কামানের গুরুগম্ভীর গর্জন থেমে এখন শুরু হলো মাস্কেটের খট খট। গ্রাবের লোকজন রশি বেয়ে মাস্তুল বেয়ে উঠতে শুরু করলো, যাতে ওখান থেকে নিচে গুলি ছুঁড়তে পারে। নৌকার চারপাশে মুহূর্তের মাঝে সীসার ভারী বর্ষণ শুরু হয়ে গেলো। আশে পাশের পানি টসবগ করে ফুটতে আরম্ভ হলো গুলির চোটে।
অনেকগুলো গুলিই লাগলো জায়গা মতো। একটা ভোলা নৌকার ভিতর ঠাসাঠাসি করে এতোগুলো লোক বসে আছে, ফলে লুকানোর কোনো জায়গা পেলো না ওরা। কিছুক্ষণ পরেই নৌকার খোল রক্তের পুকুরে পরিণত হলো। নৌকার দুই ধার ছিদ্র হয়ে চালুনির মতো দেখতে হয়ে গেলো, দাঁড়গুলো ভেঙে অর্ধেক নৌকার কিনারে ঝুলতে লাগলো, বাকি অংশ পানিতে ভেসে গেলো দূরে।
“কাছের গ্রাবটার দিকে গুলি করতে থাকো,” চেঁচিয়ে বললো ফ্রান্সিস। তবে আহতদের চিৎকার ছাপিয়ে অল্প কয়েকজনই ওর ডাক শুনতে পেলো। ওরা যদি জাহাজের বন্দুকবাজগুলোকে থামাতে না পারে, তাহলে এই ছোট নৌকাটায় কিছুক্ষণের মাঝে দস্যুরা ইচ্ছে মতো নিশানা করে মারতে পারবে ওদেরকে।
ফ্রান্সিস সামনে তাকালো। মাল্লারা সবাই দাঁড়ের উপর উবু হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। গায়ে রক্ত ভরে আছে সবার। কিন্তু তখনও ওরা চলৎশক্তি হারিয়ে ফেলেনি। এই প্রচণ্ড আক্রমণের মাঝেও ওদের সাহসের প্রমাণ পেলো ফ্রান্সিস। তবে আর বেশিক্ষণ এই মনোবল ধরে রাখতে পারবে না। দস্যুদের সাথে লড়াই করতে হলে ওদের অন্য কিছু লাগবে।
জীবনে প্রথমবারের মতো ফ্রান্সিস নেতৃত্বের আসল বোঝা সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারলো। ওকেই সবাইকে পথ দেখেতে হবে, আর সেটা করতে গিয়ে যদি মরেও যেতে হয় তবুও কিছু করার নেই।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়ালো, মাথা নিচু করে রেখেছে যাতে কামানের গোলা না লাগে। তারপরেও মাত্র এক ইঞ্চি উপর দিয়ে চুল পুড়িয়ে উড়ে গেলো একটা গোলা। দাঁড়ানোর সাথে সাথে ওর পায়ের ধাক্কা লেগে শক্ত কিছু একটা গড়িয়ে পড়ে গেলো-ওদের বানানো বোমাগুলোর একটা। দস্যুদের আচমকা আত্মপ্রকাশের কারণে ভুলেই গিয়েছিলো ওগুলোর কথা।
ফ্রান্সিস দুই হাতে দুটো তুলে নিলো। “আগুন জ্বালাও দেখি।”
মেরিডিউ সলতেয় আগুন ধরিয়ে দিলো। সাবধানে নিশানা করে ফ্রান্সিস দুটকেই ছুঁড়ে দিলো জাহজের ভিতর। এরকম গোলাগুলির মুখে যেখানে ওর নৌকা ভরে আছে মরা লাশ আর আহত লোকে, সেখানে ওর পক্ষে মাথা তোলাই ছিলো দায়-কিন্তু ওদের সবার জীবন মরণ নির্ভর করছিলো এটার উপর।
ওর নিশানা ভুল হলো না। বোমা দুটো জাহাজের কিনারে গিয়ে লাগলো, ঠিক কামানের খোপের নিচে। তারপর বিশাল দুটো অগ্নিশিখা তৈরি করে বিস্ফোরিত হলো। ওদিকে যে দস্যুরা ছিলো সাথে সাথে তাদের গায় আগুন ধরে গেলো। কয়েকজন ডেক-এ শুয়ে পড়ে গায়ের আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে লাগলো।
