাদের যে বিপদে ফেলেছিলাম সেজন্যে ক্ষমা চাচ্ছি, এসবের ক্ষতিপূরণ হিসেবে আমাকে যা করতে বলবেন তা আমি খুশি মনেই করবো। আমার যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে।”
টম ওর কাঁধে হাত রাখলো। “ঠিক আছে। এখন শোনো, কাল রাতে মিস দুয়ার্তে আমাদেরকে তার ব্যবসার অংশিদার হওয়ার একটা প্রস্তাব এনেছিলেন। তুমিও ইংল্যান্ড ছেড়েছো ভাগ্য গড়তে; আমরা তোমাকে সে ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবো বলে মনে হয়।”
ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে সবার সাথে খাবার ঘরের দিকে আগালো। ব্যথা শরীরেও দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতে সাহায্য করলো অ্যানাকে।
অ্যানা আসার কারণে যে কথোপকথনটা থেমে গিয়েছিলো সেটার কথা ও বেমালুম ভুলে গিয়েছে। অনেক পরে ওর খেয়াল হলো, আচ্ছা গাই চাচার কথা বলায় টম চাচা ওরকম আচরণ করলো কেনো?
*
প্রখর রোদের কারণে সমুদ্রের উপরিভাগ এতোটা মসৃণ আর উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। যে মনে হচ্ছে পাথর কুঁদে পুরো জিনিসটা বানানো। এমনকি ছোট ছোট ঢেউগুলো যখন তীর এসে পড়ছিলো তারাও কোনো আলোড়ন না তুলে একেবার নিখুঁতভাবে ছড়িয়ে পড়ছিলো। সৈকতেই দুটো ইন্ডিয়াম্যান অলস ভাবে নোঙ্গর ফেলে ভেসে আছে।
মোহনায় কয়েকটা ছোট ছোট চর মাথা তুলে আছে। প্রতিটা পাহাড়ের চুড়ায় একটা করে পাথরের তৈরি দুর্গ। একগাদা বট গাছের ভিতর থেকে বিশাল একটা প্যাগোডার সুউচ্চ মিনার আর গম্বুজ মাথা তুলে আছে। ওখান থেকে একটা মাস্কটের গুলির দূরত্বের চাইতেও কম চওড়া একটা খাড়ি পার হলেই বিশিষ্ট ভারতীয় উপমহাদেশ।
দুর্গ থেকে দুপুরের সংকেতদায়ী কামানের বুম শব্দ কানে এলো ক্রিস্টোফার কোর্টনীর। মুখ থেকে ঘাম মুছলো ও। নিজের সেরা জামা আর প্যান্টটা পরে আছে আজ। বোম্বের যত সওদাগর আছে তারা সবাই-ই আজ সকাল সকাল ব্যবসাপাতি গুটিয়ে, ঘরের ভিতরের তুলনামূলক ঠাণ্ডা পরিবেশ ফিরে গিয়েছে। এই মুহূর্তে ও বাদে জাহাজে আর কেউ নেই।
Two monsoons are the age of a man,’ বোম্বের পুরনো প্রবাদ এটা। মাত্র দুই বছরেই ক্রিস্টোফার সেই কোটা পূরণ করে ফেলেছে। সৈকতের পাশের লবণের ঘেরগুলো থেকে ভেসে আসা কটু গন্ধের সাথে শুকাতে দেওয়া পচা মাছের দুর্গন্ধ ভেসে আসছে। ফলে কেউ না দেখাও বলে দিতে পারবে যে ওরা তীরের কাছে পৌঁছে গিয়েছে। পচা মাছগুলো স্থানীয় লোকেরা নারিকেল গাছের গোড়ায় সার হিসেবে দেয়। তীরেও কাউকেই দেখা গেলো না। সবাই ঘরের ভিতর বসে বসে মুনাফা গুনছে আর দিন গুনছে কবে ইংল্যান্ড ফিরে গিয়ে জান বাঁচাবে।
ক্রিস্টোফার প্রায় পনেরোটা বর্ষা পার করে ফেলেছে এখানে-মানে ওর প্রায় পুরো জীবনটাই, মাঝে শুধু তিন বছর ছিলো জাঞ্জিবারে। ভারতের গরম পরিবেশে এসে দেখা যায় অনেকেই নিস্তেজ হয়ে এমনকি মারাও পড়ে, সেখানে ক্রিস্টোফারের চেহারা আরো খোলতাই হয়েছে। লম্বা একহারা গড়ন, শক্ত চোয়াল, গাঢ় বাদামী চোখ। ওর বাবার কোনো বৈশিষ্ট্যই পায়নি বলা চলে। সবাই কথাটা বলে তবে অবশ্যই ওর বাবার আবডালে।
এই গরমের মাঝেও ও কাঁপছে। এক কাহিল হয়ে যাওয়া প্রহরী ওকে ফটক দিয়ে ঢুকতে দিলো। উঠোন পেরিয়ে ও গভর্নরের বাসভবনে চলে এলো। দ্বীপটা যখন পর্তুগিজদের অধীনে ছিলো সেই সময়কার একটা ধ্বংসাবশেষ এই কুঠিটা। একটা মনোরম তিন-তলা বাড়ি, এখনো সদর দরজায় পর্তুগিজ প্রতীক খোদাই করা আছে। দুর্গের দেয়াল ছাড়িয়ে ওটার মাথা দেখা যায়। মূলত ইংরেজরা দখল নেওয়ার পর ওরা বাড়িটাকে ঘিরে দুৰ্গটা নির্মাণ করে।
যদিও এটা নিজের বাড়ি, তবুও ভিতরে ঢুকতে যেতেই দুশ্চিন্তায় ক্রিস্টোফারের শ্বাস ভারি হয়ে এলো। সিঁড়ির বেয়ে উঠে গভর্নরের অফিসের ভারি কাঠের দরজায় আস্তে টোকা দিলো ও।
“এসো,” পরিচিত কণ্ঠটা গর্জে উঠলো।
গাই কোর্টনী নিজের ডেস্কের পিছনে বসে আছে। উল্টোদিকে তিনটা বিশাল বিশাল জানালা। এগুলো দিয়ে সে সহজেই ঘাটের প্রতিটা জাহাজের উপর নজর রাখতে পারে। ডেস্কের উপর কাগজপত্র পরিপাটি করে সাজানো-চিঠিপত্র, আইনের বই, বিভিন্ন ঘোষণাপত্র, টাকার রসিদ। এসব দিয়েই চালিত হয় কোম্পানির ব্যবসা। লোকে বলে কোম্পানির ব্যবসা নাকি জাহাজের গায়ে লাগা বাতাসের চাইতেও দ্রুত চলে। দেয়ালের বাম দিকে গাই-এর বাবা হাল এর একটা তৈলচিত্র ঝোলানো। ওনার হাতে একটা দুর্দান্ত সুন্দর তরবারি। সোনালি হাতলে একটা বিশাল নীলকান্ত মণি খোদাই করা তাতে। ছবিটা আঁকা-ও হয়েছে এতো দারুণভাবে যে ছবির ভিতর থেকেই পাথরটা দ্যুতি ছড়াচ্ছে।
