কাইফেন আক্রোশে মোচড়ামুচড়ি করতে করতে মুখের রুমাল ঠেলে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু টম আবার ওটাকে ভিতরে ঠেলে ঢুকিয়ে দিয়ে কাইফেনের কোমর থেকে বেল্ট খুলে ওর মুখে লাগিয়ে দিলো।
“কাজ শেষে ছেড়ে দেবো আপনাকে। হাবিলদার সাহেব আমাকে সাহায্য করছেন, তবে আপনার যদি মনে হয় যে আমি কামানগুলো একা সরাতে পারতাম না, তাহলে সাবধান করে দিচ্ছি। যদি আমাকে সাহায্য করেছে সন্দেহে কোনো সিপাহীর গায়ে একটা আঙুলও তোলা হয়, আমি কিন্তু সে খবর পাবো। আর আমি তার শোধ তুলবোই। রানি মিস্টার ফয়কে কি করেছিলো মনে আছে তো? আমি আপনার যে অবস্থা করবো, তার তুলনায় সবাই বলবে ওটা কিছুই না। বোঝা গিয়েছে?”
কাইফেন মোচড়ামুচড়ি বন্ধ করে অসহায় চোখে মাথা ঝাঁকালো।
“মিসেস ফয়কে আপনার শুভেচ্ছা পৌঁছে দেবো,” টম আশ্বস্ত করলো ওকে।
*
কামানের মুখ থেকে আগুন বেরিয়ে এলো। টেলিস্কোপ দিয়ে টম দেখতে পেলো গোলাটা দুর্গের ফটকের বামে গিয়ে আঘাত করলো। জায়গাটা আগের গোলার আঘাতে খানিকটা ভেঙেই ছিলো, এখন আরো খানিকটা পাথর টুকরো হয়ে গড়িয়ে পড়লো। গোলন্দাজের নির্ভুল নিশানার প্রশংসা করতেই হয়। পিছনেই টম শুনতে পেলো মেরিডিউ মারাঠা গোলন্দাজদের চিৎকার করে। উৎসাহ দিচ্ছে। “ওয়ার্ম এন্ড স্পঞ্জ। পাউডার।” ওর প্রশিক্ষণে এর মধ্যেই ওদের গোলা ভরার সময় দশ থেকে পাঁচ মিনিটে নেমে এসেছে। দস্যুদের দুর্গের ভিতর ঢুকতে পারলে কি কি গুপ্তধন পাওয়া যাবে সেসব গল্প সৈন্যদেরকে শুনিয়েছে মেরিডিউ। তাতেই ওদের উৎসাহ বেড়ে গিয়েছে বহুগুণ।
ব্রিঞ্জোয়ান থেকে উদ্ধার করে আনা কামানগুলো নিয়ে শাহুজির সৈন্যদল এখানে এসে হাজির হয়েছে আজ পাঁচ সপ্তাহ। পাঁচ সপ্তাহ ধরেই ওই পুরু দেয়ালগুলো ভাঙার চেষ্টা করে যাচ্ছে ওরা। এতো বেশি লোকজন এই দুৰ্গটাকে অজেয় বলেছে যে আর একটু হলে টমও কথাটা বিশ্বাস করে বসতো। কিন্তু এখন ধৈর্য ধরে সময় নিয়ে ওটার দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করার পর মনে হচ্ছে আশা ছাড়া ঠিক হবে না।
এটা সত্যি যে সমুদ্রপথে যে কোনো আক্রমণই বৃথা যাবে। খাড়া গিরিখাতটার গোড়ায় কোথাও এক চিলতে জায়গা নেই যেখানে একটা ঘাট বানিয়ে জাহাজ ভেড়ানো যাবে। আর আংরিয়া যেখানে ওর জাহাজের বহর ভিড়িয়ে রাখে তার চারপাশে কাটা গাছে ফেলে রেখেছে। ওখানে যাওয়া সম্ভব না। এছাড়া প্রবাল প্রাচীরে এখানকার পানি ভরা। জোয়ারের সময় দেখা যায় না। ফলে পানি নেমে গেলেই, দুর্গে বোমা বর্ষণ করতে আসা জাহাজগুলো ভয়ানক বিপদে পড়ে যায়।
