টম ওকে চিনতে পারলো। অবরোধের পরেও বেঁচে যাওয়া সিপাহীদের একজন। ও লোকটার নাম মনে করার চেষ্টা করলো। “আকাল?”
টম ওকে চিনতে পারায় প্রহরীর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। “স্বাগতম সাহেব।”
“নতুন গভর্নর এসে গিয়েছেন?”
“তিন সপ্তাহ আগে এসেছেন।” দাঁত বের করে বললো আকাল। যেনো এটা খুব হাসির কিছু। “তবে আমার মনে হয় না উনি আপনাকে দেখে খুশি। হবেন।”
“তাহলে এখনি আমাকে তার কাছে নিয়ে যাও।”
দুৰ্গটা পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে। এখনো পুরো শেষ হয়নি। বেশ কয়েকজন অর্ধনগ্ন শ্রমিককে দেখা গেলো পাথর, ইট-সুরকি আনা নেওয়া করছে। এখনো ফটকটা পুরো নির্মাণ শেষ হয়নি। তবে টম যে গভর্নরের বাড়িটা ভেঙে ফেলেছিলো, সেটা আবার নির্মাণ শেষ। এবার খড় পাতার বদলে ইট আর টাইলস দিয়ে ছাদ বানানো হয়েছে দেখে খুশি হলো ও। শেষমেশ শিক্ষা হয়েছে তাহলে।
গভর্নরের অফিসের দরজায় কোনো প্রহরী দেখা গেলো না। “বাইরেই থাকো,” টম আকালকে বললো। “তুমি যে আমাকে ঢুকতে দিয়েছো এটা ওর না জানাই ভালো।”
দরজায় নক না করেই ভিতরে ঢুকে পড়লো টম। গভর্নরের ডেস্কে কাগজপত্র জমে পাহাড় হয়ে আছে। তবে সেগুলো নিশ্চয়ই জরুরি কিছু না। কারণ গভর্নরকে দেখা গেলো পাশেই একটা ছোট বিছানায় শুয়ে আছেন। আধো ঘুমে রত উনি, বুকের কাছে একটা ওয়াইন ভরা গ্লাস ধরা। কিছু চলকে পড়ে ওনার সাদা জামার উপর লম্বা একটা দাগ সৃষ্টি করেছে, দেখে মনে হচ্ছে কেটে গিয়েছে।
টম দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিলো। গভর্নর চমকে উঠে ঘুম ভেঙে উঠে বসলেন। আরো ওয়াইন চলকে পড়লো ঝাঁকিতে। টমের দিকে হা করে তাকিয়ে রইলেন উনি।
“মিস্টার উইল্ড, চি চি করে বললেন গভর্নর।
টম চেহারা কালো করে মাথা ঝাঁকালো। ও যে অবাক হয়েছে সেটা প্রকাশ। করলো না। “মিস্টার কাইফেন।”
“কি-আহ-কেন…?” কাইফেন টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালো।
“আমার কামানগুলো নিতে এসেছি,” সরাসরি বলে দিলো টম। “যে নাইন পাউন্ডারগুলো রানি জাহাজ থেকে উদ্ধার করেছিলো। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যেগুলো কোম্পানি তুলে এনেছে।”
কাইফেন হতবাক হয়ে ওর দিকে চেয়ে রইলো।
“আপনি কি এখন বলবেন নাকি যে ওগুলো আপনার সম্পত্তি?” জিজ্ঞেস করলো টম। “কোম্পানির জন্যে এতো কিছু করলাম। এখন আপনি অন্তত আমাকে আমার জিনিস ভালয় ভালয় নিয়ে যেতে দিন।”
কাইফেন অবশেষে বাকশক্তি ফিরে পেলো। “হাবলাদার, “ চিৎকার করলো
দরজা খুলে গেলো। টম ঘুরে তাকিয়ে আর একটা পরিচিত মুখ দেখতে পেলো। সেই গোফওয়ালা সার্জেন্ট। অবরোধের সময় একসাথে লড়াই করেছিলো ওরা। হাবিলদারের ভ্রু কুঁচকে গেলো। সে কোমর থেকে পিস্তল বের করে টমের দিকে তাক করে ধরলো।
