টম আখ কাটার ছুরিটা কাদা থেকে তুলে নিয়ে ফ্রান্সিসের দিকে ফিরলো। কিন্তু ফ্রান্সিস ততোক্ষণে কাদায় গড়াগড়ি করে ভূত হয়ে গিয়েছে, আর পড়ার সময় হাত থেকে তরবারিটাও গিয়েছে ছুটে। নিরস্ত্র অবস্থায় টমের মুখোমুখি হওয়ার চাইতে পালানোই ভালো মনে করলো ও। তাই ঘুরে টলতে টলতে পুকুরের পাড় বেয়ে উঠে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো। ভয় আর লজ্জায় ফোপাচ্ছে ও। টম লোহার পাইপটা ওর দিকে ছুঁড়ে মারলো। ওটা থ্যাপ করে ফ্রান্সিসের পিঠের মাঝ বরাবর গিয়ে লাগলো। ফ্রান্সিস ব্যথায় কাতরে উঠলো কিন্তু থামলো না। সামান্য পরেই অন্ধকারে উধাও হয়ে গেলো, টম আর ওকে ধরতে গেলো না। আগে সারাহকে বাঁচাতে হবে।
জ্যাকব দ্য ভ্রিসের হুমকিটা কানে বাজতেই ও দৌড়াতে শুরু করলো। তোমার সুন্দরি বৌকে একটা দেখা দিয়ে আসি।
*
টম বাগানের দরজা দিয়ে দৌড়ে বের হয়ে মিসেস লাই এর বোর্ডিং হাউজের দিকে ছুটলো। বাড়িটার খোলা দরজার সামনে জ্যাকবের দুই সাঙাত পাহারা দিচ্ছে। ওরা টমকে আসতে দেখলেও অন্ধকারে চিনতে পারলো না। আর ওর হাতে আখ কাটা ছুরিটা থাকায় ওরা ভেবেছে টম বুঝি বাগানে থেকে যাওয়া ওদের দলের লোকটা।
“ধীরে সুস্থে, হেনড্রিক,” একজন স্বাগত জানালো ওকে। “জ্যাকব, কোর্টনী মাগী দুটোর সাথে কেবল মজা শুরু করেছে।”
বাড়ির ভিতর থেকে একটা তীক্ষ্ণ মেয়ে কণ্ঠের চিৎকার শোনা গেলো। প্রহরী দুজন হেসে সেদিকে ঘুরলো ঘটনা দেখার জন্যে। একজন মরার আগে জানলোও না কি তাকে আঘাত করলো। দ্বিতীয় জন আঘাত আর লাশটা পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে ঘুরতে গেলো, কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গিয়েছে। টমের আখ কাটার ছুরিটা ওর ঘাড়ের পাশ দিয়ে নেমে গেলো। ওর মেরুদণ্ড দুই ভাগ হয়ে গেলো তাতে। মাথাটা তখনও ঘাড়ের সাথে লেগে ছিলো। সেটা সামনের দিকে ভাঁজ হয়ে বুকের উপর ঝুলে পড়লো।
টম লাফিয়ে লাশ দুটো পেরিয়ে দরজা ধরে ছুটলো। বুকের ভিতর হৃৎপিণ্ডটা ঘোড়ার বেগে লাফাচ্ছে। আচমকা পিস্তলের গুলির আওয়াজ পাওয়া গেলো। টম না থেমেই হুড়মুড় করে বসার ঘরে গিয়ে ঢুকলো। রুমের উল্টো দিকে টমের দিকে মুখ করে সারাহ দাঁড়িয়ে আছে। বন্দুকের ধোয়ার পাতলা একটা আবরণে ঢেকে রেখেছে ওকে। তার পিছনে মিসেস লাই সারাহের জামা ধরে ভয়ে ফোপাচ্ছেন।
ডান হাতে সারাহ ওর ছোট ফ্লিন্ট-লক ডেরিঞ্জারটা ধরে আছে, হাত সামনে বাড়ানো। সামনে মেঝেতে উপুড় হয়ে চার হাত পা ছড়িয়ে পড়ে আছে জ্যাকব দ্য ভিস। খুলির পিছনে যেদিক দিয়ে বুলেট বেরিয়েছে সেই স্থানটা হা হয়ে আছে। মিসেস লাই-এর দামি কার্পেট ভরে গিয়েছে হলদেটে ঘিলুতে।
সারাহ আর টম সেকেন্ডের ভগ্নাংশ পরিমাণ সময় পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর সারাহ হাতের খালি পিস্তলটা ফেলে ঝাঁপিয়ে পড়লো টমের বুকে।
“টম কোর্টনী!” কেঁদে উঠলো সারাহ। ওর কণ্ঠে অর্ধেক ছিলো ফোপানি, বাকি অর্ধেক বাধ ভাঙা আনন্দ। “তুমি প্রতিজ্ঞা করেছিলে যে আমাকে ভালবাসবে, সম্মান করবে আর রক্ষা করবে। কিন্তু দরকারের সময়েই কোথায় ছিলে তুমি?”
