“আমাদের লোকজন নাকি?” প্রশ্ন করলো ফ্রান্সিস। কিন্তু আর একটা শব্দ শুনেই বুঝলো এটা ওদের কাজ না। যে নৌকাটাকে পাহারায় রেখে এসেছে সেটা ছিলো উপসাগরের মাঝখানে। গোলার আওয়াজ আসছে কাছের ডাঙা থেকে।
“নৌকা ঘোরাও,” চিৎকার করে আদেশ দিলো ও। “আমরা ধরা পড়ে গিয়েছি।”
অস্ত্র ফেলে দিয়ে দাঁড় তুলে নিলো সবাই। অন্ধকারে একজন আর একজনের সাথে ঠোকাঠুকি লেগে গেলো। কয়েকজন আবার বসলো উল্টো হয়ে, ফলে দাঁড়ে দাঁড়ে বাড়ি খেতে লাগলো; কোনো দিকে না এগিয়ে এক জায়গায় পাক খাওয়া শুরু করলো নৌকাটা।
“সবাই একসাথে,” ফ্রান্সিস চেঁচালো। সামনে ও শুধু একগাদা কালো অবয়বকে দাঁড় হাতে ঠেলাঠেলি করতে দেখতে পাচ্ছে। কোনদিকে যে যাচ্ছে। সেটা যেমন বুঝতে পারছে না, কোনদিকে যাওয়ার আদেশ দেবে সেটাও ভেবে পাচ্ছে না।
তারপর আচমকা সবকিছু আলোকিত হয়ে গেলো। উপসাগরের সবকিছু। দুইপাড় জুড়ে বিশাল বিশাল অগ্নিকুণ্ড জ্বলে উঠলো। ওগুলোর আগুন এতো উজ্জ্বল ভাবে আর এত উপরে উঠতে লাগলো যে ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ চোখে ঠিকমতো দেখতে পেলো না। নোঙর করে রাখা জাহাজগুলোতেও আরো অনেকগুলো আলো জ্বলে উঠলো। অনেকগুলো পায়ের দৌড়ে আসার শব্দ শোনা গেলো ডেক-এর উপর। এততক্ষণ লুকিয়ে ছিলো এরা।
রাত যেনো দিনে রূপান্তরিত হয়ে গেলো। নিজের দৃষ্টি ঠিক হতেই ফ্রান্সিস চেয়ে দেখলো নৌকার সবাই আতংকে জায়গায় জমে গিয়েছে। যেনো বজ্রাহত হয়ে আছে সবাই। আলোর পরিমাণ বাড়তেই লাগলো। আরো অগ্নিকুণ্ড জ্বালানো হচ্ছে। পাহাড়ের চূড়ায় সংকেত দেওয়া হতে লাগলো। দুর্গের ভিতর থেকেও আলো আসতে লাগলো। নৌকা থেকে জাহাজের খোপ দিয়ে কামান বের করার অশুভ ধ্বনি ভেসে এলো ফ্রান্সিসের কানে।
“ফাঁদে পড়েছি আমরা!” আর্তনাদ করে উঠলো ফ্রান্সিস।
*
ঘুম আসছে না টমের। ফ্রান্সিস এখন এই অন্ধকারে সাগরে। নিজের জীবন বিপন্ন করে সারাহ আর অ্যাগনেসকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। টম সহজে দুশ্চিন্তা করে না। কিন্তু এই মুহূর্তে একটুও স্থির হতে পারছে না। নিজের তাবুতে শুয়ে আছে ও, ভেবেছিলো একটু ঘুমাতে পারলে সময়টা তাড়াতাড়ি যাবে। কিন্তু দেখা গেলো শোয়া মাত্র দুনিয়ার যতো খারাপ চিন্তাগুলো ভীড় করতে লাগলো মাথায়। যদি বেড়াটা ভোলা না থাকে? যদি দস্যুরা ওদেরকে ধোকা দেয়? বা যদি আংরিয়া ধরে ফেলে ঐ ডাকাতটার কাছে থেকে চাপ দিয়ে সব কথা বের করে ফেলে? যদি-?
