“কে জিতেছিলো?” জানতে চাইলো ফ্রান্সিস।
“এক থাবায় সিংহটাকে মেরে ফেলেছিলো বাঘটা। সিংহের ঘাড়ের রগ ছিঁড়ে গিয়েছিলো। সেখান থেকে রক্তক্ষরণেই পরে মারা পড়ে সিংহটা।” আবারও টম শাহুজির ভূতুড়ে হাসিটা দেখতে পেলো। সর্বোচ্চ এইটুক আবেগই উনি প্রকাশ করেন। “সম্রাট প্রচণ্ড ক্ষেপে যান। এতোগুলো আমির আর জাগিরদার-তারা সবাই খুব হতাশ হন।”
কথা বলার ফাঁকেই রাজার চাকরেরা ওনার হাওড়াটা হাতীর পিঠ থেকে খুলে, ধরাধরি করে একটা লম্বা গাছে দিকে নিয়ে গেলো। তারপর ওটায় রশি বেঁধে প্রায় দশ ফুট উপরে একটা বেরিয়ে থাকা গাছের ডালে বেঁধে দিলো। পাশে একটা বাঁধলো একটা মই।
“এটা হচ্ছে মাচা,” শাহুজি বললেন। “এখানেই অপেক্ষা করবো আমরা।”
মই বেয়ে উঠে গেলো ওরা। চাকরেরা দুটো হাওড়া পাশাপাশি বেঁধে দিয়েছে। একটা টম আর শাহুজির জন্যে, আর একটা অ্যানা আর ফ্রান্সিসের জন্যে। বন্দুকবাহীসহ বাকি চাকরেরা পিছনের ডালগুলোতে আশ্রয় নিলো। সবাই চোখ বড়বড় করে আশে পাশের জঙ্গলে নজর বুলাচ্ছে।
“বাঘেরা পানি ধরে চলতে পছন্দ করে,” বলতে বলতে শাহুজি অপর পাড়ে যেখানে ধারাটা নদীতে এসে মিশেছে সেটা দেখালেন। “ঢাকীর দল যদি ঠিকমতো তাড়িয়ে আনতে পারে তাহলে এখান দিয়েই আসবে বাঘটা।”
টম বুঝতে পারলো শিকার কেন যুদ্ধযাত্রার জন্যে এতো ভালো প্রস্তুতির কজ করে। জঙ্গলের ভিতর এখন প্রায় আটশো নোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সবাই এক অদেখা শিকারকে খুঁজছে, তাই ওদের মাঝে যোগাযোগ রক্ষাটা সবচে জরুরি। কারণ একটা সারিও যদি একটু এগিয়ে বা পিছিয়ে যায়, তাহলে মাঝে যে ফাঁকটা সৃষ্টি হবে, সেটা দিয়েই বাঘ বেরিয়ে যেতে পারবে। যদি বাঘ দিক পরিবর্তন করে, তাহলে পুরো সারিটাকেই ঘুরে যেতে হবে। এর ফলে সবার মাঝে যে বোঝাঁপড়ার সৃষ্টি হচ্ছে বিভিন্ন দলপতির মাঝে একইভাবে আদেশ গ্রহণ ও হস্তান্তরের মাধ্যমে পুরো দলটাকে দিয়ে সেটা পালন করানোর যে অনুশীলন হচ্ছে-সেটা যুদ্ধক্ষেত্রে অমূল্য কাজে দেবে।
মাহুতেরা হাতীগুলোকে বনের দিকে নিয়ে গেলো। “ওরাও ঢাকীদের সাথে যোগ দেবে,” শাহুজি বললেন। “হাতীগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া আছে। ওরা গাছের ডাল ভেঙে, শুড় দিয়ে খুঁড়িতে বাড়ি দেবে। শব্দে বাঘ ভয় পেয়ে যাবে।”
বসে বসে অপেক্ষা করতে লাগলো ওরা। জঙ্গল জুড়ে নানা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। কানের পাশে নানান পোকা ডাকতে ডাকতে ওদের গা বেয়ে উঠতে লাগলো। যতোটা সম্ভব স্থির থাকার চেষ্টা করলো টম একটা নীলগাই নদীর ধারে ঘুরে বেড়ালো কিছুক্ষণ। টম ওটার দিকে বন্দুক তাক করলো কিন্তু গুলি অপচয় করলো না।
“আংরিয়ার সাথে আমার শত্রুতা অনেক পুরনো,” হঠাৎ বলে উঠলেন শাহুজি। “আপনি সেটা জানেন নাকি?”
