“খবরটা পেলে গাই মোটেও খুশি হতো না। সত্যি কথা হচ্ছে আমরা মারা যাওয়াতেই বরং ও বেশি খুশি।”
অ্যানা নিজের গ্লাসে চুমুক দিলো। যেনো কথাটা খুবই স্বাভাবিক। “থাক, আপনাদের মাঝে কি হয়েছিলো সেটা জানতে চাই না।” অনুচ্চ স্বরে বললো ও।
“মেয়ে সংক্রান্ত ব্যাপার, ডোরিয়ান সরাসরি বলে দিলো।
“আর মেয়েটা হচ্ছে আমার বোন, প্রথমবারের মতো কথা বললো সারাহ। “ডোরিয়ান যেবার দস্যুদের হাতে ধরা পড়ে, সেই জাহাজে আমরাও ছিলাম। আমি তখনও ছোট কিন্তু আমার বড় বোন ক্যারোলিন ছিলো পূর্ণ যুবতী। বোকা মেয়ে; ও আসলে নিজের সৌন্দর্য দেখিয়ে বেড়াতে পছন্দ করতো। বলা যায় একেবার স্বেচ্ছায় ও টমের সাথে শোয়।”
“পাউডার ম্যাগাজিন রাখার জায়গাটায়, তাই না?” শয়তানি হাসি হেসে বললো ডোরিয়ান। “জাহাজে শুধুমাত্র ওখানেই একটু নিরিবিলি ছিলো।”
“ভুলটা আসলে ছিলো আমার,” টম বললো। অ্যানার সামনে এরকম একটা ঘটনা ফাস হয়ে যাওয়ায় বিব্রত। “আমার আসলে বোঝা উচিত ছিলো যে গাই ওকে ভালোবাসে।”
“গাই মোটেও ক্যারোলিনকে ভালোবাসতো না,” সারাহ বললো। “গাই ওকে শুধু নিজের কর্তৃত্বে রাখতে চাইতো। ঠিক যেভাবে মানুষ নিজের গাড়ি ঘোড়া বা এক ব্যাগ স্বর্ণকে অধিকারে রাখে। বিয়ে করার পর থেকেই গাই আর ক্যারোলিনকে কোন দাম দিতো না। তুমি ভুলে গিয়েছে যে ওদের বিয়ের পর আমি অনেকদিন ওদের বাসায় থেকেছি। গাই ওর সাথে কেমন ব্যবহার করে সেটা আমার নিজের চোখে দেখা।” বলতে বলতে চোখ বন্ধ করে ফেললো সারাহ। “ও মোটেও ক্যারোলিনকে ভালোবাসতো না, খোদা সাক্ষী।”
“আর উনিতো ক্যারোলিনকে বিয়ে করেই ফেলেছেন, তবুও আপনার সাথে ঝামেলা মেটেনি?” অ্যানা টমকে জিজ্ঞেস করলো।
“আসলে আরো কিছু ব্যাপার ছিলো। মানে…” টম আর বলতে পারলো না। কিছু কিছু ব্যাপার আসলে অ্যানার সাথে আলাপ করা সম্ভব না।
কি করেছি আমি? নিজেকে জিজ্ঞেস করলো টম। এক ভাইকে খুন করেছি, আর একজনও আমার মরণ চায়। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দুটো ভুল, আর সেগুলো শোধরানোরও আর কোনো উপায় নেই।
আবার ওর আগের রাতে দেখে সবুজ ঝলকটার কথা মনে হলো। খোদা আমাকে জ্ঞান দাও।
অ্যানা বিজ্ঞের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো। “প্রতিটা পরিবারেই কিছু গোপনীয় ব্যাপার থাকে।”
“তবে তুমি কিন্তু খুবই সাহসী,” অ্যানাকে বললো সারাহ। প্রসঙ্গ পাল্টে পরিবেশ হালকা করতে চাচ্ছে। এই দুজন দাগী আসামীর সাথে বসে খাবার খাচ্ছো!”