ডাঙার দিক দিয়েও এটা আক্রমণ করা দুরূহ। দুর্গের ফটকের সামনের শৈল অন্তরীপটা খুব বেশি সরু। ফলে ওদিক দিয়ে আসতে গেলে ফটকে বসানো হালকা কামানগুলোর মুখোমুখি না হয়ে আসার উপায় নেই। দুর্গের দেয়াল ঘেঁষে ঘন কাটা ঝোঁপ জন্মে আছে। ওগুলো শুধু যে আক্রমণকারীদের আহত করে তা-ই না, ওগুলোর কণ্টকময় ডালগুলো কামানের গোলার আঘাত অনেকটা চুষে নেয়। ফটক থেকে চার ফুট লম্বা লোহার কাটা বেরিয়ে আছে বাইরে। ফলে হাত দিয়ে গুতো মেরেও ফটক খোলা সম্ভব হবে না।
কিন্তু এর বাইরে প্রতিরক্ষাকে সুসংহত করার আর কোনো চেষ্টা করা হয়নি। দুর্গ থেকে আধা মাইলটাক দূরে একটা ছোট পাহাড় আছে। ওখান থেকে চাইলেই দুর্গে গোলা ছোঁড়া যায়। পাহারার জন্যে আংরিয়া ওখানে একটা ছোট মিনার বসিয়েছিলো। তবে সেটা বসানোর উদ্দেশ্য ছিলো সমুদ্রে জাহাজ আছে কিনা তা দেখা। শাহুজির গোলন্দাজেরা এক বোমায় খুঁড়িয়ে দিয়েছে সেটাকে। তারপর পাহাড়ের চূড়ার দখল নিয়ে, মাটিতে গর্ত খুঁড়ে, তাতে মাচা বানিয়ে কেস্ট্রেল-এর নাইন পাউন্ডারগুলো বসিয়ে দিয়েছে। এরপর থেকে দিন রাত সর্বক্ষণ বোমা মেরেই চলেছে। আর ইঞ্চি ইঞ্চি করে ওদের প্রতিবন্ধকতা গুঁড়িয়ে পড়ছে।
টম প্রার্থনা করলো এটুকুই যেনো যথেষ্ট হয়।
*
শৈল অন্তরীপের গোড়ার জেটিটায় জেলেরা তাদের সারা দিনের শিকার নৌকা থেকে নামাচ্ছে। অবরোধের কারণে ওরা মাছের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ভালোই। কারণ দেয়ালের দুই পাশেই আগ্রহী ক্রেতা কম নেই। একটা নতুন ফসলের মাঠে পাখিরা যেভাবে ভীড় করে নৌকাগুলোও প্রতি সকালে সেভাবে এসে জড়ো হয়। কামানের গোলার আওয়াজ এখান থেকে শুনলে দূরে কোথাও বজ্রপাতের আওয়াজের মতো মনে হয়।
শব্দটা এখন কানে এতোটা সয়ে গিয়েছে যে নৌকা থেকে মাছগুলো নামানো তদারকি করার সময় ক্রিস্টোফারের ওগুলো আর খেয়ালই হলো না। একটা ঢেউ এসে পাথরে আছড়ে পড়তেই ওর মুখে এসে পানির ছিটা লাগলো। সমুদ্রে দেখা গেলো একটা সওদাগরি জাহাজের পাল ধীরে সুস্থে উপকূল ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। ওটার নির্ভীক চলে যাওয়া দেখে এক অক্ষম আক্রোশে ছেয়ে গেলো ক্রিস্টোফারের মন। মারাঠাদের সমুদ্রের দিক থেকে দুৰ্গটা আক্রমণ করার সামর্থ নেই। কিন্তু তবুও আংরিয়া জাহাজগুলোকে বের করতে দেবে না। ওর নাকি দুৰ্গটা রক্ষা করতে সকল লোক আর কামানের দরকার হবে। তাই জাহাজের বহর এখনো গাছের গুঁড়ির বেষ্টনীর এপাশেই নোঙর করে আছে। আর স্থানীয় সওদাগরেরা কোনো ভয় ছাড়াই ব্যবসা করে যাচ্ছে।
ক্রিস্টোফার টিরাকোলাতে এসেছে শুধুমাত্র ধনী হওয়ার আশায়। আর এখন যেহেতু জাহাজ নিয়ে বের হওয়া যাচ্ছে না, আর কোনো লুটপাট বা ডাকাতির সুযোগও নেই, তাই বর্তমান জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া অকর্মণ্যতা আর টাকা পয়সার কমতি ওর মাথা গরম করে দিচ্ছে।