“এই লোকটা একজন খুনী, একটা চোর, জালিয়াত! লন্ডন আর বোম্বে দুই জায়গাতেই তার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে, কো কো করে বললো কাইফেন। “এখনি বন্দী করো একে।”
হাবিলদার টমের দিকে চেয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে গোঁফে তা দিতে লাগলো। তারপর পিছনে ফিরে ওর লোকেদের কিছু একটা আদেশ দিলো। ঘরের বাইরের ত্রস্ত পদশব্দ শুনতে পেলো টম।
টমের মনের মধ্যে চিন্তার ঝড় বইছে। ওর নিজের পিস্তল আছে, জুতোর ভাজে একটা ছুরিও আছে। কিন্তু হাবিলদারের উদ্যত পিস্তলের চাইতে দ্রুত ও পিস্তল বের করতে পারবে না।
“মিসেস হিকস আর আমার স্ত্রীকে আংরিয়ার হাত থেকে উদ্ধার করতে আমার ঐ কামানগুলো লাগবে,” টম কাইফেনকে বললো। “আর ওরা ঐ শয়তানের হাতে ধরা পড়েছিলো আপনার জন্যেই। আপনি যখন পালাচ্ছিলেন, তখন আমি এখানে বসে আপনার এই দামী কুঠি জীবন দিয়ে আগলে রেখেছিলাম।”
দুজন সিপাহী করিডোর দিয়ে ভিতর প্রবেশ করলো। দুজনের হাতেই হাতকড়া। টমের কিছুই করার নেই। ও নিজের হাত বাড়িয়ে দিলো। “এভাবেই কি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে?”
কাইফেন জবাব দিলো না। টমের কথা শেষ না হতেই হাবিলদার ওর পিস্তলের নিশানা টমের দিক থেকে কাইফেনের দিকে সরিয়ে নিলো। একই সময়ে সিপাহী দুজন টমকে ছাড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে কাইফেনের হাত জোর করে টেনে ধরে হাতকড়া পরিয়ে দিলো। হাতকড়ার অন্য প্রান্তটা আটকালো চেয়ারের হাতলের সাথে।
“এটা কিন্তু বিদ্রোহের শামিল,” চেঁচিয়ে উঠলো কাইফেন। “গভর্নর কোর্টনী যখন সব শুনবেন
“তাতে আমার প্রতি গাই-এর ধারণা এক কণাও পরিবর্তন হবে না, উল্লসিত কণ্ঠে বললো টম। ও কাইফেনের কোটের পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে কাইফেনের মুখে গুঁজে দিলো, যাতে আর ঘ্যানঘ্যান না করতে পারে। তারপর হাবিলদারকে জড়িয়ে ধরলো।
“ধন্যবাদ, বন্ধু,” টম বললো। “যদিও এটা করা ঠিক হলো না। ওরা আপনাকে বিদ্রোহের দায়ে ফাঁসি দিতে পারে।”
হাবিলদার দাঁত বের করে হাসলো। ভবিষ্যৎ নিয়ে তাকে চিন্তিত মনে হচ্ছে না। “আংরিয়া আসলেই মিসেস হিকসকে আটক করে রেখেছে?”
“হ্যাঁ, আর আমার স্ত্রী সারাহকেও। টিরাকোলার দুর্গে বন্দী ওরা।”
“কামানগুলো ওখানে নিয়ে যাওয়ার জন্যে জাহাজ এনেছেন?”
“সৈকতে অপেক্ষা করছে।”
“জাহাজে আর একজন লোকের জায়গা হবে তো? আমি যেতে ইচ্ছুক।”
টম হাবিলদারের হাত চেপে ধরলো। “ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন।” তারপর টম কাইফেনের দিকে তাকালো। চেয়ারে বসে গোঁ গোঁ করছে আর বাঁধন খোলার জন্যে. অযথা টানাটানি করছে। আমি আমার কামানগুলো নিয়ে যাচ্ছি। আর সেই সাথে ভাবছি কোম্পানীকে কিছু পাউডার আর গোলাবারুদের ভার থেকেও মুক্ত করে দেবো।”
