কিন্তু এখন মনে হচ্ছে যতো তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা শেষ হবে ততোই ভালো। ওর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে; আর নিতে পারছে না।
কোনো ব্যাপার না, নিজেকে বললো ফ্রান্সিস। কাজটা করাটাই আসল, কিভাবে সেটা মুখ্য না। ও টমের কাঁধ বরাবর তরবারিটা তাক করলো। ঠিক ওর সৎ বাবা যেভাবে শিখিয়েছে সেভাবে। এভাবে ধরলে তরবারিটা বুকের হাড়গুলোর ফাঁক দিয়ে ঢুকবে। ও এক পা সামনে আগালো।
কিন্তু এতো জোরে পা পড়লো যে নিচের পাথরগুলো কড়মড় করে উঠলো। টম ঘুরে গেলো সাথে সাথে। যে লোকটা ওর বাবাকে খুন করেছিলো, জীবনে প্রথমবারের মতো তার মুখোমুখি হলো ফ্রান্সিস।
“আপনি কি টম কোর্টনী?” জিজ্ঞেস করলো ফ্রান্সিস। কণ্ঠ যাতে না কাপে আপ্রাণ সে চেষ্টা করছে।
টমকে দেখে মনে হলো অবাক হয়েছে। “হ্যাঁ, আমিই সে।”
ফ্রান্সিস ঝাঁপিয়ে পড়লো সামনে। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূতে সরে গেলো টম। তরবারির ডগায় লেগে ওর জামার সামনের দিকটা ছিঁড়ে গেলো। চামড়ায় ঠাণ্ডা ধাতব স্পর্শ পেলো, কিন্তু সামান্য আচড়ের বেশি লাগলো না। এদিকে আঘাত জায়গামতো না লাগায় ফ্রান্সিস তাল সামলাতে না পেরে ভারসাম্য হারিয়ে ফেললো। টম চাইলেই ওর হাত থেকে থাবা দিয়ে তরবারিটা ফেলে দিতে পারতো, কিন্তু আর একটা অবয়বকে এগিয়ে আসতে দেখা গেলো ওর দিকে। লোকটা হাতের ভারি ছুরিটা ঠিক টমের মাথা বরাবর ধরে রেখেছে। টম পিছনে সরে গেলো। মাচার ফাঁক দিয়ে ওখানে চাঁদের আলো এসে পড়ছে।
সেই আলোয় দেখা গেলো, ওখানে মোট পাঁচজন আছে। এর মধ্যে জ্যাকব দ্য ভিসকে চেনে টম। বাকি তিনজনেরও চেহারা পরিচিত, এর আগেও জ্যাকবের সাথে দেখেছে। পঞ্চম যে ছোঁড়াটাকে ওকে তরবারি হাতে আক্রমণ করেছিলো তাকে ও জীবনেও আগে দেখেনি। কিন্তু অদ্ভুতভাবে ওর সবকিছু কেমন যেনো চেনা চেনা লাগছে।
কিন্তু এখন এসব ভাবার সময় নেই মোটেও। ছেলেটা আবার ওর দিকে এগিয়ে এলো। দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষিত মাপা আঘাত করলো সে, টমের হাত প্রায় কেটেই গিয়েছিলো। বাকি মাস্তানগুলো ওকে ঘিরে ফেলেছে ততোক্ষণে। পালানোর পথ বন্ধ করে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগলো সামনে।
বোঝা যাচ্ছে ছেলেটাই এদের সর্দার আজ। আক্রমণে ওর দক্ষতা আর ক্ষিপ্রতা দেখে বোঝা যাচ্ছে যে আসলে মারাত্মক বিপজ্জনক সে।
“তুই কে রে?” জানতে চাইলো টম। “তোকে তো চিনি বলে মনে হচ্ছে না।”
কিন্তু উত্তরে ছেলেটা তরবারি বাগিয়ে আবার ঝাঁপিয়ে পড়লো। টম লাফিয়ে পিছিয়ে গেলো। কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছে, হামলাকারীর চোখে বিজোয়ল্লাস দেখতে পেলো ও। সেই মুহূতে আক্ষরিক অর্থেই টমের পায়ের নিচের মাটি সরে গেলো। একটা ময়লায় বুজে যাওয়া পুকুরে হুড়মুড়য়ে পড়ে গেল ও। ছেলেটা পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে ওর নিরস্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে তাকিয়ে রইলো।
