ফ্রান্সিস কাটা কাটা ভাবে বললো, “হ্যাঁ, আমি।”
“তাহলে তুমি ঐ ভ্রিস এর মতো গুণ্ডাদের সাথে মিশলে কিভাবে?”
“একটা সরাইতে দেখা হয়েছিলো। একটা… মেয়েমানুষ আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো।” ফ্রান্সিসকে দেখে বোঝা গেলো যে লজ্জায় মরে যাচ্ছে। “আপনাকে পুরো ঘটনাটা খুলে বললেই ভালো হবে।”
টম ডোরিয়ান আর আবোলিকেও গল্প শোনার জন্যে ডেকে আনলো। টম অবাক দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। আবোলির চেহারার কাটা দাগ, আর ডোরিয়ানের মাথার পাগড়ি আর আরব পোশাক-দুটোই অবাক করেছে ওকে। আর ডোরিয়ান আসলে কে সেটা জানার পর ওর মুখ আক্ষরিক অর্থেই হাঁ হয়ে গেলো।
“আমাকে যা যা বলা হয়েছে সব দেখি মিথ্যে। আমি জানতাম যে আপনি আর বেঁচে নেই।”
“সে এক লম্বা কাহিনি,” ডোরিয়ান বললো। “বলবো পরে একসময়। কিন্তু তার আগে তুমি এখানে কিভাবে এলে আর আমাদেরকে খুঁজে পেলে সেই কাহিনি শোনাও দেখি।”
ছিন্নভিন্ন কুশনগুলোতে বসেই ফ্রান্সিস ওদেরকে সব খুলে বললো। শুনতে শুনতে উত্তেজিত হয়ে গেলো টম। স্যার ওয়াল্টারের কর্মকাণ্ড শুনে ও জোরে জোরেই গালাগাল করে উঠলো।
“বেচারা এলিস। যেদিন আমি বিলিকে খুন করলাম, সেদিন থেকেই আসলে দুর্দশার শুরু।”
“ও উইলিয়ামের সাথেও সুখী হতে পারতো না,” আবোলি বললো। “ও ওর সাথে কেমন ব্যবহার করতো তা তো দেখেছিলেই। যেভাবে ওকে মারধোর করতো, তাতে মনে হয় উইলিয়াম এলিস আর ফ্রান্সিস দুজনকেই মেরে ফেলতে।” টম ওকে ইশারায় থামতে বললো। কিন্তু আবোলি প্রতিবাদ করে বললো, “না, ছেলেটার নিজের বাবা সম্পর্কে সব সত্যি জানার অধিকার আছে।”
“আমি জানি, ফ্রান্সিস বললো। আমি আসার আগে মা আমাকে বাবা। সম্পর্কে সব সত্যিটা বলেছিলেন। বাবা কেমন মানুষ ছিলেন সেটাও বলেছেন। উনি বলেছেন আপনি যা করেছেন নিজেকে রক্ষা করতে করেছেন।” তারপর বিব্রত ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে নাড়তে বললো, “আমি তার কথা বিশ্বাস করিনি।”
“আচ্ছা,” সেদিনের ভয়াবহ রাতটার কথা মনে পড়লো টমের। “তবে ওটা পুরোটাই বিলির দোষ ছিলো না। লর্ড চিল্ডস বলে না দিলে ওর জানার কথা ছিলো না যে আমাকে কোথায় পাওয়া যাবে।”
ফ্রান্সিসের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। “স্যার নিকোলাস চিল্ডস? তার মানে আমার সাথে দুই নম্বরি করা হয়েছে? আমাকেতো উনিই পাঠিয়েছেন। আপনাকে কোথায় পাওয়া যাবে সেই খবর উনিই দিয়েছেন আমাকে। আপনাকে মারতে পারলে পাঁচ হাজার পাউন্ডও দেবেন বলে কথা দিয়েছেন।”
“পাঁচ হাজার পাউন্ড এর লোভ দেখালে তো আমিও কাজটা করতাম, মজা করে বললো ডোরিয়ান। কিন্তু টম মজার মেজাজে নেই।
