“আমার উপর রাগ করেছেন?” উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললো লিডিয়া। যতোই ক্রিস্টোফারের প্রতি আকৃষ্ট হোক না কেন, ও জানে যে ক্রিস্টোফার অসন্তুষ্ট হলে ওর কপালে শনি আছে। ওর জীবন নির্ভর করছে এর উপর।
ক্রিস্টোফার ওর দিকে তাকালো। “আজ সন্ধ্যায় এমন একটা কথা জেনেছি, যেটা আসলে হজম করতে পারছি না।”
লিডিয়া ওর লম্বা আঙুলগুলো দিয়ে ক্রিস্টোফারের হাতে মালিশ করতে লাগলো। “কি কথা, সোনা?”
“তুমি বুঝবে না।”
লিডিয়া ক্রিস্টোফারের ঘাড়ের মাংসপেশিতে হাত বুলালো, ওগুলো ঠিক নোঙরের কাছির মতো পাকানো। আরো জোরে চাপ দিলো ও, যতোটা পারে ভিতরে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করছে আঙুল। ক্রিস্টোফার আরামে অস্ফুট শব্দ করে উঠলো।
“একবার বলেই দেখুন না,” লিডিয়া আবদারের সুরে বললো। “আপনি নিজের ভিতর এতো কিছু চেপে রাখেন! আমাকে বলে কেন কিছুটা হালকা হন না?”
ক্রিস্টোফারের আসলে বলার ইচ্ছে ছিলো না। কিন্তু লিডিয়ার আঙুলের চাপে মনে হলো যেনো কিছু একটা খুলে গেলো, অনেকটা বোতলের মুখ খুলে যাওয়ার মতো। “টম কোর্টনী এখানে হাজির হয়েছেন,” ফস করে বলে ফেললো ও।
লিডিয়ার আঙুল থেমে গেলো। “টম কোর্টনী?”
“গাইয়ের ভাই। আজ সন্ধ্যাতেই তার সাথে দেখা হলো। উনি এখানেই আছেন। ঐ অবরোধকারীদের দলে।”
“নিশ্চিত হচ্ছেন কি করে?”
“উনি তরবারিটা চিনে ফেলেছেন। এটা নাকি তার বাবার ছিলো। আর এখন ওনার।” একবার শুরু হতেই বাঁধ ভাঙা নদীর মতো করে কথা বের হতেই থাকলো ক্রিস্টোফারের মুখ দিয়ে। “তুমি না বলেছিলে তোমার সাথে যারা আছে তাদের একজন হচ্ছেন সারাহ কোর্টনী। উনি হচ্ছেন টমের স্ত্রী-উনি এসেছেন ওনাকে উদ্ধার করতে।”
লিডিয়ার মস্তিষ্কে ঝড় চলছে। তথ্যগুলো হজম করার চেষ্টা করছে, সেই সাথে ওগুলোর গুরুত্ব নিরূপণের চেষ্টা করছে।
“গভর্নর ওনাকে পাঠিয়েছেন নাকি?” সাবধানতার সাথে জিজ্ঞেস করলো লিডিয়া। “গাই কি অ্যাগনেস আর সারাহকে মুক্ত করতে এই সৈন্যদল পাঠিয়েছেন?”
ক্রিস্টোফার হাসলো। “সেটা কোনোদিন সম্ভব না। গাই আমার চাইতেও টমকে বেশি ঘৃণা করে। যদি জানতে পারে যে টম এখানে, তাহলে উনি নিজে এসে টমের গলা কেটে আংরিয়াকে উপহার দেবে।”
“কোর্টনীদের সম্পর্কে দেখি আপনি অনেক কিছু জানেন,” খোঁচা মেরে বললো লিডিয়া। “আপনি কি আমাকে না জানিয়েই সারাহের সাথে শুয়েছেন নাকি?”
