ওখানে যে শুধু ওর একারই এরকম লাগছে, তা কিন্তু না। বেশ কয়েকজন দস্যুই অসন্তোষ প্রকাশ করা শুরু করেছে, প্রথমে ফিসফিস করে হলেও ইদানীং আংরিয়ার সামনেই বলে উঠছে কেউ কেউ। ওরা জানে যে মারাঠাদের পক্ষে দুৰ্গটা দখল করা সম্ভব না। এটা অজেয়, দুর্ভেদ্য। এর একটা কারণ হচ্ছে, সমুদ্রপথে ওরা অফুরন্ত রসদপত্র জোগাড় করতে পারবে। ফলে অনাহার বা অন্য কোনো ভয় ওদের নেই। কিন্তু তাহলে কেন ওরা খামাখা বসে না থেকে নিজেদের রুজির সন্ধানে বের হবে না?
ক্রিস্টোফার এ ব্যাপারে কিছু একটা করবে বলে ঠিক করলো।
বেশিরভাগ জেলেরই মাছ দেওয়া শেষ। আবার নিজেদের জালের কাছে। ফিরে যাচ্ছে। এখন যে মাছগুলো ধরা পড়বে সেগুলো ওরা সন্ধ্যায় মারাঠাদের কাছে বিক্রি করবে। ওদের কাছে যুদ্ধ বেঁধে বরং ভালোই হয়েছে। আয় ইনকাম বেড়েছে। মাছ ভরা পিপাগুলো একটা কপিকলে করে দুর্গের দেয়ালের পাশ দিয়ে উপরে তুলে নেওয়া হচ্ছে।
অন্যান্য দস্যুরা আবার দুর্গের ভিতরে নিজেদের জায়গায় ফিরে গেলেও, ক্রিস্টোফার দাঁড়িয়ে থেকে মাঝির সাথে কথা বলতে লাগলো।
সবাই চলে গেলে ক্রিস্টোফার এক জেলেকে একপাশে টেনে নিলো। ও জানে এই জেলেটাকে ভরসা করা যায়। কারণ গত এক সপ্তাহ ধরে লোকটা মাছের অতিরিক্ত দাম নেওয়ার পরেও, ক্রিস্টোফার তেমন কিছুই বলছে না। কারণ লাভের ভাগ ও নিজেও পাচ্ছে। এখন ক্রিস্টোফার ওকে পাহাড়ের গোড়ায় এমন এক জায়গায় নিয়ে গেলো যেখানে ঢেউ আছড়ে পড়ার শব্দে ওদের কথোপকথন শোনা যাবে না।
“আজ মারাঠাদের ওখানে যাবেন?”
জেলে মাথা ঝাঁকালো।
“তাহলে আমার পক্ষ থেকে ওদেরকে একটা খবর পৌঁছে দিতে হবে।”
ক্রিস্টোফার ওর কথাটা বললো, তারপর জেলের কাছ থেকে দুইবার শুনলো। কাগজে লিখে দেওয়ার দুর্বুদ্ধি করলো না।
“যদি ধরা খান, আমি কিছুই স্বীকার করবো না। আর যদি আমার সাথে বেঈমানি করেন, তাহলে আপনার পুরো পরিবারকে খুঁজে বের করে আপনি মাছের পেট যেভাবে ফাড়েন সেভাবেই ফেঁড়ে ফেলবো। বোঝা গিয়েছে?”
