“গাই কোর্টনীও একই কথা বলে,” ফ্রান্সিস বললো। “উনি মনে মনেই নিজেকে শক্তিশালী ভেবে মজা পান। সেটা প্রমাণ করার ঝুঁকি নিতে চান না।”
ফ্রান্সিস ঝোঁকের বশে বলে ফেলেছে কথাটা। কিন্তু শাহুজি কিছু মনে করলেন না। “যখন বড় হবে, তখন বুঝবে যে অনেক সময় ক্ষমতা জাহির করাটা, আসলে ক্ষমতা থাকার চাইতে জরুরি হয়ে দাঁড়ায়।”
“কিন্তু ক্ষমতা থাকার পরেও যদি ব্যবহার না করেন, তাহলে সেটা আসলে কোনো ক্ষমতাই না,” টম বললো।
শাহুজি উত্তর দিলেন না। একটা নতুন শব্দ জঙ্গলের এতোক্ষণের হট্টগোলকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। একটানা ছন্দময় দ্রিম দ্রিম শব্দ। যেনো এক হাজার কামার একসাথে তাদের হাতুড়ি দিয়ে লোহার ওপর পেটাচ্ছে। টম একবার ভাবলো এটা আবার কোনো অচেনা প্রজাতির পাখি কিনা। তারপর শাহুজির প্রতিক্রিয়ায় বুঝতে পারলো এ হচ্ছে ঢাকের আওয়াজ। বাঘকে ভয় দেখিয়ে মাচার দিকে তাড়িয়ে নিয়ে আসছে। টমের কাছে ওটা শুধুই সাধারণ একটা আওয়াজ। কিন্তু খেয়াল করলো শাহুজি কান পেতে শব্দটা শুনছেন। শব্দটা কতোটা আগালো তার নিখুঁত হিসাব রাখছেন।
ওদের বাম পাশে হাত তালি আর হৈচৈয়ের আওয়াজ পাওয়া গেলো। গাছের মাথায় বসা লোকগুলো করছে কাজটা। বাঘটা যাতে রাস্তা ছেড়ে দিক না বদলায় সেজন্যে এই ব্যবস্থা। শাহুজি একটা বন্দুক তুলে নিলেন। টম, ফ্রান্সিস আর অ্যানাও একই কাজ করলো। টম টের পেলো ওর রক্তে শিকারের উত্তেজনা পাক দিয়ে উঠছে।
জঙ্গল জুড়ে ভয়ংকর একটা গর্জন ছড়িয়ে পড়লো। গাছে মাথার লোকগুলোর আওয়াজ বাড়লো আরো। তাতে করে বাঘ চাইলেও নদীপথ ছেড়ে অন্য কোনোদিকে যেতে পারলো না। স্বর্ণালি সূর্য কিরণের মতো বাঘটা আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এলো। টম জানোয়ারটা দেখে এতোটাই মুগ্ধ হলো যে হাতের বন্দুকটার কথাও খেয়াল থাকলো না। জন্তুটা বিশাল, কিন্তু সেই বিশাল শরীরের তুলনায় এতো দ্রুত চলছে যে ওটার সঠিক মাপ সম্পর্কে অনুমান করা সম্ভব না। তবে আফ্রিকায় দেখা যে কোনো সিংহের চাইতে যে বড় তা ও নিশ্চিত।
বাঘটা লাফ দিয়ে নদীবক্ষে নেমে এলো। হাতীর উপর থেকে নেমে ওরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো সেটা থেকে মাত্র বিশ কদম মতো দূরে। সামনে মানুষের গন্ধ পেয়ে দাঁত খিঁচিয়ে গরগর করে উঠলো জানোয়ারটা। তারপর ঘুরে গেলো। ওটার ঘাড়ের সাদা চুলগুলো খাড়া হয়ে আছে। গর্জন করতেই ঝিকিয়ে উঠলো ওটার তীক্ষ্ণ দাঁতগুলো।
