প্রথমে বন্দরের মাস্টারের অফিসে গিয়ে ওর আগমন রেজিস্টার করে নিলো।
“নাম? “ কলম থেকে কালি ঝরাতে ঝরাতে জিজ্ঞেস করলো কেরানি।
ফ্রান্সিস কোটের পকেট থেকে একগাদা ভুয়া কাগজপত্র বের করলো। চিল্ডস ওকে এগুলো দিয়েছেন। “আমার নাম ফ্রাংক লেইটন।”
ওখান থেকে বেরিয়ে ও সৈকত ধরে হেঁটে দুর্গে গিয়ে পৌঁছালো। শহর থেকে মাস্কেটের গুলি ছুড়লে যতোদূর যাবে, দুৰ্গটা ততোদূর অবস্থিত। এই বন্দর আর এর আশেপাশের এলাকাটা নিয়ন্ত্রিত হয় এখান থেকে। ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ এটার দিকে তাকিয়ে রইলো। মনে মনে কল্পনা করার চেষ্টা করছে যে ওর দাদার দাদা এই গরমে এখানে কাজ করছে। হাই উইন্ডে বড় হওয়ায় ফ্রান্সিসের চারপাশেই ওর পূর্বপুরুষদের নানান স্মৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। ওদের গির্জার সমাধিকক্ষে অনেকের আবক্ষ মূর্তি আছে। তাদের পাওয়া নানা পদক বা ভূষণগুলোও কাঁচের বক্সে রাখা ছিলো, দেয়াল জুড়ে ছিলো পোর্ট্রেট। একে একে সেসব পোর্ট্রেট গায়েব হয়ে যায়। ওর মনে আছে প্রথমবার যখন ও ওদের লম্বা গ্যালারিতে একটা জায়গায় ফাঁকা দেখেছিলো তখন কেমন লেগেছিলো। স্যার ওয়াল্টারের দেনা শোধ করতে প্রতিবার যখন একটা করে ছবি বিক্রি হয়ে যেতো তখনকার কষ্ট ফ্রান্সিস বলে বোঝাতে পারবে না।
কিন্তু আজ ও এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। এখানে দাঁড়ানো অবস্থায় ওর দাদার দাদার একটা ছবি ফ্রান্সিস দেখেছিলো। ওনার চেহারা ছিলো কঠোর, ঘাড় পর্যন্ত নেমে আসা কেশরের মতো কালো চুল। ওর মায়ের কাছে। শুনেছে ওর দাদা হাল-এরও নাকি ওরকম চুল ছিলো। ও মনে মনে কল্পনা করলো ওনারা বেঁচে থাকলে আজ কেমন হতেন। ক্যানভাসের রঙ তুলির না, রক্ত মাংসের জ্যান্ত মানুষ হিসেবে তারা কেমন হতেন।
ওর কেমন অদ্ভুত লাগতে লাগলো। যেনো চারপাশে নিজের পুরুষদের উপস্থিতি অনুভব করতে পারছে। গ্যালারির সবগুলো ছবি যেনো জ্যান্ত হয়ে, ছবির ফ্রেম থেকে বেরিয়ে ওর পাশে এসে জড়ো হয়েছে। আর কোর্টনী নামটার সব ওজন আর তাদের প্রত্যাশার পুরো চাপটা ওর কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছে।
ও যদি টম চাচাকে খুন করে, তাহলে কি ও ঐ খুনীটার চাইতে আলাদা কিছু হতে পারবে?
