“ইয়াসমিনির ওষুধে কাজ করছে তাহলে,” মন্তব্য করলো ও।
ফ্রান্সিস আবোলির দিকে তাকিয়ে থাকলে কিছুক্ষণ। তারপর দেয়ালের জানালাটার দিকে তাকালো। এদিক দিয়ে কি বের হওয়া যাবে? ওর পরনে শুধু একটা নাইট শার্ট। এই পোশাক কেপ টাউনের রাস্তায় ওকে দেখতে একটা উন্মাদের মতো লাগবে। ওকে কি তখন গ্রেপ্তার করা হবে?
আবোলি ঘরের অন্যদিকে ইঙ্গিত করলো। সেখানে চেয়ারের উপর একটা জামা আর একটা পায়জামা ভাজ করে রাখা আছে।
“পালাতে চাইলে কাপড় পরে নেওয়াই ভালো।”
“আমাকে থামাবেন না?”
আবোলি দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো। “তুমি এখানে নিরাপদ। কিন্তু যদি তুমি পালাতেই চাও…”
ওকে কথা শেষ করতে দিলো না ফ্রান্সিস, “নিরাপদ?” ব্যঙ্গ ঝরলো ওর কণ্ঠ থেকে। “টম কোর্টনী আমার বাবাকে খুন করেছে।” ও চেয়েছিলো কথাটা বলে আবোলিকে চমকে দেবে, কিন্তু আবোলি শুধু মাথা ঝাঁকালো একটু। “আপনি সেটা বিশ্বাস করেন না?”
“তোমার বাবাকে আমি জন্মের দিন থেকে চিনি,” মাপা স্বরে বললো আবোলি। “আমি মন থেকে বলতে পারি সে কতটা খারাপ লোক ছিলো। উইলিয়াম মারা যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে টম হাই উইন্ডে গিয়েছিলো ওদের ভাইয়ের ব্যাপারে সাহায্য চাইতে, আর উইলিয়াম সাহায্যের বদলে টমের উপর চড়াও হয়। ও টমকে মেরেই ফেলতো সেদিন, কিন্তু টম তরবারি চালোনায় ওর চাইতে দক্ষ ছিলো। তাই শেষে দেখা গেলো টম-ই উইলিয়ামের গলায় তরবারি ধরে আছে। কিন্তু টম শেষ আঘাতটা করতে পারেনি। ওর হাত ওর কথা শোনেনি। এর এক সপ্তাহ পরে লন্ডনে উইলিয়াম টেমস নদীর ঘাটে কোনো ধরনের উস্কানি ছাড়াই টমকে আক্রমণ করে বসে; সাথে লোকবল ছিলো। কিন্তু সাথের লোকগুলো যখন পারলো না, তখন ও পিস্তল বের করে টমকে গুলি করতে যায়। আমি সেখানে ছিলাম। টম সেসময় তোমার বাবার বুকে তরবারি না বসালে নিশ্চিত তখনই মারা পড়তো।”
আবোলি বলে চললো, ছেলেটার উপর ওর, কথার কোনো প্রভাব পড়ছে কিনা সেদিকে খেয়াল নেই। এমনকি যদি এই ঘটনার আগে তোমার বাবা তার চেহারা দেখাতো-যদি টম জানতো যে লোকটা আসলে কে-তাহলে টম আঘাতটা করতে পারতো না।”
“আপনি এসব কেনো বলছেন আমাকে?” ফ্রান্সিস জানতে চাইলো। “আমাকে আমার বাবার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে?”
