ও সামনে ঝুঁকে ফ্রান্সিসের হাত ধরে দাঁড় করিয়ে দিলো। “বোঝাই যাচ্ছে যে তোমার আর আমার অনেক কথা বলা বাকি।” ওর স্বর শান্ত কিন্তু অনুতাপে ভরা। “তোমাকে অন্তত সবকিছু ব্যাখ্যা করে বলা উচিত।”
*
ফ্রান্সিস ঘুম ভেঙে দেখলো একটা পালকের বিছানায় শুয়ে আছে। প্রায় একমাস যাবত জাহাজের একটা সরু খাটে শোয়ার পর শয্যাটা ছিলো একেবারে স্বর্গশয্যার মতো। এক মুহূর্তের জন্যে মনে হলো ও বোধহয় হাই উইন্ডে ফিরে গিয়েছে আবার। চাকরেরা একটু পরেই ওর জন্যে সকালের নাস্তা নিয়ে আসবে।
পাশ ফিরে শুতে গেলো ফ্রান্সিস। তীব্র একটা ব্যথা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তেই সব মনে পড়ে গেলো ওর। ও হাই উইন্ডে নেই। আছে কেপ টাউনে। ওর সারা শরীরে আঘাত।
চোখ খুলে তাকালো ও। কফির মতো গায়ের রঙের এক মহিলা ওর পাশে এসে বসলো। মাথার উপর একটা শাল জড়ানো। তার পেছনে মুখে দাগওয়ালা এক বিশাল কৃষ্ণাঙ্গ লোক দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।
“আমি কোথায়?”
“টম আর ডোরিয়ান কোর্টনীর বাসায়, কালো লোকটা বললো।
ফ্রান্সিস লাফ দিয়ে উঠে বসলো। একটু বেশিই জোরে হয়ে যাওয়ায় সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা ছড়িয়ে পড়লো আবার। ও বিছানা ছেড়ে নামার চেষ্টা করলো। কিন্তু ব্যথার চোটে পারলো না।
“আমাকে এখানে পেলে টম কোর্টনী মেরেই ফেলবে,” কোনোমতে বললো ও।
“টম কোর্টনী তোমাকে মাফ করে দিয়েছেন। তোমার ক্ষতে ব্যান্ডেজ বেঁধে একজন ভদ্রলোক হিসেবে তোমার সেবা করতে কে বলে দিয়েছে বলে তোমার মনে হয়?”
“এটা খাও,” মহিলাটা বললো! বিশ্রী গন্ধযুক্ত একপাত্র তরল ওর ঠোঁটের সামনে ধরলো সে। ফ্রান্সিস একটু চেখে ওয়াক করে পাত্রটা একদিকে ঠেকে দিলো। চেহারায় দাগওয়ালা কালো লোকটা এগিয়ে আসলো বিছানার দিকে। তারপর ফ্রান্সিসের নাক টিপে ধরলো যাতে ও মুখ খুলতে বাধ্য হয়।
“মিস ইয়াসমিনি তোমাকে খেতে বলেছে, চুপচাপ খেয়ে নাও!” মহিলাটা আবার ওর ঠোঁটের ফাঁকে পাত্রটা ধরলো। ফ্রান্সিস আর ঝামেলা না করে চুপচাপ খেয়ে নিলো। সাথে সাথে কাজ হলো ওষুধে। অবিশ্বাস্যভাবে ওর ব্যথা গায়েব হয়ে গেলো। তবে মাথাটাও ঝিম ঝিম করে উঠলো। বিছানাটাও এতে নরম। না চাইতেও চোখ বন্ধ হয়ে এলো ওর।
ইয়াসমিনি ওর ক্ষতগুলো পরিষ্কার করে দিলো; ওগুলো অবশ্য খুব বেশি গভীর না। বন্য গুল্ম কেটে তৈরি করা একটা মলম ওখানে লাগিয়ে দিলো। এসব গুলা ও নিজেই সংগ্রহ করেছে। আল্লাহর রহমতে ক্ষত নিখুঁত ভাবেই সেরে যায়।
“আমি ভাবছি ও কি আসলেই টম আর ডোরিয়ানের ভাতিজা?” ইয়াসমিনি বললো।
“যদি না হয়, তা হলে একটা মাত্র মিথ্যা বলার জন্যে ও অনেক দূর চলে এসেছে,” মাথা নেড়ে বললো আবোলি। “জন্মের পর থেকে আমি উইলিয়াম কোর্টনীকে চিনি। এই ছেলেটা একেবারে ওর মতোই। আর এই ব্যাপারটাও আছে।”
