হাতীটা লম্বা ঘাসের জায়গাটার দিকে ছুটে চলে গেলো। বাঘটা যখন দেখলো যে সামনে আর রাজা নেই, তখন ওটা দৌড় থামিয়ে নতুন কোনো শিকারের সন্ধানে মাথাটা ডানে বামে ঘুরাতে লাগলো।
ফ্রান্সিসের দিকে নজর গেলো বাঘটার। গর্জন ছেড়ে ওর দিকে ধাওয়া দিলো এবার। ফ্রান্সিস ওর অস্ত্রটা তাক করার চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না। ওর চোখের উদ্ৰান্ত দৃষ্টি আর ফ্যাকাশে চেহারা দেখেই টম বুঝলো যে ফ্রান্সিসের মাথা কাজ করছে না। সম্ভবত এর আগে কখনো এতো ভারী বন্দুক চালায়নি ফ্রান্সিস। আর জীবনে কখনো এরকম আক্রমণোদ্যত কোনো শিকারি প্রাণীর সামনে তো পড়েই নি।
টম যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে গুলি করে বাঘটাকে লাগানো সম্ভব না; তার উপর অ্যানা ঠিক ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ফ্রান্সিসের জীবন বিপদাপন্ন, তাই শেষ সম্ভাবনাটুকুও কাজে লাগাতে হবে। ও নিজের বন্দুকটা তুলেই গুলি করলো। কিন্তু সাথে সাথে টের পেলো কিছু একটা ঝামেলা হয়ে গিয়েছে। বন্দুকের নল থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে, কিন্তু ওটার বাট ওর গায়ে কোনো ধাক্কা দিলো না। হয় ওর সাথের শিকারি গুলি ভরতে ভুলে গিয়েছে, অথবা হাতীর পিঠ থেকে নামার সময় ঝুঁকিতে গুলিটা পড়ে গিয়েছে।
ঘটনা যেটাই হোক, বাঘটা এখনো আগের গতিতেই ফ্রান্সিসের দিকে ধেয়ে আসতে লাগলো। একদম শেষ মুহূর্তে মনে হলো ফ্রান্সিস ওর সাহস ফিরে পেয়েছে। ও নিজের বন্দুকটা উপরে তুলেই গুলি করলো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ও তাকিয়ে ছিলো বাঘটার দিকে, বন্দুকের নিশানা যে ঠিক কোনদিকে পড়েছে সে খেয়াল ছিলো না। গুলিটা বাঘের তিন-চার ফুট বাম দিয়ে ছুটে আরো ছয়ফুট পিছনে মাটিতে গিয়ে গাঁথলো।
ফ্রান্সিস আর উপায়ন্তর না দেখে বন্দুকটা ফেলে ঘুরে দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু বাঘটা ততোক্ষণে ওর দিকে ঝাঁপ দিয়েছে। মুখটা হাঁ করে খোলা, সামনের দুই থাবা ওর দিকে প্রসারিত। ফ্রান্সিস অসহায়ের মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে চিৎকার করে বললো, “না! না!”
