অনেকগুলো কথা বলেছে ক্রিস্টোফার। হাবিলদার সেগুলো অনুবাদ শেষ করতেই টম নিজের বেল্ট থেকে একটা ছোট থলে নিয়ে বাড়িয়ে ধরলো।
“রাজা শাহুজি এটা দিয়েছেন।” বলে ও থলেটা হাতের উপর ঢেলে দিলো। তারার আলোতেও কাটা হীরাগুলো ঝিকমিক করে উঠলো। ক্রিস্টোফার জুলজুল করে তাকিয়ে রইলো ওগুলোর দিকে।
“যা যা বললে সেটা যদি করেন, তাহলে শাহুজি আপনার দিকটা খেয়াল রাখবেন,” টম বললো। “আপনি
কথা শেষ না করেই থমকে গেলো টম, কারণ ক্রিস্টোফার হীরাগুলো ভালোমতো দেখতে যেই সামনে ঝুঁকেছে তখনই চাঁদের আলো গিয়ে পড়েছে ওর তরবারির হাতলের উপর। হাতলে বসানো মসৃণ পাথরটা থেকে আলো ঠিকরে পড়লো বালিতে, তার নিচেই খাপের ভিতর থেকে দেখা গেলো তরবারিটার সোনার বাঁধানো অংশটা-টম সারাজীবন ধরে এই নকশাটা চেনে। এটা হচ্ছে নেপচুন তরবারি। রাতের কারণে ওটার নীলা পাথরটা এখন নীলচে দেখাচ্ছে, কিন্তু ওটার আকৃতি ও ঠিকই ধরতে পারছে। আর সারাহের দেহের বাকের মতোই ও তরবারিটার ফলার বাকও চেনে; হাতলের ফোলা অংশ, খাপে ভরে রাখার পরেও ওটার বেরিয়ে থাকা তীক্ষ্ণ ডগা-এটা ওরই নীল তরবারি।
ও পারলে তখনি ওটা কেড়ে নিতো। “এই তরবারি আপনি কোথায় পেয়েছেন?” প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো টম।
ক্রিস্টোফার সোজা হয়ে ওর ডান হাতটা হাতলে রাখলো। “লড়াই করে জিতেছি।”
কথাটা বলার আগেই টম বুঝে গেলো কেন একে চেনা চেনা লাগছিলো। সব জট খুলে গেলো ওর। এই লোকটাকেই ও রানির মহলে দেখেছিলো। এ ই ওর কামানগুলোকে উদ্ধার করেছিলো, ক্যাপ্টেন হিকসকে মেরেছিলো। আর কিভাবে কিভাবে আবার এই টিরাকোলার দুর্গে এসে হাজির… আর ওর কাছে এখন নেপচুন তরবারি।
টম তরবারিটার দিকে তাকিয়ে রইলো। ব্রিঞ্জোয়ান থেকে ফিরে আসার পর, ও প্রায় আশা ছেড়েই দিয়েছিলো। জানতে যে তরবারিটা হারানোর দুঃখ ভুলতে ওর অনেকদিন লাগবে। কিন্তু ওটা আর ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, এটা মনকে বুঝিয়ে ফেলেছিলো। তবে আবার ওটাকে দেখা যাচ্ছে। হাতের নাগালেই।
টম জানে যে ওর চুপ থাকা উচিত, কিন্তু পারলো না।
“ওটা আমার তরবারি,” হিস হিস করে বলে উঠলো ও। “ওটার মালিক ছিলো আমার বাবা, তার আগে আমার দাদা, তার আগে তার বাবা।”
ক্রিস্টোফার টমের দিকে তাকিয়ে রইলো। “আপনার বাবার?” ইংরেজিতেই বলে ফেললো ও। কিন্তু দুজনেই এমন হতবাক যে কেউই খেয়াল করলো না ব্যাপারটা। এতো বড় ধাক্কা খেয়েছে ক্রিস্টোফার যে কথাটা হজম করতে পারছে না।
ক্রিস্টোফার নিজেকে সামলে নিলো। “তরবারিটা আমার,” যতোটা সম্ভব বিনয়ের সাথে বললো ও। “গোলকোন্দা খনির সমস্ত হীরার বিনিময়েও এটা হাতছাড়া করবো না আমি।”
