“এটা আপনি পাবেন, কিন্তু আগে আমাকে নিয়ে যেতে হবে।”
মহিলাকে হতাশ দেখালো। “বেশ দ্রুত সব শিখে নাও দেখছি। সাথে আর একটা মুদ্রা দিলে আমি এমন জিনিস শিখিয়ে দিতে পারি যা জীবনেও ভুলবে না।”
“আমাকে ওনার কাছে নিয়ে যান,” ফ্রান্সিস প্রসঙ্গ পাল্টালো।
“যেতে হবে না, আমি এখান থেকেই ওনাকে দেখতে পাচ্ছি।”
বলে মহিলা সরাইয়ের জানালা দিয়ে ইশারা করলো। জানালাটা বাতির কালি আর সমুদ্রের লবণে ভরে আছে। পেছনে বন্দরের সম্মুখভাগটা আর ওটার কাঠের জেটিটা দেখা যাচ্ছে। প্রফেটের নৌকাগুলো ওটার পাশেই বাধা, একদল কৃষ্ণাঙ্গ কুলি ওগুলো থেকে মাল নামাচ্ছে। এই হট্টগোলের মাঝে তিনজন লোককে দেখা গেলো দাঁড়িয়ে আলাপ করছে আর একগাদা মাল পরীক্ষা করে দেখছে। ফ্রান্সিস দুজনকে চিনতে পারলো, একজন প্রফেটের ক্যাপ্টেন আর একজন জাহাজঘাটার কেরানী। তৃতীয় লোকটা সবচেয়ে লম্বা, কমপক্ষে ছয় ফুটের উপরে লম্বা, কাঁধ ওনার পাশের কুলিগুলোর মতোই চওড়া। ঘন কালো চুল নাবিকদের মতো বেণী করে রেখেছেন। হাসিমুখেই কথা বলছিলো লোকটা, কিন্তু ভাবেই বোঝা যাচ্ছিলো যে এই লোক কারো কাছে মাথা নোয়ায় না।
“লম্বা লোকটাই হচ্ছে টম কোর্টনী,” মেয়েটা বললো। কণ্ঠে প্রশংসার ছোঁয়া।
ফ্রান্সিসের মনে হতে লাগলো যেনো ওর রক্ত জমে গিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে টম কোর্টনী ওর জন্যে ছিলো রূপকথার এক দৈত্যের মতো, যে কিনা বার বার ওর দুঃস্বপ্ন হয়ে হানা দিতো। আর এখন সে ওর থেকে মাত্র কয়েক গজ সামনে দাঁড়িয়ে আছে, অন্য লোকদের সাথে হাসাহাসি করছে। ওর জন্য কি করুণ পরিণতি অপেক্ষা করছে সে ব্যাপারে কোনো ধারণাই নেই।
বেশ্যা মহিলাটা ফ্রান্সিসের চেহারার অভিব্যক্তি পড়তে পারলো।
“তুমি ওনাকে ঘৃণা করো,” মজা পেয়েছে এমন ভঙ্গিতে বললো মহিলা।
“তুমি ওনাকে খুন করতে চাও, তাই না?” আবার বললো সে। ফ্রান্সিস প্রতিবাদের চেষ্টা করতেই বললো, “তর্ক করে লাভ নেই। তোমার চোখে যে দৃষ্টি দেখলাম সেটা আমি আগেও অনেকবার দেখেছি। অবশ্য বেশিরভাগ সময়েই লোকগুলো ছিলো পাড় মাতাল।”
ফ্রান্সিস টমের উপর থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পারছিলো না। “যদি চাই তো কি সমস্যা?”
