ওর সারা জীবনটা বদলে গেলো মুহূর্তেই। জানালার চৌকাঠে হাত রেখে বাইরের রাতের আকাশের দিকে চেয়ে রইলো ও। লিডিয়া পিছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরলো ওকে।
“টম আপনার বাবা,” আবার বললো লিডিয়া। “আর উনি এখানেই আছেন, অপেক্ষা করছেন।” বলে ও জানালা দিয়ে দূরে অবরোধকারীদের জ্বালা আগুনগুলোর দিকে ইশারা করলো। “এখন আর আপনার উচিত হবে না। ওনাকে তার স্ত্রী আর তার আপন ছেলের সহবত থেকে বঞ্চিত করা। চলেন আমরা ওনার কাছে যাই। আজ রাতেই। আমি জানি আপনি প্রহরীদের একটা ব্যবস্থা করতে পারবেন। দেখবেন, উনি আপনাকে দেখলে খুব খুশি হবেন। আপনাকে নিজের সন্তান হিসেবেই মেনে নেবেন।”
লিডিয়া চুপ করে গেলো। ক্রিস্টোফার জানালার উপরে নেপচুন তরবারিটা তুললো। ফলাটা দিগন্তের দিকে তাক করা।
“এটা জন্মগত ভাবেই আমার সম্পত্তি,” বিড়বিড় করে বললো ক্রিস্টোফার। “টম কোর্টনী এটা তার বাবার কাছ থেকে পেয়েছে, আর আমিও এটা তার কাছ থেকেই পেতাম। যদি না সে আমাকে ফেলে পালাতে।”
“এখনতো আবার উনি. আপনাকে খুঁজে পেয়েছেন, লিডিয়া বললো।
ক্রিস্টোফার ঘোর লাগা চোখে তাকালো লিডিয়ার দিকে।
“না, নরম স্বরে বললো ক্রিস্টোফার। তারপর একটু ভেবে যেনো ব্যাপারটার নিশ্চয়তা খুঁজে পেয়ে আবার বললো, “না।”
লিডিয়া এর আগে কখনো ক্রিস্টোফারের চোখে এমন উন্মাদ দৃষ্টি দেখেনি। ও পিছনে দিকে সরে গেলো। বুঝলাম না।”
ক্রিস্টোফার তরবারিটা খাপে ভরে রাখলো। “টম কোর্টনী কেমন মানুষ?” শীতল গলায় বললো ও। “আমার মা-কে ভোগ করলো, তারপর মায়ের পেটে যখন আমি আসলাম, তখন তাকে একটা ময়লা কাপড়ের মতো ছুঁড়ে ফেলে দিলো। আমার বাবা-গাই-যে আমাকে ঘৃণা করে, সেটা কোনো অবাক করার বিষয় না। আমি তাকে সন্তুষ্ট করার কত চেষ্টা করেছি, তার আদর পাওয়ার জন্যে কতো কষ্টই করেছি, কিন্তু তবুও উনি আমাকে কিছুতেই ভালোবাসতে পারেননি, কারণ আমি তার সন্তান নই।”
“আপনার পক্ষে তো জানা সম্ভব ছিলো না।”
“আমি ওনাকে কতোটা যে অপছন্দ করি!” প্রতিটা শব্দ চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করতে লাগলো ক্রিস্টোফার। “আমি বুঝি না। উনি আমার মায়ের সম্মান রক্ষা করেছেন। চাইলে ওনাকে ছেড়ে দিতে পারতেন। এরপরে আবার আমাকেও ভালবাসাটা আসলে তার জন্যে বেশি বেশি হয়ে যেতো। আমি ছিলাম তার ভাইয়ের অপরাধের প্রমাণ, কিন্তু তবুও উনি আমাকে তার ছেলে হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। উনি ওনার সর্বোচ্চটা করেছেন, উনি আমাকে তার সন্তান হিসেবে পালন করেছেন, কিন্তু বিনিময়ে আমি তাকে ঘৃণা বাদে আর কিছুই দেইনি। আর তুমি যদি আমার জীবনে না আসতে, তাহলে হয়তো জীবনেও আমার সত্যিটা জানা হতো না।”
ক্রিস্টোফার শক্ত হাতে লিডিয়ার মুখটা ধরে রইলো। লিডিয়া নিঃশ্বাস পর্যন্ত ফেললো না। ক্রিস্টোফারের চোখের দিকে চাইলো, কিন্তু ক্রিস্টোফার কি ওকে চুমু খেতে চায় নাকি ঘাড়টা মটকে দেওয়ার জন্যে এভাবে ধরেছে সেটা ও জানে না।
“আমি দুঃখিত, কোনোমতে বললো লিডিয়া।
ক্রিস্টোফার ওর কপালে চুমু খেলো। “তুমি ভুল কিছু করোনি। তোমাকে ধন্যবাদ। এখন আমার সামনে বিশাল একটা সুযোগ এসে হাজির হয়েছে।”
লিডিয়া আশান্বিত হয়ে উঠলো, “কিসের? বাবার সাথে পুনর্মিলনের?”