টমের মনে ঝড় বইতে লাগলো। ওর সাথে হাবিলদার আছে। দুজন মিলে একে কাবু করতে পারবে। আর তাছাড়া ফ্রান্সিস আর মেরিডিউ-ও উপর থেকে রাইফেল তাক করে রেখেছে এদিকে। একবার ডাক দিলেই ডাকাতটা মারা পড়বে। তরবারিটা আবার দখলে চলে আসবে ওর।
ও আদেশটা দেওয়ার জন্যে মুখ খুললো। কিন্তু ভিতরে থেকে কেউ যেনো ওকে সাবধান করলো যে কাজটা ঠিক হবে না। ও হয়তো তরবারিটা পাবে, কিন্তু যা হারাবে তা সারাজীবন কেঁদেও আর ফিরে পাবে না। কিন্তু তরবারিটা ওর চোখের সামনে, ওটার নীলাটার ধারগুলোয় তারার আলো প্রতিফলিত হচ্ছে, যেনো ওকে চোখ টিপছে। ও এটাকে হারিয়ে ফেলেছিলো, কিন্তু ভাগ্যের ফেরে আবার এটাকে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা হয়েছে। ও কি ধরনের মানুষ যে এরকম একটা সুযোগ হেলায় ছেড়ে দেবে? এটা ওর উত্তরাধিকার-আর তাছাড়া সমস্ত কোর্টনী পরিবারের ইজ্জত আর সম্মান জড়িয়ে আছে এর সাথে।
ক্রিস্টোফার বুঝলো যে কিছু একটা সমস্যা আছে। ও এক পা পিছিয়ে গেলো; হাত তরবারির হাতলের উপর। অবশ্য দক্ষ বন্দুকবাজের হাত থেকে এতে ও রক্ষা পাবে না। টম লম্বা একটা দম নিলো যাতে চিৎকার করে পাহাড়ের উপরে ফ্রান্সিস আর মেরিডিউকে আদেশটা দিতে পারে।
কিন্তু ও আদেশটা দিতে পারলো না। টমের বাস্তব বুদ্ধি ওকে সেটা করতে দিলো না। ও যদি একে মেরে ফেলে, তাহলে জাহাজের বেড়া কেউ খুলবে না-দুর্গটাও জয় করা সম্ভব হবে না। আর তাহলে সম্ভবত টম জীবনেও আর সারাহ বা অ্যাগনেসকে দেখতে পাবে না।
ওর সবচে ভালোবাসার রমণীকেই যদি ও নিরাপদে উদ্ধার করতে না পারে, তাহলে কোর্টনীদের ইজ্জত সম্মান তখন কোথায় যাবে?
টম মুখটা বন্ধ করে ফেললো। হঠাৎ মনে হলো ঢোক গিলতে কষ্ট হচ্ছে। ওর। লজ্জা লাগছে খুব, একই সাথে স্বস্তিও পাচ্ছে এই ভেবে যে গুলি করার আদেশ দেয়নি।
“আংরিয়ার দুজন বন্দী আছে,” টম বললো। “ইংরেজ মহিলা। ওদের কথা জানেন কিছু? ওরা কেমন আছে?”
তরবারির হাতলে ক্রিস্টোফারের মুঠো ঢিল হলো। ও জানে না টম কেনো থেমে গেলো, তবে বিপদ যে আসছে সেটা ঠিকই আঁচ করতে পেরেছিলো।
“হ্যাঁ,” নিচু স্বরে বললো ও। “হ্যাঁ, মহিলা দুজন এখনো ভালো আছেন। তবে একজনের…”
ও প্রায় বলেই দিয়েছিলো যে পেটে বাচ্চা। কিন্তু বললো না। গত পাঁচ মিনিটে বেশ কয়েকবার ওর ভাগ্য বদল হয়েছে। সবকিছু বুঝে উঠতে ওর কিছু সময় দরকার। আগেই সব বলে দেওয়া ঠিক হবে না। পরে কাজে লাগতে পারে।
“স্বাস্থ্য একটু খারাপ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কোনো সমস্যা নেই, আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললো ক্রিস্টোফার।
