টম চাচা এখন থাকলে ভালো হতো, মনে মনে ভাবলো ফ্রান্সিস। দুজনের এতো কষ্টের পর, ওর চাচার সান্নিধ্যেই নিজেকে নিরাপদ মনে হয়। ও ভেবেছিলো টম-ই বোধহয় এই আক্রমণে নেতৃত্ব দেবে-টম চেয়েছিলোও-কিন্তু শাহুজি বাধ সাধেন। “আপনিই আমাদেরকে এই বিশাল কামানগুলোকে এনে দিয়েছেন আর সেগুলো থেকে টুপিওয়ালাদের মতো গোলা ছোঁড়াও শিখিয়েছেন। যদি আপনি অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেলেন বা যদি পাহারাদারদের হাতে ধরা পড়েন বা অন্য কিছু হয় আপনার, তাহলে আমার সৈন্যদলের মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে যাবে।”
“আমার স্ত্রী আছে ওখানে,” টম প্রতিবাদ করেছিলো। কিন্তু ও আর কোনো যুক্তি দেওয়ার আগেই ফ্রান্সিস এগিয়ে এলো। ও জানে ওর কি করতে হবে।
“আমি যাবো সৈন্য নিয়ে।”
এখন নৌকায় বসে সেজন্যে ওর আফসোস হচ্ছে না-তবে ভয় পাচ্ছে ঠিকই। সামনেই কাঠ আর রশির ঘষা খাওয়ার শব্দ শুনতে পেলো। ওরা ঘাটের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। ও অন্ধকারে দেখার চেষ্টা করলো। বেড়াটা খুঁজছে, আশা করছে যে ওটা ওখানে থাকবে না।
“অন্তত ওরা আমদের জন্যে ওঁত পেতে নেই,” বিড়বিড় করে বললো ফ্রান্সিস। কোনো নৌকাতেই কোনো আলো নেই। আর তীরেও কেউ আগুন জ্বেলে পাহারা দিচ্ছে না। সম্ভবত আংরিয়া ওর সব লোককে দুর্গের ভিতরে থাকার আদেশ দিয়েছে।
ও পায়ের কাছে বস্তাটায় হাত দিলো। এটার ভিতর মাটির বানানো ছোট ছোট ঘটে তেল ভরে নিয়ে আসা হয়েছে। ঢাকনার ভিতর দিয়ে একটা সলতে ভরা। ওরা, দেখে ফেলার ভয়ে নৌকায় আগুন বহন করতে পারেনি, কিন্তু প্রতিটা নৌকাতেই আগুন জ্বালানোর মতো যথেষ্ট সরঞ্জাম আছে। ওরা আংরিয়ার জাহাজগুলোর কাছে পৌঁছালেই সলতেয় আগুন ধরিয়ে ছুঁড়ে দেবে।
শৈল অন্তরীপটা পেরিয়ে উপসাগরে প্রবেশ করলো ওরা। দুপাশেই এখন ডাঙা। কালো দেখাচ্ছে সবদিকে। বেড়াটার কাছাকাছি চলে এসেছে। বা টের না পেয়েই ওটাকে ছাড়িয়ে এসেছে কিনা কে জানে। সম্ভবত লোকটা তার কথা রেখেছে।
ফ্রান্সিস ওর বসার জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ালো, নৌকার দুলুনির তালে তালে দুলছে। দৃষ্টি সামনের দিকে নিবদ্ধ। সামনে কি কিছু দেখা যাচ্ছে? নাকি ওটা পানির ভিতর চর জাতীয় কিছু?
