কিন্তু আগুনের শিখা কোনো জ্বলন্ত জাহাজ থেকে আসছে না। ওগুলো আসছে ডাঙা থেকে। একটা বিশাল অগ্নিকুণ্ড থেকে আগুনের ফুলকি ছুটে যাচ্ছে সোজা আকাশের দিকে। ওটার পাশেই আরো একটা অগ্নিকুণ্ড জ্বলে উঠলো। তারপর আর একটা, আরো একটা, কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো উপসাগরটা যেনো একটা চুলায় পরিণত হলো। জাহাজের ডেক এ লোকজন জড়ো হতে লাগলো। এদেরকে দেখে মনে হলো না যে ওরা অবাক হয়েছে, কেউই ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে এসে হাজির হয়নি। সবাই-ই আগে থেকেই সচেতন ছিলো কি ঘটতে যাচ্ছে, উঠে এসেই কামানের দিকে ছুট দিলো সবাই।
টমের কেমন অসুস্থ লেগে উঠলো। ওখানে আর দেরি করলো না ও। মই বেয়ে একরকম পিছলে নেমে এলো নিচে। ঘষায় হাত ছিলে গেলো, কিন্তু পরোয়া করলো না। দৌড়ে গেলো শাহুজির তাবুর দিকে।
“ওরা আমাদের জন্যে ফাঁদ পেতে বসে ছিলো,” হড়বড় করে বললো টম। আর কিছু বলার প্রয়োজন হলো না ওর। কারণ সাথে সাথে কামানের বিস্ফোরণের শব্দ তাঁবুর দেয়াল কাঁপিয়ে দিলো। এরপর একের পর একে চলতেই থাকলো। এক মুহূর্তের জন্যেও থামছে না গোলাবর্ষণ। ফ্রান্সিস এই গোলাগুলির ভিতর ছোট্ট একটা নৌকায় করে ভাসছে সেই চিন্তাটা মাথায়ও আনতে চাচ্ছে না টম।
শাহুজি বিছানায় শুয়ে ছিলেন। উনি উঠে দ্রুত একটা চাদর গায়ে দিলেন। নিচের উপসাগর থেকে অবিরাম গোলা বর্ষণ চলতেই থাকলো।
“আমার সাথে পাঁচশো লোক দিন,” অস্থির কণ্ঠে বললো টম। “আমি উপসাগরে গিয়ে ওদের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারবো-বা অন্তত ওদের গোলার জবাব দিতে পারবো।”
শাহুজি মাথা নাড়লেন। “আমি জানি আপনার ভাতিজা ওখানে আছে। কিন্তু উপসাগরের দুই পাশেই খাড়া পাহাড়। এই অন্ধকারে ওদিক দিয়ে নামতেই পারবেন না। আর ওরা সবাই কামানের আড়ালে থাকবে। ওরা যেহেতু জানতো যে নৌকাগুলো যাবে, তার মানে ওরা এটাও ধরে রেখেছে যে আমরা ওদেরকে উদ্ধার করতে যাবো। ওদের গোলন্দাজেরা সাথে সাথে দেয়ালের পিছনে কামানে বসে যাবে, আর আপনাদেরকে টুকরো টুকরো করে ফেলবে।”
টম জানে যে শাহুজি ঠিকই বলেছেন। কিন্তু ফ্রান্সিসের কিছু হয়ে যাওয়ার ভয় ওকে এসব যুক্তি মানতে সায় দিচ্ছে না। “আমি একাই যাবো তাহলে।”
“আপনাকে আমি আটকাবো না। কিন্তু খামাখা শহীদ হয়ে গেলে আপনার ভাতিজা বাঁচবে না-বা দুর্গের ভিতরে আপনার স্ত্রীও উদ্ধার হবে না।”
টম থমকে গেলো। রাজার এই নিষ্ঠুর ধীর স্থির কথাবার্তা ওর সহ্য হচ্ছে না। শাহুজির মতো এক অর্বাচীনের কাছ থেকে ওর এরকম জটিল পরিস্থিতিতে কি করা উচিত সেই শিক্ষা নিতে হবে না।
“আপনি বলেছিলেন এই আক্রমণটা ব্যর্থ হলে আপনাকে অবরোধ ছেড়ে দিতে হতে পারে,” টম বললো।