“ও, আমার সোনা, আমার লক্ষী সোনা।” ও হাতের ছুরিটা ফেলে সারাহকে জড়িয়ে ধরলো। “আর কক্ষনো তোমাকে ছেড়ে যাবো না। কক্ষনো না! কক্ষনো না!” দেখা গেলো দুজনেই একসাথে কথা বলছে।
সামনে দরজায় আবার হল্লা শোনা গেলো। একটু পরেই ডোরিয়ান ঢুকলো ভিতরে। সাথে একটা কাদা মাখা ভুতকে ধরে এনেছে।
“সারাহ! টম!” ডোরিয়ান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। “আল্লাহর শুকরিয়া যে তোমরা ঠিক আছে। আমি ফেরার পথে পিস্তলের আওয়াজ শুনলাম, তারপরেই এই জানোয়ারটাকে দেখি পাহাড় ধরে নেমে যাচ্ছে।” বলে ও ওর বন্দীর পায়ের পেছনে একটা লাথি মারলো। ছেলেটা হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়লো মেঝেতে। “দেখেই বুঝেছি যে এর কোনো কুমতলব আছে, তাই ধরে এনেছি।”
টম দেখলো এ হচ্ছে ওকে আক্রমণকারী সেই কম বয়সী ছেলেটা।
“হ্যাঁ, এ ওদের দলেরই। সম্ভবত দলের সর্দার।” গম্ভীর কণ্ঠে বললো টম। সারাহের কাঁধে এক হাত জড়িয়ে রেখে ও মেঝেতে বসে থাকা ছেলেটা সামনে এসে দাঁড়ালো।
“কে তুই?” ঠাণ্ডা স্বরে জানতে চাইলো টম। “তোর সাঙ্গপাঙ্গগুলোকে যেভাবে মেরেছি তোকেও কেন সেভাবে মারবো না, বল দেখি?”
ছেলেটা ওর দিকে তাকালো। তারপর প্রাণপণ চেষ্টায় নিজের আতংক সামলে উল্টো চোখ রাঙ্গিয়ে চিৎকার করে উঠলো, “হ্যাঁ, টমাস কোর্টনী। দুই হচ্ছিস এক জন্ম খুনী। তুই আমার বাবাকে মেরেছিস-তার ছেলের সাথেও তো একই কাজই করবি।”
টম ওর প্রতি আনা অভিযোগ আর বলার হিংস্রতায় চমকে গেলো। ফলে ওর আক্রমণাত্মক ভঙ্গিটাও আর থাকলো না। কয়েক সেকেন্ড কেমন যেনো ওর মাথা কাজ করলো না ঠিকমতো।
“ঠিক আছে, তা কাকে খুন করার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। আমাকে?” জানতে চাইলো ও।
“আমার বাবা উইলিয়াম কোর্টনী। তোর সৎ ভাই।”
“উইলিয়াম…” টমের মুখের কথা আটকে গেলো। “তার মানে বিলি? ব্ল্যাক বিলি তোমার বাবা?”
“জ্বী হ্যাঁ, উইলিয়ামই আমার বাবা।”
“তার মানে তুমি হচ্ছে ফ্রান্সিস; ফ্রান্সিস কোর্টনী।”
আবারও টমের সেদিন মারমেইডস উইঙ্ক-এ দেখা সবুজ দ্যুতির কথা মনে পড়লো। একটা আত্মা আবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসবে।
