“কে খবর পাঠিয়েছে।”
“এক জেলে নিয়ে এসেছে খবরটা। সে বলেছে যে খবর দিয়েছে আংরিয়ার খুব কাছের লোক। সে নাকি টাকার সন্ধানে আংরিয়ার কাছে ভিড়েছিল, কিন্তু এখন নাকি বুঝতে পেরেছে যে আংরিয়ার সাথে বেই করেও টাকা কামাতে পারবে ও।”
“এরকম একটা লোককে কি বিশ্বাস করা ঠিক?”
“আমরা ওর বিশ্বাস কিনে নেবো,” শাহুজি একটা ছোট রেশমের ডাল টেনে নিয়ে হাতের তালুর উপর ঢাললেন। এক মুঠো কাটা হীরা তার হাতের চামড়ার উপর ঝিলিক মেরে উঠলো।
“কিভাবে কথা হবে লোকটার সাথে?”
“লোকটার পক্ষে কারো চোখে না পড়ে ডাঙা দিয়ে আমাদের কাছে আসা সম্ভব না। কিন্তু পাহাড়ের গোড়ায় নাকি পানিতে নামার জন্যে একটা পথ আছে। ওদিক দিয়ে আংরিয়া রসদপত্র আনা নেওয়া করে। কাল রাতে সেই লোকটাকে উপকূল ধরে একটা সৈকতে নিয়ে আসবে। আপনি গিয়ে তার সাথে কথা বলবেন।”
“যদি পুরোটাই একটা ফাঁদ হয়?”
শাহুজি হাতের মুঠো গোল করে আবার হীরা গুলো থলেটার ভিতর রেখে দিলেন। “সেরকম কিছু হলে, কি করতে হবে সেটা আপনি নিশ্চয়ই করতে পারবেন।”
*
পরের রাতটা ছিলো বেশ শান্ত আর পরিষ্কার। ক্ষয়ে যাওয়া একটা চাঁদ ঝুলে আছে আকাশে। বালি আর ঢেউয়ের ফেনার উপর তারার আলো পড়ে চিকচিক করছে। সৈকত ছেয়ে থাকা পাম গাছগুলোর একাটায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে টম। সাগর থেকে কেউ তাই ওর দিকে নিশানা করতে পারবে না। ছোট উপসাগরটার দুই পাশ জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা পর্বতশ্রেণির দিকে তাকালো ও একবার। ফ্রান্সিস আর মেরিডিউ আছে ওখানে। হাতে ফ্লিন্টলক বন্দুক। ম্যাচলকের আলো অন্ধকারে দেখা যেতে পারে।
“আপনার কি মনে হয় যে ও আসবে?” মোহিত নামের সেই হাবিলদার বললো। টমের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সে। ও নিজের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উর্দি ফেলে দিয়ে এখন ধুতি পরে আছে। হাতে একটা জৈত্রি (লাঠির মাথায় কাটা যুক্ত বল বেঁধে তৈরি করা অস্ত্র)। শাহুজির অস্ত্রভাণ্ডারের ভিতর থেকে খুঁজে বের করেছে।
সাগরের ভিতর থেকে কিছু একটা চি চি করে ডেকে উঠলো। এতো আস্তে যে ঢেউয়ের শব্দের আড়ালে প্রায় শোনাই যায় না। কিন্তু টমের সমস্ত ইন্দ্রিয় টানটান হয়ে আছে। ও অন্ধকারের ভিতর দিয়ে দেখার চেষ্টা করতে লাগলো। একটু পরেই সাগরের বুকে একটা আবছা কাঠামো চোখে পড়লো। ওটা একটা ছোট নৌকা। ভারতীয়রা এগুলোকে মাসসুলা বলে। এতো হালকা আর ছোট যে একটা ঢেউ-ই ওটাকে ঠেলে সৈকতে নিয়ে আসার জন্যে যথেষ্ট।
দুজন লোক লাফ দিয়ে নেমে ওটাকে টেনে বালিতে এনে রাখলো। একজন নৌকার পাশেই বসে থাকলো; আর একজন বুক ফুলিয়ে সোজা গাছের সারির দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো। একজন ভারতীয় হিসেবে অনেক লম্বা লোকটা। প্রায় টমের সমান বলা যায়। তারার আলোয় টম বুঝলো লোকটার মুখ ভরা দাড়ি গোফ। মাথায় পাগড়ি আর কোমরে একটা তরবারি ঝুলছে।