গালিভাতটা গিয়ে গ্রাবটার গায়ে বাড়ি খেলো।
“আমার সাথে সাথে,” চিৎকার করে বললো ফ্রান্সিস। একপাশে একটা রশি ঝুলছিলো। ও সেটা আঁকড়ে ধরে একটা দোল দিয়ে জাহাজের পাশের কাঠের পাটাতনে উঠে এলো। কি হবে সেটা ভাবার সময় এখন হাতে নেই। বোমার তেলে খুব দ্রুত আগুন ধরে কিন্তু তাতে জাহাজে আগুন ধরেনি। দস্যুরা এর মধ্যেই আবার জড়ো হতে শুরু করেছে।
জাহাজের পাশের জালটা বেয়ে উঠে লাফ দিয়ে জাহাজের ডেকে নেমে এলো ফ্রান্সিস, তরবারি বের করে ফেলেছে। একজন দস্যু দৌড়ে এলো ওর দিকে। উজ্জ্বল আলোয় চোখ ধাধিয়ে ছিলো ওর। আন্দাজেই ফ্রান্সিস দস্যুটার গলা বরাবর তরবারি চালালো, একবারের বেশি আর তরবারি তুলতে হলো না ওকে।
নির্মমভাবে লড়ে গেলো ফ্রান্সিস। ওর নিজের জন্যে, ওর লোকজনের জন্যে, সারাহ আর অ্যাগনেসের জন্যে-আর আবারও অ্যানাকে একনজর দেখার আশায়। একটা কামানের উপর লাফিয়ে উঠলো ও। জুতোর ভিতর দিয়ে ওটার গায়ের উত্তাপ টের পাচ্ছে। প্রথমে গোলন্দাজের চেহারা বরাবর লাথি হাকালো ফ্রান্সিস, তারপর লোকটা পিছিয়ে যেতেই সোজা পেটে চালিয়ে দিলো তরবারি।
একটা চিৎকার দিয়ে দস্যুটা ডেক-এ পড়ে গেলো। ফ্রান্সিস সামনে তাকালো। ওর দলের অনেকেই উঠে এসেছে জাহাজে। কয়েকজন মাস্তুল বেয়ে উঠে গিয়ে বন্দুকবাজগুলোকে পেড়ে ফেলার কাজ শুরু করে দিয়েছে। ওরা ওদেরকে টেনে নিচে ফেলে দিলো। ডেক-এর উপর পড়ে, ভর্তা হয়ে ভবলীলা সাঙ্গ হলো ওদের।
গ্রাবে যত লোক ধরে ততো লোক নেই। নিজের জাহাজের সংখ্যার উপর নির্ভর করে আংরিয়া ওর লোকদের অল্প অল্প করে সবগুলো জাহাজে ছড়িয়ে দিয়েছে। শুধু কামান দাগতে পারবে এরকম কয়জনই আছে একেকটা জাহাজে। ওরা ভাবেওনি যে ফ্রান্সিসের লোকেরা জাহাজে চড়তে পারবে। ফ্রান্সিসের লোকেরা লাগামহীন আক্রোশ নিয়ে লড়াই করতে লাগলো। ছোট নৌকাটায় যে যন্ত্রণা ওরা পেয়েছে তা সুদে আসলে ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণের মাঝেই দেখা গেলো সবগুলো দস্যু মৃত, নয়তো পানিতে ঝাঁপিয়ে পালিয়েছে।
“রশি কেটে দাও,” আদেশ দিলো ফ্রান্সিস। আজ অমাবস্যা, ভাটার টান খুব বেশি। যদি দস্যুদের কামানের গোলার হাত থেকে বাঁচা যায়, তাহলে স্রোতের টানেই ওরা এলাকাটা পেরিয়ে যেতে পারবে বলে আশা করা যায়।
হঠাৎ ফ্রান্সিসের খেয়াল হলো এদের মাঝে ও-ই সবচে অভিজ্ঞ নাবিক। তার মানে ওদের সম্ভাবনা আরো কমে এলো। তবে মেরিডিউ ওর সাথে আছে, ও জানে কখন কি করতে হবে। মেরিডিউ-ই মারাঠাদেরকে নোঙ্গরের কাছিটা। দেখিয়ে কোথায় কাটতে হবে বলে দিলো। কয়েকজন ওই কাজে লেগে পড়তেই ফ্রান্সিসের চোখে পড়লো ক্যানভাসগুলো। ও কয়েকজনকে ওটার রশি ধরে টানার কাজে লাগিয়ে দিলো। প্রধান পালটা খুলে যেতেই মেরিডিউ দ্রুত দৌড়ে গিয়ে ওটার সাথে বাধা রশিগুলো টানটান করে দিলো। একেবেকে, থেমে থেমে জাহাজটা সামনের দিকে আগাতে লাগলো।
