“ব্যবসার জন্যে খারাপ,” ডোরিয়ান মন্তব্য করলো।
টম কিছু বললো না তবে অ্যানা ইতস্তত করতে লাগলো। যেনো এরপরে কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না।
“প্রস্তাবটা দেওয়ার আগে মনে হয় আমার আসলে নিজের আর আমার পরিবার সম্পর্কে একটু বলে নেওয়া উচিত। আমার বাবা ছিলেন এক পর্তুগীজ ব্যবসায়ী। উনি ভারতে গোয়াতেই বসত গাড়েন। আমার মা ছিলেন ভারতীয়। স্থানীয় মানসবদারের মেয়ে। দুই পরিবারের কেউই বিয়েটা মেনে নেননি, তাই তারা মাদ্রাজের সেন্ট জর্জ দুর্গে পালিয়ে যান। ওটা ছিলো ব্রিটিশদের অধীনে। কপর্দকহীন অবস্থায় শুরু করলেও কঠোর পরিশ্রমের জোরে ধীরে ধীরে তারা কাপড়ের ব্যবসায় প্রচুর উন্নতি করেন। মাদ্রাজের তাঁতিদের কাছে থেকে সুতি কাপড় কিনতেন তারা, তারপর সেগুলো ইউরোপে রপ্তানি করতেন। প্রথম প্রথম অবশ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে-ই বিক্রি করতেন, কিন্তু কোম্পানি বরাবরই প্রচণ্ড লোভী; ওরা আমাদেরকে দামে কম দিতো। বাবা তাই বিকল্প রাস্তা খুঁজে বের করেন। উনি এক ড্যানিশ জাহাজের ক্যাপ্টেনের সাথে যোগাযোগ করে আমাদের মালগুলো বয়ে নেওয়ার জন্যে অনুরোধ করেন।
“ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রেসিডেন্ট গাই কোর্টনীর কানে পৌঁছে যায় ব্যাপারটা। যেসব ব্যবসায়ীরা কোম্পানির একচেটিয়া ব্যবসার জন্যে হুমকি হয়ে দাঁড়ায় তাদেরকে ওরা কি বলে জানেন? ইন্টারলোপার।” থুতু ছিটানোর মতো করে কথাটা বললো অ্যানা। “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকজন মনে করে যে এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আসলে ওদের সাজানো বাগানে ঢুকে পড়া সাপ বাদে আর কিছু না। তাই প্রেসিডেন্ট জলদস্যুদের জানিয়ে দেন যে আমাদের জাহাজ কোথা থেকে ছাড়বে। কেপ কর্মোরিনের কাছে ওরা আমাদেরকে আক্রমণ করে বসে। একটা লোকও বেঁচে ফিরতে পারেনি।
“আমার বাবা তার সব পুঁজি ঐ অভিযানটায় খাঁটিয়েছিলেন। এতো বড় ঝুঁকি জানার পরেও। যদি ব্যাপারটা কোনো দুর্ঘটনা হতো তাহলে বাবা এই ধাক্কা সামলাতে পারতেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট কোর্টনী শুধু ঐটুকু করেই ক্ষান্ত দেননি। উনি আমাদেরকে ওনার বাড়িতে ডেকে নিয়ে মুখের সামনে ঘোষণা দিয়ে জানান যে উনি কি কি করেছেন। এটা নাকি আমাদের আর বাকিদের প্রতি একটা সতর্কবার্তা। আমাদের কিছুই করার ছিলো না, ন্যায় বিচার পাবো সেই আশাও ছিলো না। প্রেসিডেন্টই ওখানে আইন।
“বাবা এর কয়েক মাস পরেই মারা যান। প্রচণ্ড ভেঙ্গে পড়েছিলেন উনি।” বলতে বলতে কেঁপে গেলো অ্যানার কণ্ঠ। সারাহ ওর কাধ চেপে ধরলো। “এরপর থেকে আমিই ব্যবসা দেখাশোনা করি। সেজন্যেই ডাওজারে উঠেছিলাম। ক্যাপ্টেন আমার মালগুলো বহনের জন্যে অনেক বেশি ভাড়া হেকেছিলেন। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম যে একটা ইন্ডিয়াম্যান-এ চাপলে যাত্রাটা নিরাপদ হবে।”
“এই দস্যুদেরকেও কি তোমার কথা আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিলো নাকি?”