ক্রিস্টোফারের চেহারা আবার কালো হয়ে গেলো। লিডিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো ও। এমনভাবে ওর আপাদমস্তক দেখতে লাগলো যে লিডিয়া ওর জীবন নিয়ে শঙ্কায় পড়ে গেলো। এই মেজাজে ক্রিস্টোফার যে কোনো কিছু করে বসতে পারে।
“আমাকে বলুন, সোনা,” অনুনয় করলো ও। “আমি তো আপনারই দলে।”
ক্রিস্টোফার আর নিজের ভিতর কথাগুলো ধরে রাখতে পারলো না। “সারাহ কোর্টনী আমার চাচী। আমি হচ্ছি ক্রিস্টোফার কোর্টনী, গাই-এর ছেলে। দুই বছর আগে আমি গাই-এর সাথে ঝামেলা করে বোম্বে থেকে পালিয়ে চলে আসি।”
আচমকা সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেলো লিডিয়ার কাছে। “আপনি নিশ্চয়ই গাইকে খুব ঘৃণা করেন?”
“আমার সমগ্র সত্তা দিয়ে।”
কথোপকথন দ্রুত আগাচ্ছিলো। আর এতোগুলো সম্ভাবনার মাঝ দিয়ে লিডিয়া ঠিক করতে পারছিলো না কোনটা ধরে নাড়লে ওর সবচে সুবিধা। ওর আপাতত সব গোপন রাখলেই ভালো হবে মনে হয়। কিন্তু ও যদি এখন না বলে, আর ক্রিস্টোফার পরে সব জানতে পারে, তাহলে সম্ভবত কোনোদিনও ওকে ক্ষমা করবে না।
লিডিয়া ওর দিকে ঝুঁকে এলো। এরপর ও যা বলতে চাচ্ছে সেটা ও চাইলেও আর আটকে রাখতে পারলো না।
“গাই আপনাকে ঘৃণা করার একটা কারণ আছে, যা আপনি জানেন না। গাই আপনার বাবা নন।”
ক্রিস্টোফার এতটাই অবাক হলো যে হেসে ফেললো। পর মুহূর্তেই ওর চেহারা শক্ত হয়ে গেলো। যেনো লিডিয়াকে ধরে মার দেবে। “এসব কি আবোল তাবোল বলছো?” ওর গলা চড়ে গেলো। “তুমি কি ভেবেছো যে। তোমাকে আমার বিছানায় শুতে দেই মানে এসব উল্টাপাল্টা বলে আমাকে অপমান করতে পারবে? আমি চাইলে এখুনি তোমাকে আবার কয়েদখানায় ফেরত পাঠাতে পারি-বা আংরিয়ার কাছে মজা করতে পাঠাতে পারি।”
“সারাহ কোর্টনী বলেছে আমাকে, কোনোমতে বললো লিডিয়া। “তার বোন, মানে আপনার মা ক্যারোলিন নাকি টমের সাথে শুয়েছিলেন। যখন ওনারা সবাই একসাথে জাহাজে করে ইংল্যান্ডে যাচ্ছিলেন তখন। গাই তাকে স্পর্শ করার আগেই উনি গর্ভবতী হয়ে পড়েছিলেন।” লিডিয়া খেয়াল করলো টম ব্যাপারটাকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। তার পেটে ছিলেন আপনি।”
“অসম্ভব।” কিন্তু ও যতোই কথাটাকে অস্বীকার করতে চাক না কেন, ওটা ওর মাথায় ঘুরতে লাগলো। কথাটার সত্যতা ওর ভেতরে অনুরণিত হতে লাগলো। কিছুতেই সরাতে পারলো না। সব খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে। ঠিক যেমন একজন নাবিক তার চার্টে দেখনো পথ ধরে নিরাপদে জাহাজ বন্দরে ভেড়াতে পারে, ক্রিস্টোফারও তেমনি ওর সারা জীবনের নতুন একটা গতিপথ দেখতে পেলো। গাইয়ের মেজাজ, নিজের স্ত্রীর প্রতি তার তীব্র অসন্তোষ, নিজের সন্তানের প্রতি তার অসম্ভব আক্রোশ। যেভাবে ছোট থেকে কোম্পানির লোকজন এটা সেটা বলাবলি করতো, আর গাই ঘরে ঢুকলেই চুপ হয়ে যেতো। সত্য কথা হচ্ছে, ওর বাবার চুল লাল আর চামড়াও ফর্সা, আর ক্রিস্টোফারের চুল আর গায়ের রঙ দুটোই গাঢ়। তুমি ভেবছিলে এসব তোমার মায়ের কাছ থেকে পেয়েছে। নিজেকে তিরস্কার করলো ও। সৈকতে দেখা লোকটার দর্পন প্রতিবিম্ব ও। টম কোর্টনীর ছেলে ও।