এতো কাছ থেকেও গুলি লাগানোটা খুব কষ্টকর ছিলো, কিন্তু রাজা গুলি করে বসলেন। টম গুলিটা লাগতে দেখলো, জন্তুটার শোল্ডার ব্লেডের অনেক পিছনে। ভারী গুলিটার আঘাতে জানোয়ারটা গড়িয়ে পড়লো মাটিতে, কিন্তু একই মুহূর্তে ডিগবাজি দিয়ে আবার ওটা চারপায়ে খাড়া হয়ে গেলো। তারপর যেনো কিছুই হয়নি এমনভাবে চলে যেতে লাগলো। টম আর ফ্রান্সিস একযোগে গুলি করলো। কিন্তু বাঘ খুব দ্রুত ছোটা শুরু করেছে, তাই ওদের বুলেট কয়েক ফুট পেছনে মাটিতে লেগে ধুলো আর শুকনো পাতা ছেটানো ছাড়া আর কিছুই করতে পারলো না। বাঘটা বনের ধারে পৌঁছে উধাও হয়ে গেলো।
শাহুজি গাছ থেকে লাফিয়ে নামলেন। পড়ে ব্যথা পাবেন কিনা সে খেয়াল নেই। তারপর বাঘটা যেখানে গুলি খেয়ে ডিগবাজি দিয়েছিলো সেখানে ছুটে গিয়ে মাটিতে রক্তের দাগ খোঁজা শুরু করলেন।
“বাঘটা আহত হয়েছে,” ঘোষণা দিলেন রাজা। “কিন্তু মরেনি। আর আহত বাঘ সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর।”
“এখন কি করবো আমরা?” জানতে চাইলো টম।
“একে তো আহত, তার উপর ধাওয়া খেয়ে বাঘটা খুব তৃষ্ণার্ত হয়ে থাকার কথা। কাছেই একটা জলা আছে। আমার মনে হয় ওটা ওখানেই যাবে।”
অ্যানা অনুবাদ শেষ করার আগেই মাহুতগুলো হাতী নিয়ে হাজির হয়ে গেলো। এখন আবার হাওড়া বাধার সময় নেই। পিঠের উপর শুধু কম্বল বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওরা হাতীর পিঠে চড়ে, ওটার পেট পেঁচিয়ে বেঁধে রাখা একটা রশি ধরে নিজেদেরকে পতনের হাত থেকে বাঁচালো। জানোয়ারটা লম্বা পা ফেলে আবার ঢুকে গেলো জঙ্গলের ভিতরে।
কিছুক্ষণ পরেই ওরা বনের ভিতরের সরু রাস্তাটা পেরিয়ে চওড়া একটা ঘাসবনের ভিতরে এসে ঢুকলো। ওখানে ঘাস এতো বড় যে হাতীর পেটে ঘষা লাগতে লাগলো। টমের মনে হতে লাগলো ও যেনো একটা জাহজের উপর আছে। বরফে ভরা সাগরের ভিতর দিয়ে চলছে ওরা। নিজের বন্দুকটা চেপে ধরে সামনে মাটিতে কোনো রক্তের দাগ বা বাঘের পায়ের ছাপ দেখা যায় কিনা সেই চেষ্টা করতে লাগলো ও। জানে যে বাঘটাকে দেখা যাবে না, লুকিয়ে থাকবে সে। এই লম্বা ঘাসের আড়ালে ওটার গায়ের ভোরাগুলো নিখুঁতভাবে মিশে যাবে।
একজন শিকারি হাতীগুলোর আগে আগে দৌড়ে যাচ্ছিলো। আচমকা সে চিৎকার দিয়ে সামনের মাটিতে কিছু একটা দেখাতে লাগলো। কিন্তু গতি কমালো না একটুও।
“বাঘের পায়ের ছাপ খুঁজে পেয়েছে,” অ্যানা জানালো।
মাহুতেরা লাঠি মেরে হাতীগুলোর গতি বাড়িয়ে দিলো। একটু পরেই ঘাস শেষ হয়ে গিয়ে খালি মাটির এলাকা শুরু হলো। অসংখ্য খুর আর থাবার ছাপ দেখা গেলো ওখানে। হাতীর পিঠের উপর বসে থেকেও টম এর মাঝে বাঘের ছাপগুলো স্পষ্ট দেখতে পেলো। ওটার সদ্য রেখে যাওয়া ছাপগুলোয় নিচ থেকে পানি উঠে জমা হচ্ছে। আর জানোয়ারটার রক্তক্ষরণও হচ্ছে। উজ্জ্বল সূর্যের আলোয় চুনির মতো জ্বলজ্বল করছে রক্তের ফোঁটাগুলো।
