“খেয়াল রাখবেন ওদের যেনো কোনো কিছু না হয়,” টম বললো। ভিতরে ভিতরে ও ভাবছে, কে তুমি? এই লোকটা এমন নিখুঁত ইংরেজি বলে, কিন্তু ডাকাত আর দস্যুদের সাথে সবসময় চলাফেরা। আর এখন ওর তরবারি দখল করে বসে আছে। কোন ভাগ্যে ঘুরে ফিরে বারবার ওদের দেখা হয়ে যাচ্ছে?
অপরদিকে ক্রিস্টোফারের আর অজানা নেই যে ও কার সাথে কথা বলছে। তরবারিটা ছিলো আমার বাবার… লোকটাই বলেছে কথাটা। যদি সত্যি বলে থাকে, তাহলে ইনি অবশ্যই গাই-এর ভাই। অবশ্য লোকটার গলার জোর দেখে মনে হয়নি যে সে মিথ্যে বলছে। উইলিয়াম চাচা মারা গিয়েছেন। আর ক্রিস্টোফার ওদের পরিবারের ঠিকুজি থেকে জানে যে ডোরিয়ান চাচার চুল লাল। তার মানে এতোক্ষণ ও ওর চাচা টম কোর্টনীর সাথে কথা বলেছে।
ক্রিস্টোফার সাথে সাথে আতংকিত হয়ে পড়লো এই ভেবে যে টম ওকে চিনে ফেলবে। ব্যাপারটা অসম্ভব যদিও-টমের সাথে ওর জীবনেও দেখা হয়নি। এমনকি ওর কথাও সম্ভবত উনি জানেন না। কিন্তু আবার মনে হলো ও-ও জীবনেও ভাবেনি যে ও এরকম একটা পরিবেশে কখনো ওর মৃত চাচার সাথে দেখা হয়ে যাবে।
ওকে তাড়াতাড়ি এখান থেকে ভাগতে হবে। কোনো কথা না বলেই ও ঘুরে ক্রস্ত পায়ে নৌকার দিকে যাওয়া শুরু করলো। এতোটাই আচমকা যে টম ওটাকে ফাঁদ মনে করে ফ্রান্সিস আর মেরিডিউকে গুলি করার নির্দেশ দিয়েই ফেলেছিলো প্রায়।
কিছু একটা উড়ে এলো বাতাসে। সহজাত প্রবৃত্তিবশে ক্রিস্টোফার এক হাত দিয়েই লুফে নিলো জিনিসটা-সেই হীরা ভরা থলে। হাতটা মুঠো করতেই ও থলের পাতলা কাপড়ের ভিতর দিয়ে হীরাগুলোর আকৃতি অনুভব করতে পারলো।
“আমিতো ভুলেই গিয়েছিলাম,” বিস্মিত গলায় বলে উঠলো ক্রিস্টোফার।
“কিন্তু বেড়ার গাছগুলো কাটতে ভুলো না যেন,” টম সতর্ক করে দিলো।
নৌকাটা পানিতে ঠেলে নামাতেই ক্রিস্টোফারের গোড়ালিতে ঢেউ আছড়ে পড়লো। ঠাণ্ডা বাতাস ওর ভাবনা চিন্তাকে পরিষ্কার করতে সাহায্য করলো অনেকটাই। যেনো একটা স্বপ্নের ঘোর থেকে টেনে তুললো ওকে।
“সেটা নিয়ে ভাবতে হবে না। বেড়া খোলা-ই পাবেন।”
*
ক্রিস্টোফার টলতে টলতে নেমে এলো নৌকা থেকে। আসার আগে মাঝিকে একটা স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে এলো মুখ বন্ধ রাখার জন্যে। তারপর পাথর কেটে বানানো সিঁড়িটা বেয়ে উঠে গেলো। ঢেউ থেকে ছিটকে আসা পানিতে পিচ্ছিল হয়ে আছে সিঁড়িটা; ভাবনায় ডুবে থাকায় প্রায় আছাড় খেয়েই বসেছিলো।
ও জোর করে ভাবনাগুলোকে সরিয়ে দিলো। এখনো বিপদমুক্ত না ও। সিঁড়ির মাথার ঘোট দরজাটায় টোকা দিয়ে নিজের নাম বললো ও।
দরজার ছোট জানালাটায় একটা চেহারা দেখা গেলো। “মালটা কেমন?”