“প্রতিশোধ নেওয়ার।”
*
কোনো শব্দ না করেই নৌকাগুলো ঘাটের দিকে এগিয়ে গেলো। ফ্রান্সিস দাঁড় আটকানোর জায়গাটাতে সবাইকে ভালোমতো তেল দিয়ে রাখতে বলেছিলো। আর দাঁড়েও বলেছিলো ন্যাকড়া বেঁধে নিতে, যাতে শব্দ সর্বনিম্ন হয়। মারাঠারা পাহাড়ী মানুষ, নৌকা চালিয়ে অভ্যস্ত না। দুর্গ থেকে দেখা যায় না এমন জায়গায় নিয়ে, টম আর ফ্রান্সিস ওদেরকে সারাদিন অনুশীলন করিয়েছে। কেস্ট্রেল-এর নাবিকেরা ছিলো ওদের প্রশিক্ষক। কিন্তু যতোই হোক, এই রাতের বেলা, খোলা পানিতে ওরা ঠিকই গণ্ডগোল করে ফেললো।
একজন মাল্লা ঠিকমতো দাঁড় ফেলতে পারলো না। ফলে ভারসাম্য হারিয়ে হাত থেকে পিছলে গেলো দাঁড়টা। ঠাস করে সোজা গিয়ে পড়লো নৌকার ভিতর জড়ো করে রাখে অস্ত্রগুলোর উপর। দাঁড়ের বাড়ি খেয়ে তরবারিগুলো ঝনঝন করে উঠতেই মাল্লাটা গালি দিয় উঠলো।
“আস্তে,” হিসিয়ে উঠলো ফ্রান্সিস।
লোকটা দাঁড়টা আবার তুলে নিতে নৌকার খোলের দিকে ঝুঁকে গেলো। বাকিরা সবাই দাঁড় তুলে বসে রইলো, নিঃশ্বাস নেওয়ারও সাহস করছে না। সবাই কান পেতে শোনার চেষ্টা করছে যে ওরা ধরা পড়ে গিয়েছে কিনা।
কিন্তু পাখির কিচিরমিচির, পোকামাকড়ের কিচকিচ, তীরে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ার শব্দ আর ওদের দাঁড় থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়ার শব্দ বাদে আর কিছুই শোনা গেলো না। মেরিডিউ ফ্রান্সিসের পাশে বসে নিচু স্বরে আদেশ দিতেই আবার সবাই বাওয়া শুরু করলো।
“যখন গোলাগুলি শুরু হবে, তখন এরা ঠাণ্ডা থাকতে পারলেই হয়, ফিসফিসিয়ে বললো মেরিডিউ। “যদি বেড়াটা কাটা না থাকে তো আমাদেরকে খুব দ্রুত পালাতে হবে।”
“ওটা কাটা থাকবে,” ফ্রান্সিস জোর দিয়ে বললো। যেনো নিজেকেই আশ্বস্ত করলো ও। নৌকার ডানপাশে দুৰ্গটার অবয়ব দেখা গেলো। তারাভরা আকাশের বিপরীতে কালো দেখাচ্ছে। একটা মিনারে আলো জ্বলছে। নিশ্চয়ই একজন প্রহরী ওদিক দিয়ে নজর রাখছে। সে কি চুপিচুপি ওদের জাহজাগুলোর দিকে যেতে থাকা এই ছোট্ট নৌকাটা খেয়াল করতে পারবে? গালিভাত নামের চারটা ডিঙি নৌকা। প্রতিটায় পঞ্চাশজন করে অস্ত্রধারী লোক।
