জ্যাকব নিজেও এই অনুভূতিটার সাথে পরিচিত। দুই বছর আগে ও। মোজাম্বিক থেকে জাহাজে করে একদল দাস নিয়ে আসছিলো। আসার পথে ওর জাহাজ চরে আটকে পড়ে। টম কোর্টনী ওদেরকে উদ্ধার করে, কিন্তু বিনিময়ে ও জোর করে সব বন্দীকে মুক্ত করে দেয়। জ্যাকবের সব টাকা জলে যায়। বিশেষ করে একটা সুন্দরি দাসীকে ওর খুব মনে ধরেছিলো। নিজের জন্যেই রাখতে চেয়েছিলো মেয়েটাকে। কিন্তু ওই কুত্তী সারাহ কোর্টনী মেয়েটাকে নিজের কাছে নিয়ে পড়াশোনা আর আচার ব্যবহার শিখিয়ে ইংল্যান্ড পাঠিয়ে দেয়, যাতে সে স্বাধীন জীবন যাপন করতে পারে।
মেয়েটার কথা মনে হতেই জ্যাকবের শরীরে উত্তেজনার ঢেউ খেলে গেলো। মেয়েটাকে যখন ধরে আনা হয়ে তখন সে সম্পূর্ণ উলঙ্গ ছিলো। উদ্ধত স্তন, মাথার চুল ওদের গোষ্ঠীর ঐতিহ্য অনুযায়ী বিশেষভাবে কাটা–জ্যাকবের কল্পনার সবটা ছিলো যেনো সে। ও মেয়েটাকে পেলে কি করতো সেকথা বহুবার ভেবেছে। আর টম কোর্টনী সরে গেলে সারাহ কোর্টনীর কি করবে সেটাও ভেবে রেখেছে অসংখ্যবার।
ওরা পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে গেলো। ওখানে মাত্র কয়েকটা ঘর, কিন্তু একটা পুরো খালি। মালিক গিয়েছে আমস্টারডামে। কয়েক মাসের ভিতরে আর ফিরবে না। জ্যাকব আর ওর লোকেরা বাগানের দেয়ালের ছায়ায় লুকিয়ে রইলো, উল্টো পাশের বোর্ডিং হাউজের দিকে লক্ষ্য রাখছে। একটু পরেই হার্পের সুরের মূর্ঘনায় ভরে গেলো চারপাশ। বাড়ির ভিতর উজ্জ্বল আলোর বাতি জ্বলছে। জানালা দিয়ে জ্যাকব দেখলো টম, ওর ভাই আর ওদের স্ত্রীরা বসার ঘরে বসে আছে। ভাইয়ের মাথায় একটা পাগড়ি, কাফিরদের (আফ্রিকান উপজাতি) মতো। জ্যাকব ভাবতে লাগলো ও যখন মুন্ডুটা আলাদা করে ফেলবে তখন কি পাগড়িটা জায়গা মতো থাকবে?
ও ফ্রান্সিসের কাঁধে টোকা দিলো। ছেলেটা এতো জোরে লাফ দিয়ে উঠলো যে মনে হলো ভয়ের চোটে কাপড় ভিজিয়ে ফেলবে। ব্যাপারটা মোটেও ভালো না, ভাবলো জ্যাকব।
“এখন আক্রমণ করবো?”