“আমার বাবার খুনের বদলা এটা,” নিজেকে প্রবোধ দিলো ফ্রান্সিস। স্যার নিকোলাসের প্রতিশ্রুতিমতো পাঁচ হাজার পাউন্ডের পুরস্কারের কথাটা মাথা থেকে জোর করে সরিয়ে দিলো। সামান্য টাকা পয়সার জন্যে এরকম একটা ঘৃণ্য কাজ করতে বাধছে ওর।
ফ্রান্সিস টের পেলো দুর্গের দরজায় দাঁড়ানো প্রহরী ওর দিকে আগ্রহ নিয়ে খেয়াল করছে। ও ঘুরে দ্রুত পানির কাছে চলে এলো আবার। তারপর একটা সরাইতে ঢুকে পানীয়ের অর্ডার দিলো। এই সাত সকালে পুরো সরাই খালি, কিন্তু ওর কিছু পান করা দরকার।
বিয়ারটার রঙ টকটকে লাল। পানি ছাড়া, একদম কড়া। ফ্রান্সিস এক চুমুক দিতেই মনে পড়লো প্রায় দিনই সকালে ও ঘুম ভেঙ্গে নিচে এসেই দেখতো ওর সৎ বাবা অর্ধেক বোতল শেষ করে ফেলেছেন।
একজন মহিলা এসে ওর পাশের টুলে বসলো। মহিলার ঠোঁট লাল, মুখে পুরু পাউডার দিয়ে চেহারার বলিরেখাগুলো ঢেকে রেখেছে।
“ফুর্তি টুর্তি কিছু করার চিন্তা করছো নাকি?” নিজের ব্লাউজের ফিতে নিয়ে খেলতে খেলতে বললো মেয়েটা। “যা চাও তা-ই পাবে আমার কাছে।”
মেয়েটা কি প্রস্তাব করছে সেটা বুঝতে পেরে ফ্রান্সিস লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। কয়েক মুহূর্ত কথা-ই বলতে পারলো না। ওর পুরো জীবনটাই কেটেছে হাই উইন্ডে। বাইরে গিয়েছে খুব কম, ফলে এরকম কোনো মহিলার সাথে কখনোই দেখা হয়নি আগে। এমনি অন্যান্য ছেলেদের কাছে এদের ব্যাপারে ফিসফিসানি শুনেছে, এর বেশি কিছু না।
“আমি টমাস কোর্টনীকে খুঁজছি,” কোনোমতে বললো ও। মেয়েটার দৃষ্টিতেই ফুটে উঠলো যে ও টমকে চেনে। তা দেখে ফ্রান্সিস আবার বললো, “আপনি চেনেন ওনাকে?”
ফ্রান্সিস টেবিলে একটা রূপার মুদ্রা রাখলো। মেয়েটা সাথে সাথে তুলে নিলো সেটা। তারপর নিজের কাপড়ে একবার মুছে কাচুলির ভিতর থেকে ছোট একটা ব্যাগ বের করে তার ভিতর রেখে দিলো।
ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বললো, “তারপর?”
“একটা ড্রিঙ্ক কিনে দেবে না?” ছলনাময়ী কণ্ঠে বললো মেয়েটা। “একজন ভদ্রলোক সবসময়েই একজন ভদ্রমহিলাকে ড্রিঙ্ক কিনে দেয়।”
ফ্রান্সিস আবার লজ্জায় লাল হয়ে বারমেইডকে ডাকলো। লোকটা চুপচাপই আর এক গ্লাস বিয়ার নিয়ে এলো কিন্তু গ্লাসটা রাখার সময় ফ্রান্সিসের দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকালো।
“প্রথমবার নাকি?” নিজের বিয়ারে লম্বা একটা চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলো বেশ্যাটা। “তোমার মতো একজন তাগড়া জোয়ান? বিশ্বাস হয় না।”
“আমি টমাস কোর্টনীকে খুঁজছি,” ফ্রান্সিস আবার বললো।
“আমি তোমার জন্যে যা করতে পারবো, সে কিন্তু সেসব পারবে না।” বলে মহিলাটা টেবিলের নিচে পা দিয়ে ফ্রান্সিসের পা ঘষতে শুরু করলো। ফ্রান্সিস ত্রস্ত ভঙ্গিতে সেটা সরিয়ে নিলো।
ফ্রান্সিসের অস্বস্তি দেখে খুব আমোদ পেলো মহিলা। “ব্যাগে এরকম আর রুপার মুদ্রা আছে নাকি? ওরকম আর একটা দিলে শুধু বলবো না, তোমাকে একেবারে দেখিয়ে দেবো টম কে?”।
ফ্রান্সিস বুঝলো যে একে আগেভাগেই টাকা দেওয়াটা বোকামি হয়েছে। ও আর একটা মুদ্রা বের করলো কিন্তু সেটাকে এগিয়ে না দিয়ে নিজের আঙুল দিয়ে চেপে ধরে রাখলো।