ও তাকের উপর রাখা একটা পদক দেখালো। চুনির চোখওয়ালা একটা সোনালি সিংহ। ওটার পায়ের নিচে পৃথিবী, আর উপরে হীরার তারা খচিত আকাশ। “এটা ছিলো ক্লিবি-র বাবার। ছেলেটার জামার নিচে পেয়েছি। এতেই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয় যে ও আসলে কে।
“কিন্তু সবাই জানে যে টম উইলিয়ামকে খুন করেছে। আর এজন্যেই ও আর কখনো ইংল্যান্ড ফিরতে পারবে না। উইলিয়ামের সাথে যা হয়েছে সেজন্যে টম এখনো নিজেকে ক্ষমা করতে পারেনি। ছেলের সাথে নিশ্চয়ই ও একই ভুল করবে না,” আবোলি বললো।
দরজায় টোকা শোনা গেলো। টম উঁকি দিলো সেখান দিয়ে। “রোগীর অবস্থা কি?”
“ওকে মারতে ব্যর্থ হয়েছেন আপনি,” খোঁচা মেরে বললো ইয়াসমিনি। “আবার যদি মারধোর না করেন তাহলে এ যাত্রা বেঁচে যাবে।”
টম বিছানার কাছে গিয়ে ঘুমন্ত ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে থাকলো। বাবার মতোই ঘন কালো চুল হয়েছে ফ্রান্সিসের, কিন্তু বাকি সব বৈশিষ্ট্য নরম সরম। অনেকটা মেয়েদের মতোই সুন্দর। মোটেও ওর বাবার মতো না। টম আশা করলো ওর স্বভাবও যেনো এরকম উল্টো হয়।
টম হিসেব করতে বসলো শেষ কবে ও হাই উইল্ডের সিঁড়িতে ছোট্ট ফ্রান্সিসকে খেলতে দেখেছিলো। ছেলেটার বয়স এখন কমপক্ষে সতেরো। টম ও বাড়ি ছেড়েছিলো ঠিক এই বয়সে। বা বলা যায় ওকে জোর করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিলো। আর কখনোই ও হাই উইল্ড বা ইংল্যান্ড ফিরতে পারেনি। একজন ফেরারি আসামী-যার হাতে লেগে আছে তার ভাইয়ের রক্ত। সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্তটাকে এখনো ভুলতে পারে না টম। টেমস নদীর ঘাটের অন্ধকার গলিতে ও লোকটাকে মেরেছিলো শুধু নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে। অথচ টুপি সরিয়ে দেখা গেলো লোকটা ওর নিজের ভাই।
অর্ডার অফ দ্য সেন্ট জর্জের পদকটা তুলে নিলো টম। ও নিজেও নৌবাহিনির খেতাব প্রাপ্ত নাইট, তবে কখনোই পদকটা পরে না। উইলিয়াম অবশ্য সবসময়েই পরে থাকতো।
“ও উঠলে আমাকে ডাক দিও,” আবোলিকে বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো টম।
আমি ওর বাবাকে বাঁচাতে পারিনি। ছেলেকে দিয়ে সেই ঋণ আমি শোধ করতে পারি।
*
ফ্রান্সিস আবার জেগে উঠে দেখতে পেলো মহিলাটা ঘরে নেই। তবে কালো লোকটা তখনও দরজা পাহারা দিচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে এক চুলও নড়েনি জায়গা থেকে; ফ্রান্সিস একবার ভাবলো যে লোকটা কাঠের তৈরি নাতো?
ও সাবধানে উঠে বসলো। নাড়াচাড়া আস্তে করলে ব্যথা কম লাগে। বিছানা থেকে পা নামিয়ে উঠে দাঁড়ালো তারপর। কিন্তু ভারসাম্য রাখতে দেয়াল ধরে রাখা লাগলো। তবে আবোলি ওকে কিছু করলো না।