ফ্রান্সিস মাথা নাড়লো। জ্যাকব ভেবে পেলো না ছেলেটা এখন আবার মত বদলাচ্ছে নাকি। সেরকম কিছু হলে ছুরির এক কোপে ছেলেটাকে শুইয়ে দেবে। জ্যাকব এরকম অনেক জায়গা চেনে যেখানে লাশ ফেলে দিলে কেউ দেখার আগেই শিয়াল কুকুর শকুন এসে খেয়ে সাবাড় করে ফেলবে।
তবে অপেক্ষা করায় কোনো সমস্যা নেই। কিছুক্ষণ পরেই দরজা খুলে গেলো আর ডোরিয়ান কোর্টনী বেরিয়ে এলো। সাথে এক মহিলা, যাকে জ্যাকব চেনে না। চেহারা দেখে মনে হয় মেয়েটা সংকর জাতের। এখন আপাতত সারাহের সাথে সব কিছু মেটানো যাক, পরে একেও খুঁজে নেওয়া যাবে।
জ্যাকবের নিজের ভাগ্যকে বিশ্বাস হচ্ছে না। যদিও ও স্বীকার করবে না, কিন্তু এতোগুলো লোক নিয়েও একসাথে দুই কোর্টনী ভাইয়ের সাথে লড়াই করতে ওর দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো। কিন্তু এখন একজন একজন করেই লড়া যাবে।
ডোরিয়ান আর মেয়েটা দৃষ্টির আড়ালে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলো ও। তারপর ফ্রান্সিসের হাত টেনে ধরলো।
“এখন,” হিসিয়ে উঠলো ও।
কিন্তু নড়ার আগেই পুরো রাস্তাটা আলোয় ভরে গেলো। টম বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। জ্যাকব দ্রুত মাথা নিচু করে ফেললো, কিন্তু টম নিজের চিন্তায় এতোটাই ব্যস্ত ছিলো যে খেয়াল করলো না ব্যাপারটা। জ্যাকব আর একবার ভয়ে ভয়ে মাথা তুলে দেখলো যে টম কোম্পানির বাগানের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। সাথে কোনো অস্ত্র নেই।
জ্যাকব খুশিতে শব্দ করে উঠে ফ্রান্সিসের দিকে তাকালো। তুই কে জানি না ভাই, মনে মনে ভাবলো ও। কিন্তু একেবারে শয়তানের ভাগ্য নিয়ে এসেছিস।
“এটাই উনি না?” ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, চোখের মণি বড় বড় হয়ে গিয়েছে। জ্যাকব ভেবে পেলো না এর কি আসলেই টমের সাথে লড়ার সাহস আছে কিনা। যাক ব্যাপার না। তরবারি যার হাতেই থাক, টম কোর্টনী আজ রাতে মারা পড়বেই।
ওরা নিরাপদ দূরত্ব রেখে টমকে অনুসরণ করে চললো। ভাগ্য আবারও ওদের সহায়তা করলো। দেখা গেলো টম বাগানের গভীরে ঢুকে যাচ্ছে। ফলে ওদের মারামারির শব্দও কেউ শুনবে না এখন। টম হাঁটছিলো খুব দ্রুত কিন্তু একবারও পিছনে ফিরে তাকালো না।
কাছেই কোথাও হায়েনারা হেসে উঠলো। ফ্রান্সিস তরবারিটা বের করে হাতে নিলো। মরার আগ মুহূর্তে টমের চেহারাটা কেমন হবে সেটা কল্পনা করার চেষ্টা করছে। ফ্রান্সিস আজ বহুদিন ধরে দৃশ্যটা চিন্তা করে যাচ্ছে, কিন্তু এখন যখন সময় উপস্থিত, তখন ও রাগের চাইতে বরং ভয় বেশি পাচ্ছে। এর আগে কখনো ও কোনো মানুষ খুন করেনি। তরবারিটার ওজন খুব বেশি মনে হতে লাগলো ওর, পা গুলো মনে হলো নরম মোমের তৈরি।
পারতেই হবে ফ্রান্সিস, নিজেকে বললো ও। বাবার জন্যে হলেও পারতে হবে।
সাথে পাঁচ হাজার পাউন্ড পুরস্কার, স্যার নিকোলাসের কণ্ঠ শুনতে পেলো যেনো মাথার ভিতর।
জ্যাকব ওর ইতস্তত ভাবটা বুঝতে পেরে সামনে এগিয়ে গেলো, আখ কাটা ছুরিটা প্রস্তুত। ফ্রান্সিস ওকে ইশারায় পিছনে যেতে বললো। “ওকে আমি মারবো,” ফিসফিসিয়ে বললো ও।
জ্যাকব কাঁধ ঝাঁকিয়ে পিছিয়ে গেলো। ছেলেটা ওকে টাকা দিচ্ছে যেহেতু, ওকেই সুযোগটা নিতে দেওয়া যাক। শেষমেশ না পারলে জ্যাকব তো আছেই।
ফ্রান্সিস ওর হাতটা সরিয়ে নিলো। ইংল্যান্ড থেকে আসার পথে সমুদ্রে বসে বসে, ও হাজারবার এই দৃশ্যটা কল্পনা করেছে। তবে ঠিক যেরকম ভেবেছিলো ব্যাপারটা সেরকম হচ্ছে না। ভেবেছিলো ও টমের নাম ধরে ডাকতেই টম অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাবে। তারপর ফ্রান্সিস নিজের পরিচয় আর টমকে কেনো মারতে চায় সেটা জানাতেই সেই অবাক দৃষ্টি আতংকে রূপ নেবে। টম শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারবে যে পাপ বাপকেও ছাড়ে না। এরপর হাঁটু ভেঙ্গে বসে নিজের জীবন ভিক্ষা চাবে, কিন্তু ফ্রান্সিস কোনো ক্ষমা করবে না।