থাকতে না পেরে শেষমেশ ও তাবু থেকে বেরিয়ে এসে পাহাড়ের উপরের মিনারটার উপর উঠে গেলো। এতো উঁচু থেকে পাহাড়ের শেষ প্রান্ত, আর তার নিচের উপসাগর দুটোই দেখা যায়। ওখানেই আংরিয়ার জাহাজগুলো নোঙর করে রাখা, ফ্রান্সিসেরও এতোক্ষণে পৌঁছে যাওয়ার কথা সেখানে। টম নিশ্চিত যে ও সবার আগে আগে যাচ্ছে।
নিজের ভাতিজাকে নিয়ে গর্ব করে টম। গত কয়েক মাসে ওরা দুজন দুজনের চোখের আড়াল হয়নি বললেই চলে। এখন ছেলেটা কাছে না থাকায় টম বুঝতে পারছে ওর অনুপস্থিতি কতোটা মর্মপীড়াদায়ী। টম ফ্রান্সিসের উপর ভরসা করেই চলে এখন। ফ্রান্সিসের তারুণ্য, ওর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, ওর শান্তশিষ্ট মার্জিত চলাফেরা। এরকম কাউকে নিয়ে যে কেউই গর্ব বোধ করবে।
হঠাৎ একটা অপরাধবোধে ছেয়ে গেলো ওর মন। আবারও ওর মনে সেই বহু বছর আগের টেমস নদীর ভয়ংকর স্মৃতিগুলো মনে পড়ে গেলো। মুখ ঢাকা মানুষটার হাতে পিস্তলটা দেখা; একটা জ্যাভেলিনের মতো করে নেপচুন তরবারিটা ছুঁড়ে দেওয়া, সেটা লোকটার হৃৎপিণ্ড ফুটো করে দিতে দেখা। আবোলি মৃত লোকটার মুখের আবরণ সরাতেই সেখানে বিলির মুখ আবিষ্কৃত হওয়া।
আমি ফ্রান্সিসের বাবাকে খুন করেছি। এটাই ওর আদি পাপ। প্রতিবার ফ্রান্সিসের দিকে তাকালেই এই অমার্জনীয় অপরাধটা ওকে তাড়া করে।
কিন্তু ও ফ্রান্সিসকে যতোটা ভালোবাসে, বিলি কখনোই ততোটা বাসতো না, ভাবলো টম। ফ্রান্সিসের ভালো দিকগুলো দেখলে বিলি সহ্য করতে পারতো না। দরকার হলে পিটিয়ে ওর ভিতর থেকে ভালোটা বের করে ওকে একজন শয়তানে পরিণত করতো। ফ্রান্সিস তখন পরিণত হতো এক ভাঙাচোরা, বিকৃত মানসিকতার মানুষে। বা আরো খারাপ, হয়তো হুবহু বিলির মতো হতো। এক শয়তান, যে কিনা শুধু ক্ষমতার লোভে মত্ত, যে কিনা অন্যের ক্ষতি করে হলেও নিজের আখের গোছাতে ছাড়ে না।
আমি বিলিকে খুন করেছি। কিন্তু আমি ফ্রান্সিসকেও বাঁচিয়েছি। এই অনুভূতিটা একটা চাবির মতো টমের মনটা পাল্টে দিলো। প্রায় বিশ বছর ধরে বন্ধ থাকা একটা তালা খুলে গেলো যেনো। ও এতোদিন বুঝতেও পারেনি যে এতো শক্ত করে এই বাঁধনটা ওর বুকে চেপে বসে ছিলো, আজ এখন সেটা খুলে যাওয়ায় বুঝতে পারছে। একটা নতুন চেতনা যেনো জাগ্রত হচ্ছে ওর ভিতরে। ওর আত্মাকে পরিপূর্ণ করে দিচ্ছে। রাতের তাজা আর পরিষ্কার ঠাণ্ডা বাতাস বুক ভরে টেনে নিলো ও। এতো সব সুগন্ধে ভিতরটা ভরে গেলো যেগুলো ও এতোদিনে এই প্রথম খেয়াল করলো।
বিলিকে খুব করার অপরাধবোধ কখনোই যাবে না ওর। কিন্তু অবশেষে ও সেটা থেকে মুক্তিরও একটা উপায় খুঁজে পেয়েছে।
নিচের অন্ধকারে একটা আগুন ঝলসে উঠলো। টম মিনারের ধারটা চেপে ধরলো। ৰিলিসহ যাবতীয় চিন্তা মুহূর্তে উবে গিয়েছে। ফ্রান্সিস নিশ্চিত বেড়াটা পার হয়ে উপসাগরের ভিতরে ঢুকে ওর বোমাগুলো ছোঁড়া শুরু করেছে। টম ফ্রান্সিসের ছোট নৌকাগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করলো। এটাই হচ্ছে পরিকল্পনার সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ। ফ্রান্সিসরা যদি এখন দ্রুত পালিয়ে আসতে না পারে, তাহলে সোজা আংরিয়ার কামানের মুখে পড়ে যাবে।
