মেরিডিউ রশিগুলো ছেড়ে দিয়ে প্রায় বিড়ালের, দক্ষতায় লাফিয়ে নামলো। “নিচে নেমে গেলে ভালো হবে মনে হয়। সামনের গ্রাবের সারির দিকে দেখিয়ে বললো ও। “খোলা সমুদ্রে যেতে হলে আমাদেরকে আগে ওগুলো পার হতে হবে।”
অগ্নিকুণ্ডগুলোর তেজ কমে এসেছে। ফলে ডাঙায় থাকা দস্যুরা ঠিক বুঝতে পারছিলো না যে জাহাজে আসলে কি হচ্ছে। নিজেদের লোকের গায়ে লাগিয়ে ফেলার ভয়ে গুলি করা বন্ধ রেখেছিলো ওরা। কিন্তু জাহাজ নড়ে উঠতেই বুঝলো যে ওটা মারাঠাদের দখলে চলে গিয়েছে, তাই আবার গুলি করতে শুরু করলো।
ফ্রান্সিস নিচে নামার হ্যাচের দিকে তাকালো। “আমি লুকাবো না,” দৃঢ় গলায় বললো ও। ও গ্রাবটার সামনের দিকে তাকালো। ওখানে চারকোণা একটা দুর্গ মতন বানানো। পিছন দিকে খোলা। ভিতরে দুটো নাইন পাউন্ডারের লম্বা নল উঁকি দিচ্ছে।
“চেষ্টা করে দেখি অবস্থার উন্নতি করা যায় কিনা।”
কামান চালাতে জানে এরকম ডজন খানেক লোক বাছাই করলো ফ্রান্সিস। তারপর ওদেরকে কামানগুলোর কাছে পাঠিয়ে দিলো। দস্যুগুলো পর্যাপ্ত পাউডার আর গোলা ফেলে রেখে গিয়েছে। টম যেভাবে শিখিয়েছে সেভাবে করে দ্রুত ওরা কামানে গোলা ভরে সামনের জাহাজটার দিকে তাক করে ফেললো।
“যতোটা সম্ভব নিচু করে তাক করো,” নির্দেশ দিলো ফ্রান্সিস। “আমরা ওটার সামনে আর পিছন দুই দিকে ফুটো করে দেবো।”
কামান গর্জে উঠতেই জাহাজটা দুলে উঠলো। সন্তুষ্ট চিত্তে ফ্রান্সিস দেখলো গোলা দুটো সোজা গিয়ে জাহাজের পিছন দিকের খোল গুঁড়িয়ে দিয়ে ডেক-এর দিকে চলে গেলো। টম আর আবোলির কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষার কারণে ও জানে যে গোলাটা সামনে যাকেই পাবে তাকেই ভর্তা বানিয়ে দিয়ে উড়ে যাবে।
“রি-লোড,” আদেশ দিলো ও। মারাঠারা কেউ ইংরেজি জানে না। কিন্তু আদেশটা ঠিকই ধরতে পারলো। ওরা দ্রুত হাতে নলটা পরিষ্কার করে ফেললো, তারপর ঠিকঠাক নিয়ম মেনে গোলা ভরে, আবার জায়গামতো গোলা ছুঁড়ে আবার পরবর্তী গোলা ভরার কাজ শুরু করে দিলো। দস্যুরা এর আগে কখনোই তাদের প্রতিপক্ষের কাছে থেকে এভোটা প্রতি আক্রমণের শিকার হয়নি। আর এতো দ্রুত পরে আরও একটা একটা আক্রমণ আসবে সেটা তো ছিলো ওদের কল্পনারও বাইরে। ওরা এখন এতো কাছে চলে এসছে যে ফ্রান্সিস জাহাজটার নিচের ডেক থেকে আর্তনাদও শুনতে পেলো।
মেরিডিউ হাল ধরেছে জাহাজটার। ও দিক পরিবর্তন করলো যাতে ওরা সামনের জাহাজটার পাশ কেটে বেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু জাহজটার পাশ ঘেঁষে খোলা পানিতে বেরিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে, ও জাহাজটার পিছনে যাওয়া শুরু করলো। ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে সমর্থন জানালো। এতে করে কামানের মুখ থেকে আংরিয়ার জাহাজটাই ওদেরকে আড়াল করে রাখবে।