জ্যাকব ওর একটা লোকের দিকে তাকালো। “ছেলেটার সাথে থাক এখানে। ও যেনো কাজটা শেষ করতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখবি?” টমের মরণ দেখতে ওর খুবই ইচ্ছে হচ্ছে, কিন্তু ডোরিয়ান আসার আগেই ওকে টমের বাসায় যেতে হবে। ওর বৌয়ের গলায় একটা ছুরি ধরে থাকলে ডোরিয়ান কিছুই করতে পারবে না। ও ওর বৌকে কি করে সেটা দেখতে বাধ্য : করবে, তারপর সারাহের দিকে নজর দেবে।
জ্যাকব টমের দিকে ঝুঁকে বিশ্রী ভঙ্গিতে বললো, “তোর সুন্দরি বৌকে একটা দেখা দিয়ে আসি। ছেলেটা তোর সাথে হিসাব মেলাক।”
টম কোর্টনীর দিকে আবার একটা উল্লসিত দৃষ্টি দিয়ে ও বোর্ডিং হাউজের দিকে চললো। সাথের দুজন গেলো ওর সাথে। আর একজন থেকে গেলো ফ্রান্সিসকে সাহায্য করার জন্যে।
মাজা পুকুরটার ভিতর ভয়ানক আঠালো কাদা। টম নিজের পা মুক্ত করতে আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো। জীবনে ও এতো বেশি লোকের জীবন সংহার করেছে যে এটা জানাই ছিলো একদিন সৌভাগ্যের দেবতা ওকে ছেড়ে যাবে। ওর বাবাও অনেক কম বয়সে মারা গিয়েছেন, ওর দাদা-ও। কিন্তু ও এখনো বুঝতে পারছে না যে ওর এই নিষ্ঠুর শত্রুটা কে।
আর জীবন থাকতে টম জ্যাকব দ্য ভিসকে সারাহের দিকে একটা আঙুলও তুলতে দেবে না। ও কাদার ভিতর হাত ঢুকিয়ে চাপ দিয়ে নিজেকে টেনে তোলার চেষ্টা করতে লাগলো। ঠিক তখনি ওর হাতে শক্ত ধারালো কিছু একটা বাঁধলো। টম আঙুল দিয়ে টেনে জিনিসটা কাদা থেকে বের করে আনলো-একটা তিন ইঞ্চি পুরু পাইপ। এটায় করে পুকুরে পানি দেওয়া হতো একসময়।
এদিকে ফ্রান্সিস পুকুরের কাদায় ভরা পাড় বেয়ে একজন নাচিয়ের মতো ভারসাম্য রক্ষা করতে করতে নেমে এলো। তরবারি টমের তালু বরাবর তাক করে রেখেছে। টম হাঁটুতে ভর দিয়ে সোজা হয়ে হাতের পাইপটা দিয়ে আঘাতটা আটকালো। ধাতুতে ধাতুতে আঘাত করে ঝংকার উঠলো তাতে। মাত্র কয়েক ইঞ্চির জন্যে রক্ষা পেলো টমের চেহারা।
ধাক্কা দিয়ে টম ফ্রান্সিসের ভারসাম্য নাড়িয়ে দিলো। ফ্রান্সিসও পা পিছলে পড়ে গেলো কাদার ভিতর। টম নিজেকে কাদা থেকে মুক্ত করে পাইপটা উঁচিয়ে ওর আক্রমণ করতে গেলো। কিন্তু তার আগেই রয়ে যাওয়া লোকটা আখ কাটার ছুরি নিয়ে তেড়ে এলো ওর দিকে। টম সেদিকে ঘুরে মাথা নামিয়ে আঘাতটা এড়ালো। তারপর লোকটার ছুরি ধরা হাতের কবজি ধরে ফেলে লোকটার জড়তাকে ব্যবহার করে ভারসাম্য নাড়িয়ে দিলো। একই সাথে হাতটা টেনে পিঠের পিছনে নিয়ে এলো। প্রায় সাথেসাথেই লোকটার কাঁধের জোড়াটা মট করে আলাদা হয়ে গেলো। লোকটা আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়লো। টম ওর ডান হাতে ধরে থাকা লোহার পাইপটা লোকটার মাথা বরাবর সজোরে নামিয়ে আনতেই সে মুখ থুবড়ে কাদায় পড়ে গেলো।