আর একটা গুলির শব্দ কাঁপিয়ে দিলো চারপাশ। বাঘটাকে দেখে মনে হলো বাতাসে থাকতেই একটা ঝাঁকি খেলো যেন। কিন্তু ওটার ভরবেগ ওটাকে ঠিকই ফ্রান্সিসের উপর নিয়ে ফেললো। ধাক্কায় মাটিতে আছড়ে পড়লো ফ্রান্সিস। আর জটাও পড়লো ওর উপর।
টম প্রায় সাথে সাথেই ওদের কাছে পৌঁছে গেলো। বাঘের মাথাটা টেনে ধরলো ওতারপর কিভাবে ঐ তাগড়া দেহটা ফ্রান্সিসের উপর থেকে টেনে সরালো ও নিজেও জানে না।
“তুমি ঠিক আছো?” চিৎকার করে জানতে চাইলো টম।
“মনে তো হচ্ছে,” ফ্রান্সিস হামাগুড়ি দিয়ে বাঘের তলা থেকে বেরিয়ে এলো। “আপনি আমার জীবন বাঁচিয়েছেন। ধন্যবাদ চাচা।”
“আমি না! আমার বন্দুকেতো গুলি-ই ছিলো না…” বলে টম আশেপাশে তাকালো। আর তখনি প্রথমবারের মতো অ্যানাকে চোখে পড়লো। ওদের ওখান থেকে দশ ফুট মতো পিছনে দাঁড়িয়ে আছে ও। তখনও রাজার লম্বা বন্দুকটার বাট ওর কাঁধে ঠেকানো। নীলচে একরাশ ধোয়া বন্দুকের নল থেকে উড়ে যাচ্ছে।
“অ্যানা দুয়ার্তে!” টম ওর কাছে এগিয়ে গিয়ে ওর কাঁপতে থাকা হাত থেকে বন্দুকটা নামিয়ে নিলো। “তুমি গুলি করেছিলে?” অ্যানা মাথা ঝাঁকালো। কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। “একজন পুরুষ মানুষও এটার জন্যে সারা জীবন গর্ব করবে।” টম বললো।
টম আবার ফিরে এসে বাঘের মাথাটা দুই হাত দিয়ে মুচড়ে উল্টো করে ধরলো। অ্যানার গুলিটা সোজা জন্তুটার কপালে লেগেছে। ঘিলু ভেদ করে বেরিয়ে গিয়েছে ওটা।
“আর একজন মহিলার এরকম গুলির জন্যে দ্বিগুণ গর্ব করা উচিত।”
“আমার এটা ছাড়া আর উপায় ছিলো না; ফ্রান্সিস ছাড়া আমার আর কেউ নেই,” কান্না সামলাতে সামলাতে বললো অ্যানা।
*
চিত্তিত্তিঙ্কারায় রানির মহলে প্রবেশ করতেই টমের গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো। এখানে যারা যারা মারা পড়েছে তাদের কথা মনে পড়লো ওর। ক্যাপ্টেন হিকস, লরেন্স ফয় সহ আরো অনেকে। তারপরেই ওর মনে হলো ঘটনাগুলো আসলে স্বপ্ন ছিলো কিনা। দেয়ালের বুলেটের ছিদ্রগুলো বুজিয়ে ফেলা হয়েছে। পাথরের গায়ে লেগে থাকা রক্তের দাগও আর নেই। ভেঙে পড়া ব্যালকনিটা ঠিকঠাক করা হয়েছে। এখানে যে যুদ্ধ হয়েছিলো তার একমাত্র প্রমাণ হলো দেয়ালে করা নতুন প্রাস্টার। সেদিনের হত্যাকাণ্ডের কথা মনে আসতেই প্রচণ্ড রাগ হলো ওর।
দরবার ঘরটাও অনেকগুলো তিক্ত স্মৃতি মনে করিয়ে দিলো। গতবার যখন এসেছিলো, তখন এখানে নেপচুন তরবারিটা নিয়ে টুঙ্গারের সাথে লড়াই করতে গিয়ে প্রায় মরতে বসেছিলো। আর এবার রানি নিজে ওকে অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে গেলেন। যেনো ওদের মাঝে কিছুই হয়নি। শাহুজির মতো ইনিও যা কিছু রাজ্যশাসনের জন্যে ঝামেলাপূর্ণ তা ভুলে যেতে সিদ্ধহস্ত। আসলে সব শাসকেরই এই গুণটা থাকে। টম ভেবে পেলো না ও কি এজন্যে রানিকে করুণা করবে নাকি ঈর্ষা করবে।
তবে এসব বাজে চিন্তায় বেশিক্ষণ সময় নষ্ট করলো না ও।
“সাতারার রাজা, ছত্রপতি শাহুজির পক্ষ থেকে এসেছি আমি। আমার জাহাজ থেকে যে কামানগুলো উদ্ধার করেছিলেন সেগুলো ফেরত নেওয়ার জন্যে পাঠিয়েছেন উনি। ব্রিঞ্জোয়ানের কাছেই ওনার পাঠানো জাহাজ অপেক্ষা করছে। আপনি ওগুলো দিয়ে দিলেই ওটায় করে নিয়ে যাওয়া হবে।” এই জাহাজে করেই টম সাতারার কাছের সৈকত থেকে এখানে এসেছে। ফ্রান্সিস আর অ্যানা থেকে গিয়েছে শাহুজির মহলে। শাহুজি টিরাকোলা দুর্গ অবরোধের জন্যে নিজের সৈন্যদল প্রস্তুত করছেন।