“আপনারা আমার জীবন বাঁচিয়েছেন, আপনারা সবাই!” টেবিলের সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো অ্যানা। “আপনাদের কিন্তু কোনো দরকার ছিলো না। আপনারা চাইলেই আমাদেরকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে পারতেন। একশো জনে নিরানব্বই জন লোকই সেই কাজটাই করতো।”
“কারণ একশো জনের মধ্যে নিরানব্বই জনেরই সারাহ বা ইয়াসমিনির মতো কেউ নেই যারা তাদেরকে বলে দেবে যে কোন কাজটা অবশ্যই করতে হবে,” হেসে বললো ডোরিয়ান। “আমরা কিন্তু যেতে চাইনি!”
আলাপ চলতে থাকলো। রাতের খাবারের পরে সবাই বসার ঘরে গিয়ে বসলো। সারাহ সবাইকে উইলিয়াম বাবেল-এর বুক অফ লেডিজ এন্টারটেইনমেন্ট-এর একটা অংশ হার্প-এ বাজিয়ে শোনালো। টম সেই ইংল্যান্ড থেকে এটা অর্ডার দিয়ে আনিয়েছে।
“আমার আগের হাপটা টম নদীতে ফেলে দিয়েছে, বাজানোর ফাঁকে অ্যানাকে জানালো সারাহ।
“পুরো কথাটা তো বলল না। আমাদের জাহাজ যে একটা চরে আটকা পড়েছিলো সেটা তো বললে না! একদল আরব যে আমাদেরকে খুন করার জন্যে পিছু নিয়েছিলো সেটা মনে নেই? মরতে মরতে বেঁচেছিলাম সেবার, ডোরিয়ান বললো। মেঝেতে একটা কুশন পেতে বসে আছে ও।
“আমি নিশ্চিত মিস দুয়ার্তে ঠিকই বুঝেছেন যে পরিস্থিতি এরকম কিছু একটাই ছিলো,” ইয়াসমিনি বললো।
সারাহ আরো কিছুক্ষণ বাজিয়ে একটা ঝঙ্কার তুলে বাজানো থামালো। হাত তালি দিয়ে উঠলো বাকিরা। সারাহ গিয়ে টমের পাশে বসলো।
“মিস দুয়ার্তে,” টম বলা শুরু করলো। “কাল যখন দেখে হয়েছিলো তখন বলেছিলে যে আমাদের জন্যে নাকি কি একটা প্রস্তাব আছে?”
অ্যানা হাত দিয়ে ডলে নিজের কাপড় সোজা করলো। এই ঘরের বাকিদের চাইতে ও কমপক্ষে বারো বছরের ছোট। কিন্তু ওর শান্ত শিষ্ট ভাব দেখে সেটা মনে হয় না।
“ভারত সম্পর্কে কি জানেন?” টমকে জিজ্ঞেস করলো অ্যানা।
টম হাতের ওয়াইনের গ্লাসটা নাড়লো কিছুক্ষণ। তলানির দিকে তাকিয়ে আছে। “বেশি কিছু না। নাবিকদের কাছে যা শুনেছি তাই। বুড়ো সম্রাট মারা যাওয়ার পর থেকে নাকি দেশটার অবস্থা বেশি সুবিধার না।”
“বৃদ্ধ আওরঙ্গজেব মারা যাওয়ার পর থেকে দেশটা একটা যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে আছে,” অ্যানা-ও সায় দিলো কথাটায়। তার তিন পুত্র উত্তরাধিকার নিয়ে লড়াই করেই যাচ্ছে। আর যখনই ওরা যুদ্ধ শুরু করে, তখন দেখা যায় অন্যান্য জমিদার বা নবাবেরাও প্রতিবেশীকে আক্রমণ করে বসে। পশ্চিম দিকে মারাঠারা নিজেদের পাহাড়ের দুর্গ থেকে প্রায় তিরিশ বছর ধরে মুঘলদের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। মালাবার উপকূলে দস্যু আংরিয়া নিজের একটা রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছে। টিরাকোলার দুর্ভেদ্য এক দুর্গ থেকে ও রাজ্য চালনা করে। দক্ষিণের সব নবাবেরা প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। বলা যায় মুঘল সাম্রাজ্য একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে।”