“টাকা তুমি জীবনেও পেতে না। চিল্ডস একটা মাকড়সা। পৃথিবীর সমস্ত কোনায় কোনায় জাল বুনে রেখেছে সে। লেডেনহল স্ট্রিটে নিজের ডেরায় বসে বসে ও কুমতলব আটে আর এক পয়সার লাভেরও কেউ প্রতিদ্বন্দ্বী হলে তাকে জালে আটকে শেষ করে দেয়। আমি তাকে প্রায় বিশ হাজার পাউন্ড লাভ করে দিয়েছিলাম, কিন্তু সামান্য একটা এক মাস্তুলের জাহাজের বখরা দিতে অস্বীকার করায় উনি আমাকে খুন করার চক্রান্ত করেন। আস্ত একটা শয়তান লোকটা।”
“এখন আমি বুঝতে পারছি।”
“তোমার চাইতে অনেক বুদ্ধিমান লোক ওনার শয়তানির ফাঁদে পড়ে সব হারিয়েছেন। আমার ধারণা এমনকি তোমার বাবা বিলিও তার শিকার। ও বুঝতে পারেনি যে আসলে ও চিল্ডসের কুমন্ত্রণার এক সামান্য ঘুটি মাত্র! বিলি আমাকে খুন করতে চাইতো সেটা ঠিক, কিন্তু চিল্ডসই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো। কোনো সন্দেহ নেই যদি সেদিন বিলি সফল হতো তাহলে ওর এই অপরাধটা চিল্ডস ওর বিরুদ্ধেই ব্যবহার করতো।”
ফ্রান্সিসের ভ্রু কুঁচকে গেলো। “তাহলে এখন আমি কি করবো? লর্ড চিল্ডস গাই চাচা আর বোম্বেতে কোম্পানির অফিসে দেওয়ার জন্যে একটা চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু-” টমের মুখভঙ্গি বদলে যেতে দেখে ও থেমে গেলো। “কি হয়েছে?”
“গাই তো আর এক চীজ।”
“কিন্তু ফ্রান্সিস একজন কোর্টনী। আর আমাদের পরিবারের সম্পূর্ণ ইতিহাস জানার অধিকার ওর আছে,” নরম স্বরে বললো ডোরিয়ান। “এসব গোপন কথা আর অর্ধ সত্যগুলোই আমাদেরকে আলাদা করে রেখেছে। এসব কারণেই লর্ড চিল্ডসের মতো শয়তানগুলো আমাদেরকেই আমাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে ফায়দা উঠাচ্ছে।”
টম জবাব দেওয়ার আগেই দরজায় করাঘাতের আওয়াজ পাওয়া গেলো। অ্যানা দুয়ার্তে ঢুকলো ভিতরে।
“বিরক্ত করলাম নাকি? আজ সকালে আমার প্রস্তাবটার ব্যাপারে আর একবার আলোচনা করার কথা ছিলো না?” তারপর ফ্রান্সিসের উপস্থিতি দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলো, “ইনি কে?”
ওর চেহারায় কৌতূহলের ভাব স্পষ্ট। এমনভাবে ফ্রান্সিসের দিকে চেয়ে রইলো যেনো এই ঘরে ও-ই একমাত্র পুরুষ মানুষ। আনমনেই নিজের জামার গলার কাছটা টেনেটুনে ঠিকঠাক করে নিলো অ্যানা।
টম ওদের পরিচয় করিয়ে দিলো। “এ হচ্ছে আমার ভাতিজা, ফ্রান্সিস। ইংল্যান্ড থেকে এসেছে। গতরাতেই। আমরা অবশ্য জানতাম না। ফ্রান্সিস, এ হচ্ছে অ্যানা দুয়ার্তে। উনি আমাদের ব্যবসায়িক পার্টনার। অবশ্য এখনো সবকিছু চূড়ান্ত হয়নি।”
ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকালো। যেনো একটা ঘোরের মাঝে আছে-যেন ওর দেখা সবচে স্পষ্ট স্বপ্নটা দেখছে এখন। অ্যানার সবকিছুই যেন একেবার সূক্ষ্মভাবে ওর চোখে ধরা পড়ছে। ওর কানের পেছন দিয়ে এক গোছা চুল বেরিয়ে আছে; ওর ঠোঁটের বাক; ওর চোখে আটকে থাকা অ্যানার বাদামী চোখের গভীরতা-সব।
