“আমাদেরকে কিন্তু দস্যুদের মোকাবেলা করতে হবে,” টম বললো।
“আপনারা দস্যুদের সাথে কিভাবে লড়েন সেটা আমি দেখেছি। আর শুধু ভারত কেন?” অ্যানা ডোরিয়ানের দিকে ফিরলো। “আপনার পালক বাবা না ওমানের খলিফা বললেন? লামু, মাস্কাট, মোকা বা গন এর মতো আরব বন্দরেও নিশ্চয়ই এরকম অনেক লোক আছে যারা আপনাকে বিশ্বাস করে। আপনি ওদের ভাষাতেই কথা বলেন, ওদের ঈশ্বরের কাছেই প্রার্থনা করেন।”
“আগের খলিফা ছিলেন আমার পালব বাবা। বর্তমান খলিফা আমার পালক ভাই। তবে সে আমাকে ঠিক ততোটা ঘৃণা করে, যতোটা ঘৃণা গাই টমকে করে। নিজের লাল দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বললো ডোরিয়ান। “তবে… পরিচিত অনেকেই আছে এখনো।”
“যদি শুধু ঠিকঠাক একবার কাজটা করা যায়, তাহলে পুরো সাগর বাণিজ্যের মালিক হয়ে যাবেন আপনারা।”
প্রস্তাবটা নিয়ে সবাই ভাবনা চিন্তা করত লাগলো।
“আমরা ভেবে দেখবো,” টম বললো। “আমি কাল তোমাকে আমাদের সিদ্ধান্ত জানবো।”
*
ডোরিয়ান অ্যানাকে ওর থাকার বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেলো। বোর্ডিং হাউজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওদেরকে চলে যেতে দেখলো টম। খাওয়া শেষে ও একেবারে গলা পর্যন্ত পান করেছে, তবে মাথা এখনো পরিষ্কার। ভালোভাবে চিন্তা করার জন্যে শুধু এখন একটু খোলা হাওয়া দরকার।
“আমি একটু বাগানে হাঁটতে যাচ্ছি,” সারাহকে বললো টম।
“তরবারি নিয়ে যাও। নইলে সিংহ ধরে খাবে?”
“লাগবে না,” জবাব দিলো টম। “আমি দাঁত দিয়েই সিংহ মারতে পারি, জানো না?”
বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো টম। ভাবনায় মগ্ন থাকায় রাস্তার উল্টো দিকের কটেজটার ছায়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অবয়বটাকে খেয়াল করলো না। উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটতে শুরু করলো ও। আপনমনে স্প্যানিশ লেডি’ গানটার শিষ বাজাচ্ছে। অল্প পরেই voC-র কাছের গেটটায় পৌঁছে গেলো। গেটটা নানান কারুকার্যে সজ্জিত। বাগানের বাকি তিনদিকে কোনো দেয়াল নেই। তবে বন্য প্রাণীর আনাগোনা থেকে বাঁচতে পরিখা কাটা। ওদিক দিয়েই ডেভিল’স পিক-এর একটা ঢাল এসে মিলেছে। সারাহের সিংহের ব্যাপারে সতর্কবার্তাটা আসলে পুরোপুরি কৌতুক না।
VOC বাগানটা বানিয়েছে কেপ টাউনের স্থানীয়দের বিনোদনের জন্যে। প্রথম যখন ওরা এখানে ঘাটি গাড়ে তখন বাগানটার পিছনে প্রচুর খরচ করেছে, কিন্তু এখন আর এটার বিশেষ যত্ন নেয় না। টম যত ভিতরে যেতে লাগলো ততোই দেখলো বাগানের বেহাল দশা বেড়েই চলেছে। বিশাল বিশাল মাচাগুলো আগাছা দিয়ে ভরা। ওগুলোর জন্যে চাঁদের আলোও বাগানে প্রবেশ করতে পারে না। কয়েকটা মাচা ভেঙে রাস্তায় পড়ে আছে। পুকুরগুলো ময়লা জমে জমে ডোবায় পরিণত হয়েছে। এখানে সেখানে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় কয়েকটা মাত্র ফুলের গাছ টিকে আছে।
টম অবশ্য এসব কিছু খেয়াল করলো না। অ্যানার প্রস্তাবটা নিয়ে ওর মনের মধ্যে ঝড় চলছে। বিশ বছর আগে হলে ও এতো ভাবতো না, ঘরে বসেই রাজি হয়ে যেতো। কিন্তু এখন বয়স বেড়েছে, এখন ও জানে যে কিছুতে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে কিছুক্ষণ থেমে নিলে ভালো হয়।
আবার মনে হচ্ছে কেননা প্রস্তাবটা নেবে না? কোর্টনীরা সবসময়েই এরকম অস্থির একটা পরিবার; ওদের স্বভাব-ই হচ্ছে নতুন নতুন দেশ, নতুন নতুন অভিযানে নেমে পড়া। আমরা বহুদিন ধরে একই জায়গায় লাঙ্গল ঠেলে চলেছি। মনে মনে ভাবলো টম। এই সুযোগটাই তো আমি খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। এখন কেনো নেবো না?