ধ্যাপ করে নৌকার সামনের অংশ শক্ত কিছু একটায় বাড়ি খেলো। ভারসাম্য হারিয়ে উল্টে গিয়ে আবার আগের জায়গায় বসে পড়লো ফ্রান্সিস। লোকজন সতর্ক হয়ে বিড়বিড় করতে লাগলো; কয়েকজন দাঁড় ফেলে অস্ত্র তুলে নিয়েছে।
“বেড়াতে লাগলো নাকি?” সতর্ক কণ্ঠে বললো ফ্রান্সিস।
মেরিডিউ অন্ধকারেই হাতড়ে হাতড়ে জিনিসটা কি সেটা বোঝার চেষ্টা করলো। “এটা একটা নৌকা,” ও জবাব দিলো। “আমরা বন্দরের ভিতরে।”
ফ্রান্সিস স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। বেঈমান লোকটার লোভের উপর সন্দেহ না থাকলেও, লোকটার উপর ভরসা করতে পারেনি। আর এই মুহূর্তের আগ পর্যন্ত ও নিশ্চিত ছিলো না যে বেড়াটা কাটা কিনা।
“আমরা কি বোমাগুলোয় আগুন লাগানো শুরু করবো?” মেরিডিউ জিজ্ঞেস করলো।
“আর একটু ভিতরে যাওয়ার পরে,” ফ্রান্সিস বললো। “প্রথম জাহাজটায় আগুন দেওয়ার পরেই কিন্তু আমাদেরকে পালানোর তোড়জোড় শুরু করতে হবে।”
ও পিছনে ফিরে দেখে বাকি নৌকাগুলোও চলে এসেছে। ভেজা দাড়ের পানি স্নানভাবে চিকচিক করছে। “সবার শেষের নৌকাকে বলো এখানেই অপেক্ষা করতে যাতে পালানোর সময় সমস্যা না হয়। বাকিরা আমাদের পিছু পিছু আসো।”
নৌকাগুলো ঘাট বরাবর এগিয়ে গেলো। মেরিডিউ নৌকার সামনে লগি হাতে হাঁটু মুড়ে বসে আছে। সামনে কিছু পড়লে সরিয়ে দেবে ওটা দিয়ে। আংরিয়ার বহরের কাছে পৌঁছে যাওয়ায়, ফ্রান্সিস জাহাজগুলোকে আরও স্পষ্ট দেখতে পেলো। অনেকগুলোই ছোট, ওদের গালিভাতের চাইতে বড় না, কিন্তু কয়েকটা আছে বিশাল গ্রাব, নাক ভোতা জাহাজ ওগুলো। মাস্তুল নৌকার লোকগুলোকে ছাড়িয়ে অনেক উপরে উঠে গিয়েছে। ফ্রান্সিস অনুমান করলো যে ওগুলোতে নিশ্চয়ই যথেষ্ট পরিমাণ গোলাবারুদ আছে, নইলে এগুলোও দুর্গের রসদপাতি আনার কাজে ব্যবহার করতো আংরিয়া। এগুলো বিস্ফোরিত হওয়ার আগেই ও অনেক দূরে চলে যেতে চায়।
ওরা বেয়ে চললো। সামনে আর কোনো গ্রাব নেই, তার মানে ওরা নিশ্চয়ই জেটির পিছনে কম পানিতে চলে এসেছে। এখানেই নদীর মুখটা। ফ্রান্সিস সবাইকে থামতে আদেশ দিলো।
“অনেকদূর চলে এসেছি,” ঘোষণা দিলো ফ্রান্সিস। “বোমাগুলোতে আগুন লাগাও।”
ওর কেমন যেনো লাগতে লাগলো। এটাই হচ্ছে সবচে বিপজ্জনক সময়, উপসাগরের অনেক ভিতরে চলে এসেছে ওরা। কিছু হলে, মাঝখানে আরো দুটো নৌকা পেরিয়ে তারপর নিরাপদ জায়গায় পৌঁছাতে পারবে। এখন আবার ওদেরকে আগুন জ্বালাতে হবে, কেউ নজর রেখে থাকলে নিজেদের উপস্থিতি ফাস হয়ে যাবে আর কিছুক্ষণের মাঝেই।
কিন্তু এই কাজটা করতেই এসেছে ওরা। ফ্রান্সিস আগুন জ্বালার বক্সটা থেকে ছোট একটু আগুনের মশলা বের করলো। মেরিডিউ বস্তাটা নৌকার খোলে উপুড় করে সবগুলো বোমা বের করে এক সারি করে রাখলো। ফ্রান্সিস চকমকি পাথরটা ঘষা দিলো ইস্পাতের উপর।
প্রথম ফুলকিটা আগুনের মশলায় স্পর্শ করার আগেই একটা গুলির আওয়াজ রাতের নীরবতাকে খান খান করে দিলো। ঝট করে মাথা তুললো ফ্রান্সিস। সাথে সাথে দেখতে পেলো উপসাগরে ঢোকার মুখে কোথাও কামানের মুখ থেকে আগুন বেরিয়ে এলো।