ক্রিস্টোফার ভুলেই গিয়েছিলো যে কোন মিথ্যেটা বলে দুর্গ ছেড়ে বেরিয়েছিলো। জোর করে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে বললো, “একেবারে খাসা। তুমিও গিয়ে দেখতে পারো।”
ভারী হুড়কো টেনে খোলার শব্দ পাওয়া গেলো। দরজা খুলতেই ও প্রহরীকেও একটা স্বর্ণমুদ্রা দিলো। দেওয়ার সময় নিজের কোমরে বাঁধা হীরার থলেটার কথা মনে পড়লো। “আংরিয়া যেনো কিছুই না জানে,” সাবধান করে দিলো ও। “ও যদি জানতে পারে যে আমি দুর্গের বাইরে গিয়েছিলাম, তাহলে মেরেই ফেলবে।”
“মেয়েটা নিশ্চয়ই সেই জিনিস। নইলে নিজের গর্দানের ঝুঁকি নিতেন না,” প্রহরী বললো। আরো বিস্তারিত শুনতে চাচ্ছে।
“মধুর চেয়েও মিষ্টি, গোলাপের চাইতেও কোমল!” ক্রিস্টোফার সায় দিলো।
ও দুর্গের একদম চূড়ার মাথায় নিজের ঘরে চলে এলো। লিডিয়া বিছানায় শুয়ে অপেক্ষা করছিলো ওর।
ক্রিস্টোফার ওর হাতকড়া খুলে দিলো। এটা এখন একটা নিয়মিত কার্যে পরিণত হয়েছে : দিনের বেলায় লিডিয়া কয়েদখানায় থাকে, কিন্তু প্রতি রাতে কারারক্ষী ওকে ক্রিস্টোফারের ঘরে দিয়ে যায়। ক্রিস্টোফার কারণটা জানে না, কিন্তু কেন যেন ও যতোটা স্বীকার করে, তার চাইতে বেশি লিডিয়ার সঙ্গ পছন্দ করে। এতোগুলো মাস আর বছর ছদ্মবেশে জালিয়াতি করে চলার পর এততদিনে ও একটু ইংরেজি বলার আর শোনার ফুরসত পেয়েছে। কিন্তু এটা তার চাইতেও বেশি কিছু। লিডিয়ার ভিতরে কিছু একটা আছে যা ক্রিস্টোফারকে টানে। লিডিয়া যেনো একটা আগুনের ফুলকি, যা ওর ভিতরের শুকনো কাগজগুলোতে অগ্নি সংযোগ করেছে।
আর লিডিয়ার মতো করে আর কেউ আদর করতে পারে না। কোনো কিছুতেই বাধা নেই ওর। এমনকি তামান্নাও এতোটা উদ্দাম ছিলো না।
লিডিয়া ক্রিস্টোফারের পিঠ জড়িয়ে ধরলো। তারপর সামন ঝুঁকে ওর হাত ক্রিস্টোফারের দুই পায়ের ফাঁকে উরুতে ঘষতে লাগলো।
ক্রিস্টোফার সাড়া দিলো না।
লিডিয়া কোনো সতী সাধ্বী কেউ না। এর মাঝেই ওর দুটো স্বামী ছিলো, আর গোটা দশেক প্রেমিক ছিলো, কিন্তু ক্রিস্টোফারের মতো করে আর কাউকে ও এতোটা বিলিয়ে দেয়নি। যদিও শুরুতে ওর পুরো ছলাকলাটাই ছিলো নিজেকে বাঁচানোর স্বার্থে, কিন্তু এখন বুঝতে পারছে ক্রিস্টোফার ওকে সত্যিকার ভাবেই আকর্ষণ করে। ও সারাদিন বসে বসে অপেক্ষা করে কখন কারারক্ষী এসে ওকে ক্রিস্টোফারের ঘরে নিয়ে যাবে।
“কিছু হয়েছে নাকি?”
দুশ্চিন্তার মাঝে ক্রিস্টোফার খেয়ালও করলো না যে লিডিয়া কিছু বলেছে। ও নিজেকে লিডিয়ার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে নেপচুন তরবারিটা তুলে নিলো। তারপর ওটার ফলায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে রইলো।