টমের একে আগে কখনো দেখার কোনো সম্ভাবনাই নেই। কিন্তু তবুও, এই অন্ধকারেও ওর লোকটার কিছু একটা চেনা চেনা মনে হতে লাগলো। মেরুদণ্ড বেয়ে একটা শিহরণ বয়ে গেলো ওর। জঙ্গলের ভিতর সেই জলার ধারে বাঘ খোঁজার সময়েও এমন লেগেছিলো। ও লোকটার চেহারা দেখার চেষ্টা করলো, কিন্তু তা অন্ধকারে ঢেকে আছে।
“কি নাম আপনার?” কর্কশ কণ্ঠে জানতে চাইলো মোহিত।
“রুদ্র।”
“ওকে জিজ্ঞেস করেন কিভাবে ও ফটকটা খুলবে,” টম মোহিতকে বললো।
ক্রিস্টোফার টমের গলা শুনে এতোটাই বিস্মিত হয়েছে যে ও আর একটু হলেই ইংরেজিতে জবাব দিয়ে বসেছিলো। ও শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে হাবিলদারের অনুবাদ শোনার ভান করলো। ওর মনের ভিতর ঝড় চলছে। গাছের আড়ালে থাকার কারণে লোকটার চেহারা ছবি কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু তবুও ওর মনে হচ্ছে যে ও লোকটাকে চেনে। ইনি কি বোম্বের কেউ নাকি?
ওরা ক্রিস্টোফারের উত্তরের অপেক্ষা করছিলো। “আমি সদর দরজা খুলতে পারবো না। ওগুলোয় পাহারা খুব কড়া। আর আপনারা আগানো শুরু করলে সবাই দেখতে পাবে।”
“তাহলে?” টম অধৈর্য গলায় বললো। “আমাদেরকে এখানে টেনে আনার মানে কি?”
আবারও ক্রিস্টোফার জোর করে হাবিলদারের অনুবাদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলো। অবশ্য এতে করে সামনের ইংরেজ লোকটাকে আরো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেলো ও। লোকটা লম্বা, চওড়া কাঁধ, দাড়ি আর চুল দুটোই কালো। আত্মবিশ্বাসী হুকুম করে অভ্যস্ত। ঠিক ওর নিজের মতোই সব বৈশিষ্ট্য।
তারপর আচমকাই ও ধরে ফেললো লোকটা কে। টম উইল্ড, যে তাকে ব্রিথ্রোয়ানে পরাজিত করেছে; এনাকে সর্বশেষ দেখেছিলো দুর্গের ভেঙে পড়া
ফটকের উপরে। যার তরবারি এখন ওর কোমরে ঝুলছে। ইনি এখানে কিভাবে এলেন?
উইল্ড-ও একইভাবে ক্রিস্টোফারকে মন দিয়ে দেখছে। উনি কি ওকে চিনে ফেলেছেন? নাকি এটা সেই পুরনো চেনে চেনা ভাব?
“আংরিয়া তার জাহাজগুলো দুর্গের উত্তরে একটা উপসাগরে নোঙ্গর করে রাখে, ওগুলোর চারপাশে গাছের গুঁড়ির বেড়া দিয়ে ঘেরা,” ক্রিস্টোফার বললো। জোর করে কণ্ঠ শান্ত রাখছে, সেই সাথে মাথা-ও নিচু করে থাকলো যাতে ওর চেহারা ছায়ার ভিতর থাকে।
“আমরা সেটা জানি।”
“তিন রাত পরেই অমাবস্যা। আমি গাছের গুঁড়ির বরগাগুলো কেটে দেবো। ভাটার টানে জাহাজগুলো ভেসে যাবে। আপনারা ছোট ছোট নৌকা নিয়ে গিয়ে জাহাজগুলো পুড়িয়ে দিতে বা যেটা ইচ্ছে করতে পারবেন। জাহাজ ছাড়া সে রসদপত্র জোগাড় করতে পারবে না। ভালো হয় যদি আপনার আপনাদের নিজস্ব গ্রাব আর গালিভাতগুলো নিয়ে আসতে পারেন। তাহলে ওগুলোর কামান দিয়ে ডাঙার দিক থেকে যারা আসবে তাদের সামলাতে পারবেন। আংরিয়ার শহীদ হওয়ার বিন্দুমাত্র খায়েশ নেই। যদি ও বুঝতে পারে যে জেতার সম্ভাবনা নেই তাহলে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করবে। ভারতীয়রা এটাই পছন্দ করে।”