টম মাথা নাড়লো।
“আংরিয়া জলদস্যু হওয়ার আগে আমার নৌবাহিনির ক্যাপ্টেন ছিলো। মুঘলরা আমাদেরকে ডাঙায় শায়েস্তা করছিলো বারাবার, সমুদ্রই তাই তখন ছিলো আমাদের আশ্রয়স্থল। যোগাযোগ আর রসদপত্রের জন্যে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিলাম এই পথের উপর। কিন্তু যখন আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার ছিলো, আংরিয়া তখনই আমাদের সাথে বেঈমানি করে বসলো। ও বিদ্রোহ করে ওর নিয়ন্ত্রণে থাকা জাহাজ আর নলাকজন নিয়ে ভেগে যায়। তারপর টিরাকোলায় আমাদের সৈন্যদের পরাস্ত করে ওটর দখল করে নেয়। এরপর থেকেই ও উপকূল জুড়ে ত্রাসের সৃষ্টি করে চলেছে। আমাদের দুর্গগুলো অবরোধ করতে থাকে, জাহজগুলো লুট করতে থাকে। এদিকে মুঘলেরাও আমাদের হাত থেকে সাম্রাজ্য ছিনিয়ে নিতে প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করছিলো তখন। আমি ওকে কখনো ক্ষমা করতে পারবো না। সমুদ্রে ওর নিজস্ব অরাজক সাম্রাজ্য সৃষ্টির লোভের কারণে আমাদের পুরো সাম্রাজ্য হারানোর উপক্রম হয়েছিলো।”
শাহুজি আঙুল দিয়ে তার বন্দুকের বাটের উপর টোকা দিতে লাগলেন।
“তারপরেও ওকে ক্ষমা করে দিতাম। সাম্রাজ্যের খাতিরে আমাদের ঝামেলাটা ছেড়ে দিতে রাজি ছিলাম আমি। শান্তি প্রস্তাব দিয়ে প্রতিনিধিও পাঠিয়েছিলাম। ও কি করেছিলো জানেন?”
এমনকি স্মৃতিটা মনে পড়তেও তার চেহারা রাগে ফ্যাকাশে হয়ে গেলো।
“ও আমার লোকদের ফেরত পাঠায়। তবে তার আগে তাদের চোখ উপড়ে নেয় আর লোহা পুড়িয়ে কপালে ওর প্রতীক এঁকে দেয়। কপালের চামড়া পুড়ে খুলির হাড় বেরিয়ে পড়েছিলো লোকগুলোর। এমনকি মস্তিষ্কে পর্যন্ত সমস্যা হয়ে যায়। ওরা এখন আবার ছোট বাচ্চার মতো হয়ে গিয়েছে। কথা বলতে পারে না, কাপড়েই পেশাব পায়খানা করে দেয়।”
সারাহ আর অ্যাগনেস যে এই রকম মানসিকতার একজনের কাছে বন্দী এই চিন্তাটা টম জোর করে মাথা থেকে সরিয়ে দিলো।
“আংরিয়াকে হাতীর পায়ের নিচে পিষে মারতে পারলে সবচে খুশি হতাম আমি,” শাহুজি বলতে লাগলেন। “দিল্লিতে মুঘল সম্রাট এভাবে মাঝে মাঝে ওনার শত্রুদের মৃত্যুদণ্ড দিতেন। আমি আপনাকে সত্যিটা বলছি। আমাকে রাজমুকুট পরিহিত অবস্থায় শ’খানেক পরিষদ নিয়ে বসে থাকতে দেখে যদি ভাবেন যে আমি মহান মানুষ, তাহলে ভুল করছেন।”
বলে শাহুজি নিজের বুকে থাবা দিলেন। “হ্যাঁ, আমি মহান। আমি পবিত্র পৈতা ধারণ করেছি, আমি হচ্ছি ছত্রপতি, মারাঠাদের সম্রাট। তবুও…” ওনার চেহারায় শোকের ছায়া নামলো। “আমার মহলের বাইরে আমার ক্ষমতা নেই বললেই চলে। গৃহযুদ্ধে প্রতিটা লোকের আসল চেহারা খুলে যাচ্ছে। আমি যদি টিরাকোলা আক্রমণ করে ব্যর্থ হই, তাহলে সেটা আমার সামর্থ্যের প্রমাণের উপর কুঠারাঘাত করবে।”