“আমি আপনাকে আগেও বলেছি, আমরা হচ্ছি গোয়ালঘরের ইঁদুর। আমরা আমাদের শত্রুকে তিলে তিলে মারি। আর যখন বিড়াল আসে, তখন আমরা দৌড়ে আমাদের গর্তে গিয়ে লুকাই। এভাবেই টিকে আছি আমরা।”
কামানের গোলার আওয়াজ বেড়েই চলেছে ক্রমাগত। টম টের পাচ্ছে তাঁবুর খুঁটিগুলোর কম্পন থামছেই না। ওর হাতে সময় নেই।
“আংরিয়া কিন্তু জানতো যে আমরা ঘাটের দিক দিয়ে আক্রমণ করবো,” আচমকা বলে উঠলো টম।
“সেরকমই মনে হচ্ছে।”
“তার মানে ও দুর্গ থেকে ওদিকে লোকজন পাঠিয়ে দিয়েছে কামান চালানোর জন্যে।” টমের মাথার ভিতর একটা পরিকল্পনা বাসা বাঁধছে। একটা জুয়া, কিন্তু ওর মাথায় আর কিছু আসছে না। ফ্রান্সিস, সারাহ আর অ্যাগনেস-ওদের সবার জীবন এখন হুমকির মুখে।
শাহুজি টমের অভিব্যক্তিটা খেয়াল করলেন। “কি করতে চাচ্ছেন আপনি?”
“আংরিয়া যেটার কথা স্বপ্নেও ভাববে না।”
*
উপসাগরটার পাশের আগুন এতো উঁচুতে উঠে গেলো যেনো মেঘ ছুঁয়ে ফেলবে। পানির উপর দিয়ে ধোঁয়া উড়তে লাগলো; কামানের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয়ে ছুটে বেড়াতে লাগলো চারপাশে।
ফ্রান্সিসদের নৌকার অবস্থাটা হচ্ছে বস্তায় ভরা বিড়ালের বাচ্চার মতো। পালাতে হলে ওদেরকে আংরিয়ার বিশাল জাহাজ বহরের কামানের সামনে দিয়ে যেতে হবে। একেকটা গ্রাব বিশাল লম্বা। গালিভাতের লোকজন নিজেদের নৌকার মুখ ঘোরানোর জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে, কিন্তু সেটা হতে লাগলো খুবই ধীরে ধীরে। ওদের চারপাশে কামানের গোলা শব্দ তুলে উড়ে যাচ্ছে। একটা এসে ওদের একজনের মাথা উড়িয়ে নিয়ে গেলো। দেখে মনে হলো যেনো গাছ থেকে নারিকেল পড়লো। আর একটা সোজা এসে পড়লো পিছনের নৌকাটায়। সাথে সাথে দুইভাগ হয়ে গেলো নৌকাটা, আরোহীরা সবাই পানিতে ছিটকে পড়লো। কামানের গর্জনের সাথে এবার যুক্ত হলো আর্তচিৎকার। মারাঠারা সাঁতার পারে না।
ফ্রান্সিস হালটা ধরে মোচড় দিলো। গালিভাতের নাক ঘুরে গেলো দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজগুলোর দিকে।
“আরে করছেনটা কি?” চেঁচিয়ে উঠলো মেরিডিউ। “মাথা খারাপ হয়ে গেলো নাকি?”
“জাহাজের দিকে গেলেই ভালো হবে,” ফ্রান্সিস বললো। “আমাদের দিকে আর গোলা ছুঁড়তে পারবে না তাহলে।”
লোকজন সজোরে দাঁড় বাইতে লাগলো। সবার মুখ নৌকার পিছনের দিকে থাকায় ওরা দেখছে না যে ফ্রান্সিস ওদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। তবে কামানের গর্জন আরো জোরালো হওয়ায় ওর উদ্দেশ্য ঠিকই ধরতে পারলো। কামানের মুখ থেকে বের হওয়া আগুনের হলকা এসে লাগতে লাগলো ওদের পিঠে। লোহার বল চারপাশের বাতাসকে চিরে দিচ্ছে থেকে থেকে। গুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে মাথার উপর। ভয়ংকর লাগছে শুনতে, তবে এখন ওরা ওগুলোর নাগাল থেকে নিরাপদ। ওর জাহজাগুলোর এতো কাছে চলে এসেছে যে কামানের মুখ এতো বেশি বাঁকানো সম্ভব না।