“না, ওটা ছিলো দুর্ভাগ্য।”
অ্যানা নিজের হাতের আঙুলগুলো একটা আর একটার ভিতরে ভরলো। “আমার কথা হচ্ছে, আমিও আপনাদের মতোই ব্যবসায়ী। আমি আমার মালগুলো সবচে কম খরচে বাজারে আনতে চাই, যাতে সবচেয়ে ভালো দামে বেচতে পারি। মাদ্রাজ থেকে কেপ টাউনে নিরাপদে মাল আনতে গেলে ব্রিটিশদের চাঁদা দেওয়া লাগে, ডাচদের চাঁদা দেওয়া লাগে, দস্যুদের চাঁদা দেওয়া লাগে, মুঘল সম্রাটদের চাঁদা দেওয়া লাগে। এরপরও জাহাজটা নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাবে সেই নিশ্চয়তা নেই। কামান দাগার জন্যে আমাকেই লোক রাখতে হয়, আবার সুরক্ষা তহবিলেও চাঁদা দিতে হয়… এতো খরচের পরে আর সেটা আর সম্ভব হয় না।”
“তুমি চাও আমি তোমার মাল বহন করি?”
“এটা শুধু আমার জন্যে না। ভারত মহাসাগর দস্যুতে গিজগিজ করছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলো, মানে শুধু ইংলিশ আর ডাচদের জাহাজের ক্ষমতা আছে ওদেরকে আটকানোর। কিন্তু এর জন্যে কোম্পানিগুলো ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা টাকা নেয়। তবে কথা হচ্ছে, লন্ডনে, আমস্টারডামে বা অস্টেন্ডে বা এরকম আরো ডজনখানেক শহরে আরো অনেক সওদাগর, দালাল আর ব্যবসায়ী আছে যারা আরো সহজ শর্তে এসব ব্যবসায়ে অর্থ লগ্নি করতে রাজি, শুধু যদি তারা এই জাহাজের নিরাপত্তার ব্যপারে নিশ্চয়তা পেতো তাহলেই হয়।
“ইংল্যান্ড থেকে ভারত পর্যন্ত সরাসরি মাল পরিবহনের ব্যবসাটায় আসলে একচেটিয়া রাজত্ব চলছে। ভারতীয় মহাসাগরের বন্দরগুলোয় ব্যবসা পুরোপুরি উন্মুক্ত। যাত্রাটাকে যদি তাই দুই ভাগে ভাগ করা যায়, মানে মালগুলোকে যদি কেপ টাউনে একবার খালাস করা যায়, তাহলে আর এই একচেটিয়া কারবারটা থাকে না। এভাবেই আমি ক্যাপ্টেন ইঞ্চবার্ডকে আমার মাল নিতে রাজি করিয়েছিলাম। আপনি যদি ভারত সাগরের এই ঝুঁকিটা নিতে রাজি হন, তাহলে ইউরোপের ব্যবসায়ীরা আপনাকে ভালো পরিমাণ টাকা দেবে। আবার ভারতের ব্যবসায়ীরাও আপনার কাছে ভালো জিনিস বিক্রি করবে, কারণ আপনি কোম্পানির চাইতে বেশি টাকা দেবেন। কিন্তু এরপরেও লাভ ভালোই থাকবে।”
“VOC, মানে দ্য ডাচ ইস্ট ইন্ডীয়া কোম্পানি কেপ টাউনের সমস্ত ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে।”
“আর ওদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংরেজদের ব্যবসাকে দুর্বল করে এরকম যে কোনো উদ্যোগকে ওরা স্বাগতম জানাবে।”
