“বাঘটা পুরুষ। যুবক। চোদ্দ বছর মতো বয়স। সামনের বাম পায়ের বুড়ো আঙুলটা নেই,” গড়গড় করে বলে গেলেন শাহুজি। অ্যানা অনুবাদ করে শোনালো।
টম রাজার দিকে চেয়ে মাথা ঝোকালো। হাতীর পিঠে চড়ে থেকেও মাত্র কয়েক ঝলক দেখায় এতো কিছু বলে ফেলতে পারাটা রাজার শিকারের অনবদ্য দক্ষতার কথাই সাক্ষ্য দিচ্ছে।
একটা কাদাময় গর্তের কিনারে গিয়ে ছাপগুলো শেষ হলো। ওটার অর্ধেক পানিতে ভরা। এক জোড়া বাজ, পাতা ঝরা একটা গাছের মগডাল থেকে লক্ষ্য করছে ওদের দিকে। কিন্তু বাঘটা কোথাও নেই।
যেকোনো সময় আক্রমণের আশংকায় টমের দেহের প্রতিটা স্নায়ু টানাটান হয়ে থাকলো। এটাই হচ্ছে শিকারের অভিভুতকারি শিহরণ। যেদিন ওর বাবা প্রথম ওর হাতে বন্দুক তুলে দিয়েছিলেন, সেদিন থেকে এখন পর্যন্ত এক ফোঁটা নেশা কমেনি।
বাঘটা কাছে পিঠেই আছে। হাতীগুলো ওটার ঘ্রাণ পাচ্ছে।
দুশ্চিন্তাগ্রস্তের মতো গা ঝাড়ি দিতে লাগলো হাতীগুলো। গুড় দিয়ে অদ্ভুত শব্দ করছে। এভাবে নড়লে চড়লে শিকারিদের পক্ষে ঠিকমতো নিশানা করে লাগানো সম্ভব হবে না। শাহুজি পিছলে নেমে এলেন হাতীর পিঠ থেকে। টম আর ফ্রান্সিস ওনাকে অনুসরণ করলো।
শাহুজি ওনার শিকারের লোকদের সাথে পরামর্শ করলেন। “সামনে আরো একটা জলা আছে। আর একটু উত্তরে,” অ্যানা অনুবাদ করে শোনালো। “ওটা দিয়ে গেলে একটা গিরিখাত হয়ে অন্যপাশের উপত্যকায় পৌঁছা যাবে। বাঘটা আমাদের হাত থেকে বাঁচতে সেদিক দিয়ে যেতে পারে।”
ওরা কথা বলতে বলতেই ওদের কাছাকাছি পৌঁছে গেলো ঢাকীর দল। কয়েক মিনিট পরেই দেখা গেলো কয়েকশো অর্ধনগ্ন লোক ঢাক আর লাঠি হাতে ফাঁকা জায়গাটায় উপস্থিত।
রাজার হাতীটা পিপাসার্ত হয়ে ছিলো। কোনো সংকেত না দিয়েই ওটা দিঘিটার কিনারে গিয়ে পানিতে শুড় ডুবিয়ে খেতে শুরু করলো। মাহুত চিৎকার করে ওটার রশি ধরে টান দিলো; আরো একজন চাকর এগিয়ে এলো ওকে সাহায্য করতে। কিন্তু তবুও ওটাকে নড়ানো গেলো না। শব্দ পেয়ে, কি হয়েছে দেখার জন্যে হাতীটার দিকে ফিরলো সবাই।
শিকারিদেরকে শিকারে পরিণত করতে ঠিক সেই মুহূর্তটাকেই বেছে নিলো বাঘটা। কয়েকটা ছোট গাছের চারার পেছনে লুকিয়ে ছিলো ওটা এতোক্ষণ। চারাগুলো মানুষের হাঁটুর চাইতে বড় হবে না, খুবই পাতলা। এর পিছনে এতো বড় একটা জানোয়ার লুকিয়ে ছিলো-বিশ্বাসই হতে চাইলো না টমের। এমনকি আফ্রিকার সিংহের মাঝেও ও এরকম গতি দেখেনি। সাদা লম্বা গোফগুলো খাড়া খাড়া হয়ে আছে, প্রচণ্ড আক্রোশে মুখব্যাদান করে আক্রমণ করে বসলো বাঘটা। লেজটা একটা বাঁকা তরবারির মতো পিঠের উপর সোজা হয়ে আছে। থাবাগুলো একেকটা স্যুপের বাটির সমান। সেগুলো পুরোটা সামনে ছড়িয়ে মাটি দাবিয়ে ছুটে এলো সামনে। একটা মাহুতের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো বাঘটা। এক থাবায় লোকটার মেরুদণ্ড গুঁড়িয়ে গেলো। হতভাগ্য লোকটা পিছন দিকে দুই ভাজ হয়ে পড়ে গেলো মাটিতে।