সামনেই রাতের আধারে ও হায়েনার হাসি শুনতে পেলো। কলোনির ভাগাড়ে মৃতদেহ নিয়ে টানাটানি করছে বোধহয়।
গাই এর জন্যে, ওর মনের সতর্ক অংশটা উত্তরটা দিলো। কারণ যদি তুমি এটা করো, তুমি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লেজে পাড়া দেবে, আর একসময় না একসময় গাই এর কানে ব্যাপারটা পৌঁছাবেই। শেষ যে দুবার তোমাদের দেখা হয়েছিলো, দুবারই ও তোমাকে খুন করার চেষ্টা করেছিলো। তার মানে আর একবার যদি দেখা হয়, তাহলে দুজনের একজন অবশ্যই মারা পড়বে।
পিছনের রাস্তায় নুড়ি মাড়ানোর শব্দ হলো। টম ঘুরে গেলো সেদিকে। ওর পিছনে একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। মাচার ছায়ার কারণে চেহারা বোঝা যাচ্ছে না, তবে তার ফাঁক দিয়ে যে আলো আসছে তা দিয়ে হাতের খোলা তরবারিটা দেখতে কোনো কষ্ট হলো না। টম নিরস্ত্র।
“আপনি কি টম কোর্টনী,” ইংরেজ টানে জিজ্ঞেস করলো একজন।
“হ্যাঁ, আমিই সে।” লোকটা কথা বলতে শুরু করায় কিছুটা স্বস্তি পেলো টম। তারপর এক পা সামনে বাড়লো কিন্তু লোকটা তরবারি হাতে ঝাঁপিয়ে পড়লো ওর উপর।
*
কেপ টাউন বন্দরে দ্য প্রফেট যেদিন এসে ভিড়লো, তার পরের দিনই ফ্রান্সিস কোর্টনী একটা ডিঙ্গি নৌকায় করে ডাঙ্গায় চলে এলো। এর আগেই ও জাহাজের কিনারে দাঁড়িয়ে উপসাগরকে বেষ্টন করে রাখা পর্বত চূড়া, সমুদ্রের ঢেউ, আর এই বিশাল মহাদেশটার একদম পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঘরগুলো ভালো মতো দেখে নিয়েছে। ছোট বেলায় ওর অভ্যাস ছিলো লাইব্রেরিতে থাকা বিভিন্ন ম্যাপ বের করে বিভিন্ন এলাকার অদ্ভুত সব নাম খুঁজে খুঁজে বের করা। স্কুলের খাতায় ও প্রায়ই নিজের কল্পনা থেকে সব মানচিত্র আঁকতো আর সেসব জায়গা আবিষ্কারের অভিযানে বেরিয়ে পড়তো। আর এতোদিন পর অবশেষে বাস্তবেই ও সেই কাজে বের হয়ে পড়েছে।