“টম কোর্টনী কিন্তু কোনো ফালতু মাতাল নাবিক না। এখানকার সবচেয়ে বিপজ্জনক লোক সে। তার সম্পর্কে নানান গল্প শোনা যায়,..” বলতে বলতে মাথা নাড়লো মহিলা।
ফ্রান্সিসের সৎ বাবা ওর জন্যে খুব বেশি কিছু করেননি কিন্তু ফ্রান্সিস যেনো তরবারি দিয়ে আর খালি হাতে লড়াইটা ভালোমতো শেখে, সে ব্যাপারটা নিশ্চিত করেছিলেন। একাধিকবার স্যার ওয়াল্টারের দেনার কারণে ফ্রান্সিসকে ভোর বেলায় ওনার পক্ষে ডুয়েলে নামতে হয়েছে। তাই ফ্রান্সিস ভালোভাবেই জানে নিজেকে কিভাবে রক্ষা করতে হয়। স্যার ওয়াল্টার ছিলেন একেবারে জাঁদরেল প্রশিক্ষক। ফ্রান্সিসের মুঠি দিয়ে রক্ত বের হওয়ার আগ পর্যন্ত উনি ওকে এক বিন্দু ছাড় দিতেন না। অনেক সময় এমন হতো যে ব্যথায় ও তরবারিটাও মুঠি করে ধরতে পারতো না।
একদিন এটাই তোমার জীবন বাঁচাবে, উনি প্রায়ই বলতেন কথাটা।
“আমি নিজেকে রক্ষা করতে জানি,” ফ্রান্সিস মহিলাটাকে আশ্বস্ত করলো।
“সেতো তুমি পারবেই সোনা,” কটাক্ষ হেনে বললো মহিলা। “কিন্তু এই ঝুঁকি নেওয়ার দরকার কি? তোমার তো তরবারিও নেই। কেপ টাউনে তুমিই টম কোর্টনীর একমাত্র শত্রু না। আমি এরকম অনেককেই চিনি যারা তোমাকে খুশি মনেই সাহায্য করবে।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফ্রান্সিস জানালা থেকে রিয়ে মেয়েটার দিকে আবার তাকালো। “কি বলতে চাচ্ছেন?”
“আর একটা ড্রিঙ্ক কিনে দাও, তাহলে বলছি।”
*
অন্ধকার নেমে আসতেই ফ্রান্সিস পাহাড় বেয়ে উঠে এলো। কোমরে গোজা তরবারিটা উরুতে বাড়ি খাচ্ছে। হাতটা ধরে ওটাকে সোজা রাখতে হচ্ছে। তরবারিটার অস্তিত্ব অনুভব করতে পেরে স্বস্তি পাচ্ছে ফ্রান্সিস। টম কোর্টনীকে কিভাবে খুন করবে সেটাও ঠিক করে রেখেছে; মাস্কেট বা পিস্তলের গুলিতে অজ্ঞাত ভাবে ও খুন করবে না। একেবারে হৃৎপিণ্ডে তরবারি গেঁথে কাজটা সারবে ও। ঠিক যেভাবে টম উইলিয়ামকে মেরেছে।
ফ্রান্সিস নার্ভাস ভঙ্গিতে ওর চারপাশের লোকজনের দিকে তাকালো একবার। অন্ধকারের পটভূমিতে অশরীরী কালো একেকটা অবয়বের মতো লাগছে সবাইকে। অবশ্য চাঁদের আলোয় চামড়া চকচক করে উঠছে। সবার হাতে লম্বা, সোজা ফলার ছুরি। হাতলে আঙুল ভরে ঘোরাচ্ছে।
ফ্রান্সিসের পিছনে আসছে জ্যাকব দ্য ড্রিস। লম্বা পা ফেলে ও পাহাড় বেয়ে উঠছে আর রাস্তার দুধারের ঝোঁপ জঙ্গল তরবারির আঘাতে কেটে দিচ্ছে। ছুরিগুলোর ফলা খুবই ভারি, অনেকটা তরবারির মতো। এগুলো বানানো হয়েছিলো বার্বাডোজের আখের ক্ষেতে ব্যবহারের জন্যে। কোনো এক ব্যবসায়ী হয়তো সেগুলো কেপ টাউনে নিয়ে এসেছে। জ্যাকব এখন সেটার নতুন একটা ব্যবহার খুঁজে পেয়েছে।
পিছন থেকে জ্যাকব-ও ফ্রান্সিসকে জরিপ করলো। একদম নবীশ এই ইংরেজ ছেলেটাকে নিয়ে বেশ কৌতূহল অনুভব করছে ও। যখন বেশ্যা মহিলাটা ওদের পরিচয় করিয়ে দেয় তখন ও ভেবেছিলো যে এটা হয়তো একটা ফাঁদ। ছেলেটা একেবারে তালপাতার সেপাই, সদ্য গজানো দাড়ি এখনো পুরো গাল জুড়ে ছড়ায়নি। দেখা মনে হয় কড়া কোনো পানীয় পেটে পড়লেই অজ্ঞান হয়ে যাবে। তবে জ্যাকব ছেলেটাকে তরবারির ব্যবস্থা করে দেওয়ার আগে পরখ করে দেখেছে। অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, ছেলেটা খুবই ভালো একজন অসিযোদ্ধা। দ্রুত নাড়াচাড়া করতে পারে, সবসময় সতর্ক, আর মাত্র কয়েকটা প্যাঁচ কষেই জ্যাকবের মতো দক্ষ লোককেও অবাক করে দিয়েছে। আর টম কোর্টনীর কথা উঠলেই ছেলেটার চোখে যে আগুন দেখা যায়, সেটা ভুয়া হতে পারে না।