জেলে কাঁপতে শুরু করলো। ক্রিস্টোফার হেসে ওর কাধ চাপড়ে দিলো।
“যদি সব ঠিকঠাকমতো হয়, তাহলে দুজনেই লাভ ভাগ করে নেবো। আপনাকে আর জীবনেও মাছ ধরে খেতে হবে না।”
*
সেই রাতে শাহুজি টমকে নিজের তাঁবুতে ডেকে নিলেন। তাঁবুটা দুর্দান্তভাবে বানানো হয়েছে। একজন রাজার জন্যে উপযুক্ত। তাঁবুর ভিতরে আবার ভারী রেশমের পর্দা ফেলে কয়েকটা ঘরে ভাগ করা হয়েছে। সেগুলোর ভিতরে মেহগনি কাঠের দামি সব আসবাব। কোনায় কোনায় সুগন্ধী ধূপ জ্বলছে, ফলে বাইরের দুর্গন্ধ ভিতরে প্রবেশ করতে পারছে না। ভিতরে ঢোকার পর এটা যে যুদ্ধক্ষেত্র সেটাই বোঝার কোনো উপায় থাকলো না। শুধু কামানের গোলার শব্দই মনে করিয়ে দিচ্ছে সেটা। প্রতিবার গোলা ছোঁড়া হতেই তাবুটা কেঁপে ওঠে। তাবুর ভিতরের স্বর্ণের থালা আর গ্লাসগুলোও কাঁপতে থাকে সেই সাথে।
“অগ্রগতি কেমন আমাদের?” রাজা জিজ্ঞেস করলেন।
“দেয়ালের ফাটল বাড়ছে,” টম জবাব দিলো! “কাজটা অনেক আস্তে আস্তে হচ্ছে-দেয়ালগুলো একেকটা পনেরো ফুট পুরু। তবে একটু একটু করে হলেও ভেঙে পড়বে যে কোনো সময়।”
“বেশি দেরি হয়ে যাচ্ছে,” শাহুজি বললেন। “ব্রিঞ্জোয়ান থেকে যে গোলা বারুদ এনেছিলেন তাতে আর বেশিদিন চলবে না। আমার সৈন্যবাহিনি ওদের বাড়ি ছেড়েছে অনেকদিন। গত সপ্তাহেও যারা লড়াই করতে মুখিয়ে ছিলো আজ তারা বাড়ির জন্যে বেজার হয়ে আছে।”
“দস্যুদের গুপ্তধনের চেহারা দেখলেই ওদের সব অভিযোগ চলে যাবে।”
“যদি শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়, তাহলে।”
টমের চোখ সরু হয়ে গেলো। অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ও এই ভয়টাই করে আসছিলো : শাহুজি একসময় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন বা টমের উপর আর ভরসা করতে পারবেন না।
“আপনি কি অবরোধ ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন, মহামান্য?”
শাহুজি এক বাটি খেজুর টেনে নিলেন। তারপর একটা খেজুর মুখে পুরে রূপার একটা বাটিতে আঙুলের মাথাটা ধুয়ে নিলেন!!
“আমি শুনেছি আপনার দেশে নাকি লড়াই শুরু হলে মরার আগ পর্যন্ত চলতে থাকে,” শাহুজি বললেন।
টমের ব্লেনহেইম-এর যুদ্ধের কথা মনে পড়লো। কয়েক বছর আগেই যুদ্ধটা হয়েছিলো ফ্রান্স, ব্রিটেন আর রোমান সাম্রাজ্যের মাঝে। কেপ টাউনে বসে ও যা শুনেছে তা হচ্ছে ফ্রেঞ্চদের নাকি প্রায় তিরিশ হাজার সৈন্য মারা গিয়েছে, যা কিনা ওদের পুরো সৈন্যবাহিনির অর্ধেকেরও বেশি। টম মাথা ঝাঁকালো।
“ভারতে আমাদেরকে সেই তুলনায় সভ্য বলতে পারেন,” শাহুজি বললেন। “বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন আরকি। আমাদের মহামুণি কৌটিল্য বলেছিল যে বল প্রদর্শনের চাইতে ষড়যন্ত্র করে যুদ্ধে জেতা সহজ। সামনে দাঁড়িয়ে ধাক্কাধাক্কি করার কি দরকার যদি কেউ তোমার জন্যে পিছনের দরজা দেয়?”
টম বুঝতে পারলো শাহুজি কি বোঝাতে চাচ্ছেন। “আপনার কি মমে পড়ে যে টিরাকোলায় সেরকম কেউ আছে?”
শাহুজি মাথা ঝাঁকালেন। আমাকে একজন একটা খবর পাঠিয়েছে।
কোর্টনীরা কখনোই এভাবে প্রতারণার মাধ্যমে কিছু লাভ করতে আসে না। তবে টম ওনার কথাটার মর্মার্থ ধরতে পারলো। যদি দুর্গটা মুখোমুখি ছাড়াই দখল করে নেওয়া যায়, তাহলে খুব বেশি হতাহত হবে না আর। অ্যাগনেস আর সারাহকে অক্ষত ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা-ও বাড়বে।