“কথাগুলো সত্যি তাই,” আবোলি বললো। “তুমি এটা মেনে নিতে পারো, নাও নিতে পারো; সেটা তোমার ব্যাপার। তবে যদি তুমি একটা মিথ্যাকে আঁকড়ে থাকো তাহলে সেটা একসময় তোমাকে ধ্বংস করে দেবে।” তারপর সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বললো, “কাপড় পরে নাও।”
আবোলি বেরিয়ে যাওয়ার পর ফ্রান্সিস দীর্ঘ সময় খাটের পাশে বসে রইলো। ওর ভিতরে যে উন্মত্ততা ছিলো সেটা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে; ও যে আসলে এখন কে সেটাই ভেবে পাচ্ছে না। চেয়ারের উপরের কাপড়গুলোর দিকে তাকালো ফ্রান্সিস, ওগুলো পরতে পারবে কিনা সে ব্যাপারেও নিশ্চিত না। আবোলির কথাগুলো ওর মাথার ভিতর বন বন করে ঘুরছে। একসময় ওর মনে হলো যে মাথাটা দুই ভাগ হয়ে যাবে।
গত রাতের সব কথা ওর মনে নেই, তবে একটা জিনিস স্পষ্ট মনে আছে। টম চাইলেই ওকে মেরে ফেলতে পারতো, কিন্তু সেরকম কিছুই করেনি।
আর এই একটা কারণেই ফ্রান্সিসের সকল বিশ্বাস ওলট পালট হয়ে যাচ্ছে। ওর মনে পড়লো যে ওর মা কি বলেছিলেন। টম ঠাণ্ডা মাথায় নিজের ভাইকে খুন করার লোক না। কথাটা বিশ্বাস হয়নি ওর। আর এখন যখন ও টম কোর্টনীর কবলে পড়েও বেঁচে গিয়েছে, তখন মনে হচ্ছে যে মায়ের কথাটা সত্যি হলেও হতে পারে।
ওখানে বসে বসে ও নিজেকে এক নতুন দৃষ্টিতে দেখতে লাগলো। বেশ্যা আর মাস্তানদের সাথে আঁতাত করছে, নিজের পরিবারের একজন সদস্যুকে খুন করার চেষ্টা করছে-এ কেমন মানুষে পরিণত হয়েছে ও? আর বিনিময়ে টম কোর্টনী ওকে দিয়েছে দয়া আর করুনা।
যদি তুমি একটা মিথ্যাকে আঁকড়ে থাকো তাহলে সেটা একসময় তোমাকে ধ্বংস করে দেবে।
কিন্তু ওর কি মিথ্যটাকে ত্যাগ করার মতো সৎ সাহস আছে?
*
ফ্রান্সিস নিচে নেমে এসে দেখে টম বসার ঘরের চেয়ারে বসে অর্ডার অফ দ্য সেন্ট জর্জের পদকটা হাতে নিয়ে দেখছে। ফ্রান্সিসের পরনে ডোরিয়ানের পায়জামা আর গায়ে টমের জামা। দেখে মনে হচ্ছে মাস্তুল থেকে পাল ঝুলছে বুঝি। ও সিঁড়ির মাঝপথে থেমে গেলো; টম ভেবেছিলো ওকে দেখেই হয়তো ফ্রান্সিস দৌড়ে পালিয়ে যাবে। কিন্তু ফ্রান্সিস জানে যে এভাবে চলতে দেওয়া যাবে না। ও ভয়টাকে গিলে নামতে শুরু করলো আবার।
সিঁড়ির গোড়ায় নেমে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলো ওরা। কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না।
টম-ই নীরবতা ভাঙলল। “মাঝে মাঝে তরবারি হাতে কারো সাথে দেখা হলেই ভালো হয়, দুঃখিত কণ্ঠে বললো ও। “তাহলে কি বলতে হবে সেটা ভাবতে হয় না।”
ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকালো। তারপর আচমকা ওর ভিতর থেকে কথা ফুটে বেরুতে লাগলো। “আমার যত্ন নেওয়ার জন্যে আমি কৃতজ্ঞ। আমি… আপনি চাইলেই আমাকে পুলিশে ধরিয়ে দিতে পারতেন। বা চাইলে আরো খারাপ কিছু করতে পারতেন।”
“আমরা এভাবে শান্তভাবে কথা বলতে পারছি তাতেই আমি খুশি,” টম বললো। ও এমনভাবে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আছে যেনো যে কোনো মুহূর্তে ও গায়েব হয়ে যাবে। “তুমি কি আসলেই বিলির ছেলে?”