কিন্তু তবুও এদিক দিয়ে যাওয়াটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। যেমন, পরের বার কাছে আসতেই দেখা গেলো ওরা এতো কাছ দিয়ে যাচ্ছে যে দুটোর একটা আর একটার সাথে বাড়ি খেলো। যদি দস্যুগুলো এদিকের কামান প্রস্তুত করে রাখতো, তাহলে একেবারে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে ফ্রান্সিস জাহাজটা গুড়ো গুছো করে দিতে পারতো। কিন্তু ফ্রান্সিসের একটু আগের আক্রমণের কারণে ওদের সবার কামানের মুখ এখন খোলা সাগরের তাক করা। ও দেখতে পেলো দস্যুরা দ্রুত কামানের মুখ এদিকে ঘোরানোর জন্যে টানাটানি শুরু করে দিয়েছে।
“দেখা যাক এই শক্ত দাওয়াই ওরা কেমন হজম করতে পারে,” বললো ফ্রান্সিস। আর একটা বোমা তুলে নিলো ও দ্রুত হাতে জ্বেলে দুটো জাহাজের মধ্যবর্তী ছোট ফাঁকটা পার করে ছুঁড়ে দিলো জাহাজে। একগাদা দড়িদড়ার উপর পড়ে বিস্ফোরিত হলো বোমাটা। মাঝে দস্যুরা কামানে দাগার কথা ভুলে আগুন নেভাতে ছোটাছুটি শুরু দিলো। কারণ, ওরা সারা ডেক জুড়ে পাউডার আর গোলা ছড়িয়ে রেখেছে, একবার আগুন ওগুলোর একটা পিপার কাছে পৌঁছালেই কম্ম সাবার হয়ে যাবে। একজন এক বালতি পানি এনে আগুনের উপর ঢেলে দিলো সাথে সাথে বিশাল একটা অগ্নিশিখা ওকে গ্রাস করলো।
ডাঙা থেকে ভেসে এলো বাতাস। শুরুতে দুর্বল থাকলেও এই সরু পথ দিয়ে পার হওয়ার সময় চাপে পড়ে বেশ শক্তিশালী হয়ে গেলো সেটা। বানানোই হয়েছে অল্প বাতাসেও প্রচুর বেগ লাভের জন্যে। আর এই বাতাসে একেবারে উড়াল দিলো। ওরা সর্বশেষ বড় জাহাজটার পাশে চলে এলো। এটা পার হয়ে যেতে পারলেই খোলা সাগরে গিয়ে হাজির হওয়ার মাঝে আর ডাঙায় কয়েকটা কামান দেখা গেলো, কিন্তু সেগুলো নিয়ে আর দুশ্চিত ফ্রান্সিসের। দুর্গের কামানগুলো এতো বাঁকানো সম্ভব হবে না, আর গোলন্দাজেরা ওদের দিকে নিশানাই করতে পারলো না। একটা গোলাও ওদের কাছে এলো না।
ফ্রান্সিস পিছনে তাকিয়ে ঘাটটা ঠিকমতো দেখতে লাগলো। ওরটা কেটে বেরিয়ে এসেছে, আর দস্যুদেরকেও বেঈমানির উপযুক্ত শিক্ষা দিতে এসেছে। একটা জাহাজ গুঁড়িয়ে দিয়েছে, আর একটা দিয়েছে পুড়িয়ে। এখন আংরিয়ার গালিভাতগুলোর মাঝে ভাসছে, ফলে আরো ডজন কয়েক নৌকায় আগুন ধরে গিয়েছে।
কিন্তু এখনো দস্যুদের প্রায় অর্ধেক জাহাজ অক্ষত। আর প্রায় সব লোক নিয়ে ওরা এখানে এসেছিলো, এখন ফিরে যাচ্ছে গোটা তিরিশ। চড়া মূল্য দিতে হয়েছে ওদের। ফ্রান্সিসের মনে হতে লাগলো যে পুরো দায়টাই ওর।