কিন্তু বাঘটা লাশের দিকে কোনো নজরই দিলো না। পরের লাফে ওটা একজন পলায়নরত লোকের উপর গিয়ে পড়লো। এক কামড়ে তার মাথাটা ছিঁড়ে ফেললো বাঘটা; আরো একজন শিকার হলো ওর, আরো একজন। মুহূর্তে নরক গুলজার হয়ে গেলো জায়গাটায়। মানুষজন সব চিৎকার করে ছুটে পালাতে লাগলো, হাতীগুলোও ভয় পেয়ে আর্ত রব ছাড়তে ছাড়তে এদিকে সেদিকে দৌড় দিয়ে পায়ের নিচে পিষে মারলো কয়েকজনকে।
টম একপাশে দৌড়ে গেলো। বাঘের দিকে নিশানা করার চেষ্টা করছে, কিন্তু লোকজন আতংকিত হয়ে উল্টোপাল্টা ছোটাছুটি করতে থাকায় তাক করতে পারলো না, বরং কয়েকজনের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে মরার জোগাড় হলো। টম দেখলো ফ্রান্সিস ওর বন্দুক তুলে উন্মত্ত জানোয়ারটার দিকে গুলি করলো। কিন্তু গুলি করার আগ মুহূর্তে একজন ঢাকী ওর সামনে চলে আসায় গুলিটা গিয়ে লাগলো লোকটার বুকে। মাটিতে পড়ার আগেই মারা গেলো সে। হাত থেকে ছুটে পড়ে গেলো তার ঢাকটা।
শাহুজি এতো কিছুর মাঝেও নিজের জায়গা ছেড়ে নড়েননি। নিজের বন্দুকটা উপরে তুলে ধরে বাঘটাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করার জন্যে চেঁচিয়ে যাচ্ছেন; “এদিকে আয় শয়তান! তোকে আমি তোর শয়তান প্রভুগুলোর কাছে ফেরত পাঠাবো। আয় এদিকে।”
বাঘটা মনে হলো তার ডাক শুনতে পেয়েছে। কারণ এরপরেই ওটা সোজা তার দিকে দৌড় দিলো। প্রচণ্ড একটা হুঙ্কার ছাড়লো বাঘটা, যেনো শাহুজির চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে। দাঁতগুলো ওটার থাবায় মরা মানুষগুলোর রক্তে লাল হয়ে আছে। সেগুলো বের করে রেখেই ছুটে এলো জানোয়ারটা। শাহুজি সামনে ঝুঁকে বন্দুকের বাটটা নিজের কাঁধে ঠেকালেন। ট্রিগারে আঙুল স্থির। সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছেন।
ঠিক তখনি টম দেখতে পেলো যে শাহুজি হাতীটা খেয়াল করেননি। এটা হচ্ছে সেই হাতীটা যেটা দিঘিতে পানি খেতে গিয়েছিলো। এখন বাঘের গন্ধ আর গর্জনে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গিয়েছে। অন্ধের মতো সোজা রাজার দিকে ছুটছে।
টম চিৎকার করে ডাকলো রাজাকে। কিন্তু রাজার সমস্ত মনোযোগ তখন তার সামনে আগুয়ান হিংস্র শার্দুলটার দিকে। হাতীটাও শুড় দিয়ে ক্রমাগত বাঘটার গন্ধ পাচ্ছে, আর কানে ওটার গর্জন বাজতে থাকায়, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে পাত্তা দিলো না। ওটার সামনের উদ্যত পা-টা সোজা শাহুজির পিঠে গিয়ে লাগলো। শাহুজি বাতাসে উড়ে প্রায় পনেরো ফুট দূরে গিয়ে পড়লেন। গুলিভরা বন্দুকটাও ছিটকে গেলো হাত থেকে। ওটা উড়ে গিয়ে পড়লো অ্যানার পায়ের কাছে। ও দ্রুত সেটা তুলে নিলো হাতে।
